জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান "ফুকুসিমা – ১" পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের জায়গার লোকেদের ঘর ছেড়ে চলে যেতে আহ্বান করেছেন. তিনি তাঁর দেশবাসীকে এই কথা বলেছেন আরও একটি বিস্ফোরণ হওয়ার পরে, যখন পরিস্কার করে বোঝা গিয়েছে যে, পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের আওতায় থাকা লোকেদের স্বাস্থ্য হানীর বিপদ আসন্ন.

জাপানে বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও সুনামি হওয়ার পরে এবারে পারমানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা উপস্থিত. হনসিউ দ্বীপের চারটি পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে ভূগর্ভের কম্পন যান্ত্রিক বিভ্রাট ঘটিয়েছে. এই অঞ্চলে রয়েছে "ফুকুসিমা – ১", "ফুকুসিমা – ২" "ওগানাওয়া" ও "তোকাই" পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র. সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ফুকুসিমা – ১ বিদ্যুত কেন্দ্র, যেখানে বিগত তিন দিনে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ হয়েছে. এই কেন্দ্রের জন্য সাংঘাতিক হয়েছে সুনামি, ভূমিকম্প নয়. তার এতটাই শক্তি যে, প্রতিরক্ষা মূলক বাঁধ তা আটকাতে পারে নি. বিপুল ঢেউ বিদ্যুত কেন্দ্রের কোন ক্ষতি করে নি, কিন্তু ডিজেল চালিত জেনারেটর গুলিকে নষ্ট করে দিয়েছে ও একই সাথে রিয়্যাক্টর গুলির অতিরিক্ত উতপ্ত হয়ে দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে.

যাঁরা এই দূর্ঘটনা থামানোর চেষ্টা করছেন, তাঁদের সমস্ত রকমের কাজ স্বত্ত্বেও এখনও পরিস্থিতি কি হতে চলেছে বলা সম্ভব নয়. মঙ্গলবার "ফুকুসিমা – ১" এর চতুর্থ রিয়্যাক্টরে বিস্ফোরণ হয়েছে, যার ফলে ফুকুসিমা ও পার্শ্ববর্তী ইবারাকি প্রশাসনিক এলাকায় তেজস্ক্রিয় বিকীরণের হার বেড়ে গিয়েছে হাজার গুণে. পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায় এক লক্ষ আশি হাজার লোককে. তা স্বত্ত্বেও বেশ কিছু লোক বিকীরণের শিকার হয়েছেন.

বিশেষজ্ঞরা এই দূর্ঘটনার থেকে নানা রকমের সম্ভাব্য বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছেন. সবচেয়ে নিরাশা জনক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, আবহাওয়ার দূষণের মাত্রা চেরনোবিল পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিস্ফোরণের পরের সঙ্গে তুলনীয় হবে. তার চেয়ে শান্ত মূল্যায়ণ করেছেন আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রাক্তন ভাইস জেনেরাল ডিরেক্টর ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক পারমানবিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভিক্তর মুরোগভ, তিনি বলেছেন:

"চেরনোবিল পারমানবিক কেন্দ্রের তুলনায় এখানে দুই সারি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে. রিয়্যাক্টরের খোলস খুবই মজবুত, তা জ্বালানী বাইরে আসতে না দিয়ে ভিতরেই ধরে রাখে. আর শুধু গ্যাসের সঙ্গে কিছু কণিকা বাইরে আসতে পারে. আর এই খোলসের উপরে আরও একটি খোলস রয়েছে, যা গ্যাস ও বাষ্পের আবহাওয়াতে বেরিয়ে আসাকে বন্ধ করার চেষ্টা করে থেকে. এই রকমের দুটি খোলস জনগনের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করার জন্য রয়েছে. এখানে বিকীরণের পরিমান বেশী, কিন্তু তা ভয়ঙ্কর রকমের বেশী নয়".

কিছু গ্যাসীয় পদার্থ আবহাওয়ার সঙ্গে মিশে উপরে উঠছে, এটা খুব অল্প কিছু সিজিয়াম ও আয়োডিন. যা এখন "ফুকুসিমা – ১" বিদ্যুত কেন্দ্রে ঘটছে, তা কিছু অংশে ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিমেইল আইল্যান্ডের সঙ্গে মেলে. এই দূর্ঘটনা ঘটেছিল, স্থানীয় লোকেদের জন্য ভয়ঙ্কর কোন ফল না করেই, এটাকে অর্থনৈতিক ক্ষতিই বেশী বলা যেতে পারে, কারণ রিয়্যাক্টর আর সারানো যাবে না. এই রকমই মনে করেন ভিক্তর মুরোগভ.

