৯ই মার্চ – ইউরি গাগারীনের জন্মদিন. বেঁচে থাকলে আজ বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারীর বয়স হত ৭৭. এই বছরে তাঁর ঐতিহাসিক উড়ানের অর্ধ শতক জয়ন্তী পালিত হচ্ছে.

অনেকেই জানেন যে, উড়ানের প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাগারীন তাঁর ইতিহাস হয়ে যাওয়া কথা উচ্চারণ করেছিলেন – "চলুন যাই!" অল্প কয়েক জনই জানেন তার পরে কি হয়েছিল. উড়ান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে গাগারীন সামরিক নিয়ম মেনেই রিপোর্ট করছিলেন: অতিরিক্ত চাপ অনুভব করতে পারছি, কম্পন অনুভব করছি, সবই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছি. তার পরেই মহাকাশচারীর স্বর বদলে গেল তার গলার স্বর বদলে গিয়েছিল: উপচে পড়েছিল আবেগ – আনন্দ, হর্ষ. চালু ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়ে যুবকের খুশী চীত্কার করে তিনি জানালেন, জানলা দিয়ে পৃথিবী দেখতে পাচ্ছেন – বরফ, অরণ্য, বিভিন্ন জায়গার ভূ পৃষ্ঠের চেহারা.  আর কি বলতে হবে না জানা থাকায়, কি ভাবে নিজের অনুভবকে বোঝানো যেতে পারে তা সেই পরিস্থিতিতে এক অচিন্ত্যনীয় কথায় বলেছিলেন: "আর আপনাদের কি খবর?" এখানে লক্ষ্যনীয় হল: সমস্ত কিছুই কিন্তু ঘটছে উড়ান শুরু হওয়ার প্রথম কিছু সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তের মধ্যেই. গাগারীন ভয় পাচ্ছেন না. কিন্তু এটা কম বলা হল – তিনি সম্পূর্ণ ভাবেই আনন্দে অভিভূত. তাঁর ইতিবাচক শক্তি সকলের জন্যই যথেষ্ট এমনকি, যারা পৃথিবীতে বসে কাজ করছেন, সেই সমস্ত সহকর্মীদের জন্যও: অর্থাত্ আমার সব খুব ভাল, চিন্তা করবেন না, আপনাদের কি খবর? একটি গানে গাগারীন সম্বন্ধে বলা হয়েছিল: "জানেন সে কি রকম ছেলে ছিল?" এই রকমই তিনি ছেলে ছিলেন – একদম আসল.

তার সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলে তাঁর ছবি. একটা ছবি আছে ১৯৬১ সালের গরম কালে তোলা, মহাকাশ যাত্রার পরে পরেই গাগারীন মস্কো চলচ্চিত্র উত্সবের অতিথিদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছেন. চোখ ধাঁধানো এক যুবতী নারী প্রথম সারিতে বসে তাঁর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছেন – তাকিয়ে রয়েছেন এক ভাল লাগার চোখে. এটা জিনা লোলোব্রিজিদা – তখন ইতালির সিনেমা জগতে সুখ্যাতির শিখরে বসে থাকা অভিনেত্রী. এই দিন তাঁদের একসাথে ছবিও উঠেছিল – মহাকাশচারী ও বিশ্ব বিখ্যাত সুন্দরী তাঁরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, হাসছেন. এর মধ্যে সবচেয়ে অবাক করে দেওয়ার মতো ব্যাপার হল: জিনার পাশে কিন্তু ইউরি কে মোটেও সাদা মাটা লাগছে না বরং যেন জিনাকেই সাধারন দেখাচ্ছে.

এই রকম একটা গুণ তাঁর ছিল প্রকৃতি দত্ত ভাবে পাওয়া তিনি ছিলেন আলোকোদ্ভাসিত এক মানুষ. এক সাধারন চাষীর ঘরের ছেলে. শিশু কালে যুদ্ধ শত্রু পক্ষের দখল সহ্য করতে হয়েছে. যথেষ্ট ছিল কঠিন পরিস্থিতি আর অভাব. ভালই লেখা পড়া করেছিলেন, কিন্তু প্রয়োজন ছিল বাড়ীর সকলের ভরন পোষণের দায়িত্ব নেওয়ার, বাবা মাকে সাহায্য করার. তাই লোহা ঢালাই করার কাজ শেখার জন্য এক কলেজে যোগ দিয়েছিলেন, একই সঙ্গে চলেছিল সন্ধ্যা বেলার স্কুল. তার পরে – ভারী শিল্পের প্রযুক্তি শেখার কলেজ, বিমান চালানোর ক্লাব, সামরিক পাইলটদের কলেজ, অল্প কিছুদিনের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া, আর সেখান থেকেই ভবিষ্যতের মহাকাশচারী বাছার দলে যোগ দিয়েছিলেন.

গাগারীনের মধ্যে এক বিশেষ গুণ আছে, যাঁরা তাঁর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, সেই সমস্ত লোকেদের স্মৃতিচারণা সম্বন্ধে যখন জানতে পারা যায়, যখন তাঁর কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়, তাঁর ফোটো ও ভিডিও টেপ দেখতে পাওয়া যায় তখন তা সকলকে অবাক করে দেয়. এক বিরল মর্যাদা বোধ, মোহিত করার ক্ষমতা, শক্তি, সাহস, আত্মসংযম, সাধারন ভাব, অবিরত নিজের উন্নতি নিয়ে কাজ করে যাওয়ার নিরলস প্রচেষ্টা, তার মধ্যে নিজের শরীরের গঠন সম্বন্ধেও চেষ্টা রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়. বলা যেতে পারে যে, এই গুণ তাঁর প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া, অথবা ভগবান তাঁকে এই গুণ উপহার দিয়ে পাঠিয়েছেন কিম্বা তিনি নিজেই নিজের মধ্যে অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন. প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় সবই সম্ভবতঃ সত্য বলা যেতে পারে.

তাঁর অসংখ্য ফোটোর মধ্যে একটি রয়েছে একেবারেই তার মতন নয়: এখানে তিনি হাসছেন না. এই ফোটো সম্ভবতঃ তোলা হয়েছিল তাঁর মহাকাশ যাত্রা শেষ করে মাটিতে নামার মাত্র কয়েক মিনিট পরেই. মহাকাশচারীর পোষাক খোলা হয়ে গিয়েছে, গাগারীনের পরনে বুকের কাছে খোলা সারা গা হাত পা ঢাকা পোষাক. শান্ত, স্বচ্ছ, সামান্য এগিয়ে থাকা মুখ, চামড়ায় ঢাকা চোয়ালের উঁচু হয়ে থাকা হাড় – মুখ খুব দ্রুত রোগা হয়ে যাওয়া লোকের মত, ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল. উদাস, আত্মার আলোতে উজ্জ্বল চোখ, যার দৃষ্টি নিজের ভিতরে যেন ফেরানো রয়েছে.

বোধহয়, তাঁর ভাবনার দৃষ্টির সামনে দিয়ে তখন আবার করে সেই সমস্ত চিত্র যা তিনি একটু আগেই মহাকাশ থেকে দেখেছিলেন, তা নতুন করে বয়ে যাচ্ছিল. অথবা হতে পারে যে, বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী তখন সে মুহূর্তে আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন আর সাত বছর পরেই মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে এক আজও ধাঁধা হয়ে থাকা আসন্ন মৃত্যুকে. এর উত্তর আমরা কোন দিনই জানতে পারবো না.