লিবিয়াতে যে আজ দুই সপ্তাহ ধরে বোমা বর্ষণ হয়ে চলেছে, তা পশ্চিমের জোটের মধ্যে সঙ্কটকে প্রকট করে তুলেছে. তাদের পক্ষে গাদ্দাফির প্রশাসনের যুদ্ধ করার ক্ষমতাকে দাবিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় নি, যারা এখনও সমস্ত বিদ্রোহী যোদ্ধাদের দখল করা জায়গা থেকে তাড়িয়ে চলেছে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, তারা ওডেসিয়া ডন অপারেশন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে ও এই অপারেশনকে শেষ করার দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে তাদের ইউরোপের জোটের হাতে. যদি কোন ভাবেই তা করা কখনও সম্ভব হয়.

    যদিও বা গত সপ্তাহের শেষে পেন্টাগনের প্রতিনিধিরা ঘোষণা করেছিল যে, ৩রা এপ্রিল থেকে তারা লিবিয়াতে আর সমুদ্র থেকে ছোঁড়া টমাহক রকেট দিয়ে আঘাত করবে না ও তাদের বোমারু বিমান পাঠিয়ে আর বোমা ফেলবে না, তবুও শেষ মুহূর্তে তাদের জোটের অনুরোধে এক দিনের জন্য এই বন্ধ করার নির্দেশ স্থগিত করেছে. পর্যবেক্ষকেরা ওয়াশিংটনের এই ধরনের অবস্থানের জন্য কয়েকটি কারণ দেখেছেন. তার মধ্যে একটি হল জোটের জন্যও শেষ অবধি অস্পষ্ট লক্ষ্য ও সন্দেহ জনক কাজকর্মের উদ্দেশ্যে করা অপারেশনে প্রচুর খরচ হয়ে যাওয়া, অন্যটি হল – একেবারেই আভ্যন্তরীণ সমস্যা, যার সাথে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা টক্কর খেয়েছেন. এই বিষয়ে বিশদ করে ব্যাখ্যা করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মূল্যায়ণ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ইভগেনি মিনচেঙ্কো, তিনি বলেছেন:

    "ওবামাকে যা করতে হচ্ছে, তা হল তাঁর এখন খুবই স্পষ্ট করে প্রমাণ করা দরকার যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আরও একটি তৃতীয় ঐস্লামিক দেশে সামরিক ভাবে লক্ষ্যহীণ কাজ করছে না. কারণ তাঁকে খুব শীঘ্রই ঘোষণা করতে হবে যে, তিনি দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান. আর স্বাভাবিক ভাবেই বাড়তি অভিযোগের কোন প্রয়োজন নেই. এমনিতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা অনেক. মার্কিন সৈন্যদের আরও মৃতদেহ তাঁর কোন দরকার নেই, যা কিনা জনমতকে তাঁর বিরুদ্ধে এক করতে পারে. সব মিলিয়ে, ওবামা একেবারেই শুরু থেকে লিবিয়ার অপারেশন থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন. আর নিজেকে এই অনিবার্য আঘাত থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত".

    একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন যে, আমেরিকার আকাশ পথে আঘাত হানা থেকে বিরত থাকার অর্থ মোটেও নয় যে, তারা লিবিয়া থেকে শরে যেতে চাইছে. সেখানে সি আই এ সংস্থার গুপ্তচরেরা রয়েছে, যারা বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে. আর বিশেষ বাহিনীর লোকেরা গাদ্দাফির বিরোধী পক্ষের লোকেদের লিবিয়ার মরুভূমিতে গোপন ঘাঁটি গড়ে সেখানে লড়াই করতে শেখাচ্ছে. তাছাড়া এখনও কেউ লিবিয়ার সমুদ্র পারে চার হাজার নৌবাহিনীর পদাতিক সেনা পাঠানোর নির্দেশকে ফিরিয়ে নেয় নি. সুতরাং লিবিয়ার সমুদ্র তীরের কাছে আমেরিকার পতাকা উড়ছেই.

    একই সঙ্গে গাদ্দাফির ভবিষ্যত স্পষ্ট নয়, যদিও পশ্চিমের জোটের পক্ষ থেকে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বলার আহ্বান প্রতিনিয়তই করা হচ্ছে. জোটের পক্ষ থেকে আপাততঃ শুধু বিরোধী পক্ষকে যাচিয়ে দেখা হচ্ছে. বেনগাজি শহরে, যেখানে বর্তমানে অস্থায়ী জাতীয় পরিষদ রয়েছে, যারা বিদ্রোহী যোদ্ধাদের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের সঙ্গে এখন রয়েছে একদল ব্রিটেনের কূটনীতিবিদ. তাদের লক্ষ্য হল – বিরোধী পক্ষের পরবর্তী পরিকল্পনা সম্বন্ধে খবর যোগাড় করা আর তারই সঙ্গে লিবিয়ার পরিস্থিতি লক্ষ্য করা. অন্য দিক থেকে, ইউরোপে গাদ্দাফির লোকেদের আসা যাওয়া বেড়েছে. গত সপ্তাহে লন্ডনে তার ছেলে সৈফ আল – ইসলামের কাছের লোক মুহম্মদ ইসমাইল এসেছিল. রবিবারে এথেন্স শহরে লিবিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের বর্তমানে ভার প্রাপ্ত অস্থায়ী মন্ত্রী আবদেলাতি আল- অবৈদি গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী গিওর্গিওস পাপানদ্রেউর সঙ্গে আলোচনা করেছেন. গ্রীসের পররাষ্ট্র দপ্তর এইটুকু বলেই ক্ষান্তি দিয়েছে যে, গাদ্দাফির দূতকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, লিবিয়া রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে বাধ্য, অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে ও জনগনের উপরে শক্তি প্রয়োগ বন্ধ করতে বাধ্য. এই ভাবে পশ্চিমে, লিবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে পথ খুঁজতে হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে কি করে বের হওয়া যায়. আর ইভগেনি মিনচেঙ্কো যে রকম মনে করেছেন যে, এখনও এটা কোন বাস্তব বিষয় নয় যে, গাদ্দাফি ক্ষমতায় থাকছেন না, তাই তিনি যোগ করে বলেছেন:

    "ইউরোপ ও পশ্চিমের এখন গাদ্দাফিকে নিয়ে কোন স্পষ্ট অভিমত রয়েছে, তা আমি বলতে পারছি না. বাস্তবেই একটা সময় ছিল, যখন পশ্চিম গাদ্দাফিকে একঘরে করে রেখেছিল, তখন তিনি ইউরোপের দেশ গুলিতে সন্ত্রাস করার জন্য অর্থ খরচ করেছেন. আর তা স্বত্ত্বেও, এটা ভুলে তাঁকে ক্ষমাও করে দেওয়া হয়েছিল. আর তাঁর ভয় দেখানোর মত উপায়ও রয়েছে. কারণ তিনি বলতেই পারেন যে, আমাকে আবার কোন ঠাসা করার চেষ্টা করে কোন লাভ হবে না, কারণ তা হলে আমি সন্ত্রাসের পথ ধরবো. আর দেখবো, তোমাদের পক্ষে জনমত কতটা বাড়বে, যখন ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, স্পেন আর ইতালিতে বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যাবে. তাই আমি মনে করি যে, তাঁর এখনও সুযোগ রয়েছে".

0     ত্রিপোলির দূতদের ইউরোপে স্বাগত জানানোর জন্য আরও একটি কারণ রয়েছে. এটা হল বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু, যারা আজ মহাদেশে চলে আসছে নিকট প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে. শুধু লিবিয়া থেকেই প্রায় চার লক্ষ লোক পালিয়েছে. আর তাছাড়া টিউনিশিয়া, ইজিপ্ট, মরক্কো ও আরও অন্যান্য দেশ থেকে লোকে পালাচ্ছে. সুতরাং ইউরোপের নেতাদের এখন চিন্তা করার মতো বিষয় রয়েছে. ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনি টিউনিশিয়ার সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে চাইছেন, তাই তিনি সোমবারে ঝটিকা সফরে পৌঁছেছেন সেখানে. ইউরোপ একেবারেই এত পরিমানে উদ্বাস্তু লোককে ভিতরে নিতে তৈরী নয়. লিবিয়ার পরিস্থিতি একেবারেই ইউরোপের চিত্রনাট্য অনুযায়ী হচ্ছে না, যারা আসা করে বসে ছিলেন যে, গাদ্দাফি দ্রুত পালাবে. এই ঘটনাই ইউরোপের নেতাদের সমঝোতার পথ খুঁজতে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াতে বাধ্য করছে.