টোকিওতে প্রশাসন যতই জনগনকে উত্তেজিত না হতে অনুরোধ করুক না কেন, দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, লোকে, খাবার, পানীয় জল ও বিভিন্ন রকমের আশু প্রয়োজনীয় জিনিস খুব দ্রুত কিনে ফেলছেন. কিছু বিদেশী দূতাবাস, তাঁদের কর্মীদের ও দেশের পর্যটকদের জাপানের সেই সব ছেড়ে চলে আসতে বলেছেন, যেখানে বিকীরণ বাড়তে দেখা গিয়েছে. টোকিওর বিমান বন্দর গুলি থেকে গত কয়েকদিন ধরে বিমানের টিকিট কেনার জন্যও চাহিদা বেড়ে গিয়েছে.

আপাততঃ জাপানের দূর্ঘটনার ফল সারা বিশ্বের জন্য কি হবে তা বলা মুশকিল. আর যদি বিশ্বের শেয়ার বাজারের কি হাল হবে, তা বোঝা আগে সম্ভব হয়েও থাকে, তবে পরিবেশের যে কি হতে চলেছে, তা আপাততঃ শুধু অনুমান নির্ভরই হতে পারে. ভিক্তর মুরোগভ মনে করেন যে, আমাদের গ্রহে আর চেরনোবিল সিনড্রম হওয়ার আশঙ্কা নেই, তাই তিনি বলেছেন:

"চেরনোবিল পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের দূর্ঘটনার সময়ে পারমানবিক ভাবে তেজস্ক্রিয় মেঘ আকাশে উঠেছিল. এটা সত্যই ছিল তেজস্ক্রিয় মেঘ, যা সারা পৃথিবীর উপরেই পাক খেয়ে এসেছিল. এই ক্ষেত্রে খুবই কম তেজস্ক্রিয় বিকীরণ রয়েছে, যা বলা যেতে পারে প্রাকৃতিক বিকীরণের কাছেই. আর বাস্তবে বেশ কয়েক শো কিলোমিটার দূরে তা লক্ষ্য করা সম্ভব নাও হতে পারে. আবহাওয়াতে মাত্রা একই রকমের থাকবে, যা স্বাভাবিক ভাবেই প্রকৃতিতে লক্ষ্য করা যায়".

পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের রিয়্যাক্টর গুলিকে সমুদ্রের জল ব্যবহার করে ঠাণ্ডা করার কাজ – এক ভাবে কেন্দ্রের কাজকে স্বাভাবিক করার উপায়, কিন্তু তা যথেষ্ট শেষ চেষ্টা মনে করা যেতে পারে. আর তাছাড়া স্বাভাবিক ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেলে অন্য কোন পথও নেই. কিন্তু যদি দ্রুত রিয়্যাক্টরের তাপমাত্রা না কমানো হয়, তবে তার ফলে প্রবল উতপ্ত জ্বালানী রিয়্যাক্টরে তলায় গর্ত করে বেরিয়ে কংক্রীটের খোলস ফাটিয়ে মাটির তলায় যেতে শুরু করবে. আর ক্রমশ মাটির গভীরে যেতে থাকবে. তাত্ত্বিক ভাবে এই অগ্নিগর্ভ কটাহ পৃথিবীর কেন্দ্র অবধি চলে যেতেও পারে. পারমানবিক বিজ্ঞানীদের এই ক্ষেত্রে একটি আলাদা নামও দেওয়া হয়ে রয়েছে – একে বলা হয়ে থাকে "চৈনিক সিনড্রম".

আপাততঃ জাপানের পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসা তেজস্ক্রিয় বাষ্প পূর্বের দিকে উড়ে চলেছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতে তা হাওয়াই দ্বীপপূঞ্জের কাছেও যেতে পারে. কিন্তু এটা আবারও তত্ত্ব শুধু. মহাসমুদ্রের জলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পড়লে, আর প্রশান্ত মহাসাগর সবচেয়ে বড় মহা সমুদ্র বলে, তা স্রেফ স্বাভাবিক ভাবেই জল তলে ডুবে যাবে, তার ফলে পরিবেশ খুব একটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে না.

0 রাশিয়ার সীমানার মধ্যে তেজস্ক্রিয় বিকীরণের বিপদ, রুশ বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমানে নেই. তাঁদের মতে, এমনকি হাওয়া যদি দিক বদল করে, তাহলেও হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা হাওয়াতে বিকীরণের ঘনত্ব বা তেজ হবে কয়েক সহস্র কোটি ভাগ কম ও তা আর বিপজ্জনক থাকবে না.