রাশিয়ার পার্লামেন্ট ঘোষণা করেছে যে, লিবিয়াতে সামরিক শক্তি প্রযোগ করা চলছে বিনা বিচারে. "লিবিয়ার পরিস্থিতি" নামের এক বিজ্ঞপ্তিতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও তার বিস্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে. রাশিয়ার পার্লামেন্ট সদস্যরা ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, কানাডা ও অন্যান্য দেশের পার্লামেন্টের সদস্যদের অবিলম্বে সামরিক শক্তি প্রযোগ বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সহায়তা করতে বলেছেন.

দেশের পার্লামেন্ট এই কারণে উদ্বিগ্ন যে, লিবিয়াতে পরিস্থিতি বদল হচ্ছে, সব চেয়ে খারাপ দিকে, এই বিষয়ে রেডিও রাশিয়াকে ঘোষণা করেছেন পার্লামেন্টের লোকসভার আন্তর্জাতিক বিষয় পরিষদের সভাপতি কনস্তানতিন কোসাচেভ, তিনি বলেছেন:

"আমাদের বিজ্ঞপ্তিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসভার লিবিয়া সম্বন্ধে পরবর্তী কর্মসূচী সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে. আমরা মনে করি যে, তাঁদের প্রথমতঃ মনোযোগ দেওয়া উচিত্, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমস্ত সদস্য দেশের কাছ থেকে লিবিয়া সম্পর্কে নেওয়া সিদ্ধান্ত বিনা শর্তে পালন করতে বাধ্যতা আদায় করা. তাতে অবিলম্বে সামরিক শক্তি প্রযোগ বন্ধ করে রাজনৈতিক আলোচনা পুনরারম্ভ করার ব্যবস্থা রয়েছে. এই ক্ষেত্রে আমরা এই বিরোধে রাশিয়ার পক্ষ থেকে মধ্যবর্তী হওয়ার যে উদ্যোগ আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ উল্লেখ করেছেন, তাকে সমর্থন করছি".

একই সময়ে লিবিয়াতে গাদ্দাফি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশন বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাধার সম্মুখীণ হয়েছে. অংশতঃ, বিরোধী পক্ষের যোদ্ধারা, মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক জোটের হতাশার কারণ হয়েছে. গাদ্দাফির প্রতি অনুগত সেনা বাহিনী ও সামরিক ঘাঁটি গুলির উপরে বোমা বর্ষণ স্বত্ত্বেও গাদ্দাফি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধী পক্ষের যোদ্ধারা কিছুই করে উঠতে পারছে না. এই প্রসঙ্গে বিরোধী যোদ্ধাদের পদাতিক বাহিনীর উপরেই জোট বিরাট আশা নিয়ে বসেছিল. কারণ একমাত্র বোমা ফেলেই গাদ্দাফির প্রশাসনকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়. আর লিবিয়াতে নিজেদের বাহিনী পাঠাতে জোটে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি এখনও তৈরী হয় নি.

এই রকমের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জোটের সহকর্মী দেশগুলির মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের উদয় হয়েছে. পশ্চিমের কূটনীতিবিদদের কথামতো, ফ্রান্সের কাজ, জোটের কাউকে আগে থেকে না জানিয়ে লিবিয়াতে প্রথম বিমান হানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের উষ্মার কারণ হয়েছে. এই ঘটনা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে এই সামরিক অপারেশনের ভার ন্যাটো জোটের হাতে দেওয়ার বিষয়ে প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে. এই পরিস্থিতিতে জোটের সহকর্মী দেশ গুলির মধ্যে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় নি যে, পরে লিবিয়াতে এই অপারেশনের ভার কে সামাল দেবে. এই বিষয়ে কাজকর্ম সহমতে না থাকায় এমন অবস্থা হয়েছে যে, একদিন আগে নরওয়ে ঘোষণা করেছে লিবিয়া থেকে তারা দেশের ছয়টি যুদ্ধ বিমান প্রত্যাহার করে নিচ্ছে. রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস দোলগভ এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

"লিবিয়াতে সামরিক অপারেশন এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব করেছে, যখন পশ্চিমের সহকর্মী দেশ গুলির মধ্যে বিবাদের লক্ষণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. ব্রিটেনের শক্তি আঘাত করছে, ফ্রান্সের যুদ্ধ বিমান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ ও ডুবোজাহাজ থেকে আঘাত করা হচ্ছে. কিন্তু এখনও কোন যোগ সাধনে সমর্থ দপ্তর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, যার কাছে প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া সম্ভব হতো যে, এই সামরিক কাজকর্মের ফল কি হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এই কাজ ন্যাটো জোটের হাতে তুলে দিতে, কারণ তারা আর এই অপারেশনে প্রধান ভূমিকা নিতে চাইছে না. এখনও সবারই খুবই টাটকা হয়ে মনে আছে ইরাকের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশনের স্মৃতি, যা নানা রকমের মত সৃষ্টি করেছে সবার মনে, বিশেষত আরব দেশ গুলির মধ্যে. এখন আমরা আবার তাই হতে দেখছি".

এই রকমের একটা পরিস্থিতির পটে জোটের দেশ গুলির মধ্যে বিবাদ বেড়েই চলেছে. সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়েছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই. সেখানে দেশের রিপাব্লিকান পার্টির লোকসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে সবার সামনে হেনস্তা করতে চাইছে, কারণ তিনি দেশের আইন অনুযায়ী কংগ্রেসকে না জানিয়ে লিবিয়াতে অপারেশনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন. তার মধ্যে ওবামার নিজের পক্ষেও এই ক্ষেত্রে লিবিয়ার "স্বৈরতন্ত্রী" নেতার বিরুদ্ধে কিছু না করে উপায় ছিল না. কারণ মাত্র ২০ মাস পরেই তাঁকে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সামনে পড়তে হবে. ২০১২ সালের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নিকোল্যা সারকোজি নিজেও বাধ্য লিবিয়ার প্রসঙ্গে নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়ণ উন্নত করতে. তিনি খুবই দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন, তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যে, তিনি শুধু টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টের গণ অভ্যুত্থানই "ঘুমিয়ে" কাটান নি, বরং আরব দেশগুলির স্বৈরতন্ত্রী শাসকদের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছিলেন. জার্মানীও উত্তেজিত. প্রথমে দেশের সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দলই দেশের চ্যান্সেলার অ্যাঞ্জেলা মেরকেলের সাবধানী অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছিল – জার্মানী লিবিয়াতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্তে ভোট দান থেকে বিরত থেকেছিল. কিন্তু এখন নানা ধরনের স্বর শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, বিশ্বে বোধহয় ভাবতেও পারে, যে, বার্লিন চুপিসাড়ে লিবিয়ার নেতাকে সমর্থন করছে বলে. এর পরে স্পষ্ট হল যে, জার্মানীকে আর রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ দেখতে হবে না. লিবিয়াকে নিয়ে কি করা উচিত, এই বিষয়ে নানা রকমের পরস্পর বিরোধী মতের উদ্ভব হওয়ার সময়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আবার অধিবেশনে বসছে. সেটা হবে বৃহস্পতিবার. রাশিয়া, চিন, ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক ও আরও কয়েকটি আরব দেশ অবিলম্বে রক্ত ক্ষয় বন্ধ করতে আহ্বান করেছে.