১১ মার্চের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ জাপানের পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র ‘ফুকুসিমা-১’ এর সামগ্রিক অবস্থা অবনতির দিকে অগ্রসর হওয়া অব্যহত রয়েছে.আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া বিভিন্ন মতামতে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে.কেন্দ্রের চুল্লিগুলোর শীতলকরন কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না.একই সাথে পুরো দেশে ভূমিকম্পের বিবর্ন স্মৃতি কাটিয়ে উঠে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হচ্ছে.জাপানীরা দ্রুত ঐ কালো অধ্যায় ভুলতে চাইছেন.

বিশেষজ্ঞরা পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র ‘ফুকুসিমা-১’ এর চারিপাশে তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি সনাক্ত করেছে.এছাড়া,চলতি সপ্তাহে কেন্দ্রের ১ম চুল্লি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তার পরিমান স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ হাজার গুন এবং কেন্দ্রের নিকটবর্তী সমুদ্রের পানিতে আয়োডিনের পরিমানও সাড়ে ৪ হাজার গুন বৃদ্ধি পেয়েছে.

অন্য আরেকটি সমস্যা হচ্ছে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা যা বাতাসের সাহায্যে আশোপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পরছে.এই পরিস্থিতিতে তাত্বীকভাবে যে সমাধান খুঁজে পাওয়া গেছে তা হচ্ছে,পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রর চারপাশে তরল সিনথেটিক পর্দার আবরন দেওয়া হবে যা তেজস্ক্রিয়তার ক্রিয়াকলাপকে শীতল করবে.তবে সত্যিকার অর্থে কবে নাগাদ এই কার্যক্রম শুরু হবে তা পরিষ্কারভাবে এখনও জানা যায় নি.তাছাড়া চুল্লি শীতল হলেই এই প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে.

বস্তুত,বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্থ কেন্দ্রে কি ঘটছে,যারা স্থানটি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে তারাই শুধুমাত্র এই বিষয়টি জানে.সম্প্রতি গনমাধ্যমে তেরসো কোম্পানীর অধীনে ফুকুসিমা পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের কর্মীর সাথে তার টোকিও অফিসের সহকর্মীদের ইমেইলে যোগাযোগ হয়.ঐ চিঠির পুরোটাতেই হতাশার চিত্র ভেসে ওঠে.চিঠির কিছু অংশ এমনঃ ‘আমার শুধুমাত্র একটিই কামনা,সবাই যেন বুঝতে পারে যে,এখনও অনেকে কেন্দ্রের স্বাভাবিকীকরনের কাজে নিয়োজিত আছে.কান্নার কোন কারণ নেই.আপনি যদি নিজের স্থান নরকে দেখতে পান তাহলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না কিন্তু তারপরও স্বর্গে যাওয়ার পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে.আমি আপনাদের আস্বস্থ করছি যে,আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারব’.লিখেছেন ফুকুসিমা-২ পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের ১ জন কর্মী.

পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের অধিকাংশ কর্মীরাই হচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসী এবং এই সব কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরাই ভূমিকম্প ও সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন.অনেকেরই ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে.

‘আমার শহরটি উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত যা সুনামির আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায়.আমি এখনও জানি না যে,কোথায় আমার বাবা মা.আমার বাড়ীর কাছে যেতে পারছি না কারণ ঐ এলাকা পরিত্যক্ত ঘোষণার তালিকায়  রয়েছে.এমন মনস্তাত্বিক অবস্থায় থেকেই আমাকে অনেকটা কষ্টসাধ্য কাজ করতে হচ্ছে.কিন্তু আমরা সবাই তেরসোর কর্মী হিসাবে নিজেদের কর্তব্য পালন করার চেষ্টা করছি এবং এর পরে নিজের সম্পর্কে, ঠিক ভূমিকম্পে হতাহতের বিষয়ে চিন্তা করতে হবে’. অন্য একটি চিঠিতে এমনটি লিখেছেন.

এছাড়া  ফুকুসিমা-১ পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের আশেপাশের ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার অধিবাসীরা যারা বর্তমানে জাপানে গৃহহীন অবস্থায় দিন যাপন করছে.তাদের শরীরে তেজস্ক্রিয়তার সংক্রমন নেই এই মর্মে মেডেকিল সনদপত্র না পাওয়া পর্যন্ত তাদের চিকিত্সা প্রদান করা হবে.তেজস্ক্রিয়তার ভয়ে স্থানীয় প্রশাসন পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের আশেপাশে ভূমিকম্প ও সুনামিতে নিহতদের মৃতদেহ সরানোর কাজ বন্ধ রেখেছে.কেউই জানে না যে,এই মৃতদেহগুলোর কি হবে.ঔদিকে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থা দাবী করছে যে,তেজস্ক্রিয়তার ছড়ানোর পরিমানের কারণে  আশেপাশের ৪০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা উচিত.

একই সাথে ফুকুসিমা থেকে ২৪০ কিলোমিটার দক্ষিনে পুরোটাই ভিন্ন জীবনযাত্রা    দেখা যাচ্ছে.জাপানের রাজধানী প্রায় এই শোক কাটিয়ে উঠেছে.তথাপি,বিদ্যুত সাশ্রয় করার জন্য অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও  উন্মুক্ত বিজ্ঞাপণে আলো সরবরাহ বন্ধ রয়েছে.মধ্যপ্রাচ্য ইন্সটিটিউটের শীর্ষ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমানে তাকুসেকু বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ভাসেলি মালোদিয়াকব “রেডিও রাশিয়া”কে বলছিলেন যে,টোকিওকে এখন অনকটা অন্ধকারচ্ছন্ন শহর বলে মনে হচ্ছে.তিনি বলছেন ‘জাপানী সরকার টোকিওবাসীদেরকে এমকি সব জাপানীজকে বিদ্যুত সাশ্রয়ের আহবান জানিয়েছে.যখন আপনি টোকিওর কোন সড়ক দিয়ে হেটে যাবেন,আপনার কাছে তা অনেকটা অন্ধকারচ্ছন্ন মনে হবে কিন্তু তাতে  ভয়ভীতি বা বিপদের  কোন কারণ নেই.অবশ্য,অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা হয়েছে কিন্তু অন্যান্য স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অপরিবর্তনই রয়েছে.জাপানীজরা সর্বাত্রক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে.সঙ্গতই,যদি প্রতিটি নাগরিক ১টি অথবা ২টি অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ রাথে যা সত্যিকারেই বিদ্যুত ঘাটতি বহু অংশে কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে’.   

 ভাসেলি মালোদিয়াকব উল্লেখ করেন যে,বস্তুত মানুষ ভূমিকম্পের এই ধকল  দ্রুতই ভুলতে চাচ্ছে,বিশেষত যখন তারা টেলিভিশনের পর্দায় দূর্যোগ এলাকার ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র দেখেছেন.জাপানী কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের আস্বস্থ করছে যে,পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে.