মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যা জ্বালানী তেলের বাজারে মন্থর গতি এনেছে.লিবিয়া যখন স্বদেশী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর উপক্রম ঠিক তখনই দেশটি সবধরনের জ্বালানী তেল ও গ্যাস রপ্তানী বন্ধ করে দিয়েছে.যার ফলাফল গত সপ্তাহের জ্বালানী তেলের বাজারে মারাত্বক প্রভাব ফেলেছে.ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ইতিমধ্যে ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে.বিশেষজ্ঞরা বলেছেন,যদিও ওপেক দেশসমূহের জ্বালানী তেলের রিজার্ভ রয়েছে কিন্তু তা সত্বেও লিবিয়ার যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের মন্দা দেখা দিবে.

জ্বালানী তেলের বাজারে দীর্ঘদিন এমন উত্কন্ঠা ছিল না.বিশ্বের নামিদামী বাংক আগামী কয়েকদিনে জ্বালানী তেলের দাম কেমন হবে সেই বিষয়ে ধারনা দিয়েছে.যুক্তরাজ্যের বার্ক্লাইস ক্যাপিটাল বাংক ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১৫০ মার্কিন ডলার ও জাপানী বাংক নামুরা ২২০ মার্কিন ডলার উল্লেখ করেছে.এই পূর্বাভাস ১৯৭৩ সালের তেলের বাজারের মন্দার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়.তখন ওপেক দ্রুততার সাথে ইজরাইলের সহায়তায় তেল সরবরাহের উদ্দোগ নেয়.ঐ সময় ইজরাইলের সাথে সিরিয়া ও মিসরের যুদ্ধ চলছিল.ফলশ্রুতিতে তেলের দাম ৪ ধাপ বৃদ্ধি পায়.বর্তমানে সেই পরিস্থিতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে.বিনিয়োগ কোম্পানী ‘আলোর ইনভেস্টের’ পর্যবেক্ষক দিমিত্রি লিইয়াতিয়াগিন বলছেন ‘যদি বিক্ষোভ আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়া এবং ওপেকভুক্ত ৩টি দেশ-ইরান,সৌদিআরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছড়িয়ে পরে তাহলে গোটা বিশ্ব তেল শূণ্য হয়ে পরবে.তার ভাষায়-পরিস্থিতি সবাইকে এমন আশঙ্কায় ফেলছে.২০০৯ সালে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিদিন প্রায় ২৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তলন করা হত.এবং তা শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যেই.যদি আমরা লিবিয়া ও নাইজেরিয়ার দিকে তাকাই তাহলে এই সংখ্যা হচ্ছে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল.বিশ্বে জ্বালানী তেল উত্তলনের প্রতিদিনের পরিসংখ্যানে যা ৩য় স্থানে রয়েছে.যদি এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুধুমাত্র উত্তর আফ্রিকাই নয় বরং তা যদি আমরা দেখতে পাই ইরান বা সৌদি আরবে তাহলে অবশ্যই তেলের সঙ্কট পরবে.এই সব কিছুই তেলের দাম ও ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিতে প্রভাব ফেলবে’.

এমন পরিস্থিতি যে ঘটতে পারে সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা তিউনিশিয়ার বিপ্লবের সময়ই আভাস দিয়েছেন.তবে তিউনিশিয়া  শীর্ষ জ্বালানি তেল উত্পাদনকারী দেশ হিসাবে তেমন পরিচিত না.গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট দেশ হওয়ায় মিসর সবাইকে আতঙ্কে ফেলেছিল.লিবিয়া পরিস্থিতি যা এখন তেলের বাজারে প্রধান সঙ্কা ছড়িয়েছে.ওপেকের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তেল উত্পাদনের দিক দিয়ে লিবিয়ার অবস্থান ৮ম স্থানে.চলমান সংঘর্ষের পূর্ব পর্যন্ত লিবিয়া প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ৬ হাজার ব্যারেল তেল উত্তলন করত.বর্তমানে এ সংখ্যা ৪ ধাপ হ্রাস পেয়েছে.দেশটি থেকে তেল রপ্তানী প্রায় বন্ধ রয়েছে.তেল রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠান সমূহ আশঙ্কা করছে যে,হয়ত পাশ্ববর্তী দেশেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে.

ইনভেস্ট কোম্পানী ‘গ্রানদিস ক্যাপিটাল’ এর পর্যবেক্ষক তিমুর হাইরুলিন বলেন,তেলের বাজারের এই পরিস্থিতি বুঝে শুনেই অংশগ্রহনকারীরা ঝুঁকি নিচ্ছেন.তিনি বলছেন ‘বিশ্ব বাজারে তেল সরবরাহের জন্য এই অঞ্চল ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে.ওপেক থেকেই শতকরা ৩০ ভাগ জ্বালানী তেল সরবরাহ করা হয়.যদি সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম ১২০-১৩০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয় তা হবে যথেষ্ট.ঐ অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও একই চিত্রের আশঙ্কা রয়েছে’.

লিবিয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন তেল বাজারজাতকারক কোম্পানী তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে.এরা হচ্ছ-বিপি,এনি,টোটাল,স্তাতোলী ও শেল.বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে,যদি তেলের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে বিশ্বের জন্য ব্যাপক ঝুঁকি অপেক্ষা করছে.বিশেষত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হ্রাস পাবে এবং ২য় মন্দার শুরু হবে.তিমুর হাইরুলিন বলছেন‘তেলের মূল্যবৃদ্ধি যা তেল আমদানীকারক দেশসমূহে  মূলত অধিক হারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে.মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপের দেশসমূহ এবং চীন ও ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে.যেহেতু এই দেশসমূহ বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং তেলের মূল্যবৃদ্ধি এই উন্নয়নের হারকে মন্থর করতে পারে.অবশ্যই,সামগ্রিকভাবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতেও একই প্রভাব ফেলবে.

জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যা ইস্পাত বানিজ্যেও ধরা দিয়েছে.ব্যাবসায়ীদের জন্য অবশ্যই তা সুখকর সংবাদ নয়.বর্তমানে অনেকেই তাকিয়ে আছে ওপেকের দিকে.শুধুমাত্র জ্বালানী তেল বিক্রয়ের অর্থ দিয়েই উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের ক্ষোভের চারিত্রিক পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে.যেমন কুয়েতে সে দেশের সরকারী চাকুরীজীবি ও সামরিক বাহিনীর কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি করেছে,সব নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় কর থেকে মুক্ত করা হয়েছে.তবে কর্তৃপক্ষের এই উদারতা অত্র অঞ্চলের দেশসমূহকে সংঙ্কটে ফেলবে.সামাজিক খরচ বৃদ্ধি করা যা রাষ্ট্রকে তেল থেকে অর্থ উপার্জনের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলছে.যে কোন ক্যাটাগরির কাঁচামাল যা ভবিষ্যতে পরবর্তি সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারে.