বিগত বুধবার ভারতের রাজধানীর জন্য ছিল উত্তাল এক দিন. দিল্লীতে মূল্য বৃদ্ধি, দারিদ্র ও দুর্নীতির প্রতিবাদে বেরিয়েছিল জনতার বিশাল এক মিছিল. সেই মিছিলে শুধু দিল্লী বাসী লোকেরাই ছিলেন না, বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে আসা দেশের অন্যান্য শহরেরও লোক. রাজধানীর যান চলাচল ব্যবস্থা বেহাল করে দিয়েছিলেন মিছিলের লোকেরা. দিল্লী এক ঘেরাও হওয়া নগরীতে পরিনত হয়েছিল. প্রসঙ্গ নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

      বর্তমানে ভারতে অনেক লেখালেখি হচ্ছে পূর্বের আরব দেশ গুলির ঘটনা নিয়ে. ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ লিবিয়ার রাষ্ট্রপতি মুহম্মর গদ্দাফির নিজের দেশের জনতার উপরে বিমান বাহিনী প্রয়োগের নিন্দায় সরব হয়েছেন, ভারতের লোকেরা লিবিয়াতে আটকে পড়া ভারতীয় লোকেদের ভাগ্য নিয়ে চিন্তিত ও তাদের এই দেশ থেকে উদ্ধারের আশায় তাকিয়ে রয়েছেন. অনেক কথাই বলা হচ্ছে যে, এই ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে.

    আরবী বিশ্বের ঘটনা এটা শুধু একটা পরিবেশ, প্রতিধ্বনি, যা ভারতে আজ উঠেছে. যে কারণে আজ ভারতের লোকেরা দিল্লীর পথে মাঠে নেমেছেন, তা প্রথমতঃ ভারতীয় কারণ, বহু পুরনো করণ, এই কথা মনে করে ভারতের প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার মস্কো অফিসের প্রধান ভিনয় কুমার শুক্লা দিল্লী থেকে আমাদের বলেছেন:

    "ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা মিছিল এমন সময়ে করা হয়েছে, যখন দেশে পার্লামেন্টের অধিবেশন বসেছে, বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে. এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ভারতে খাবারের দাম বাড়ছে. স্বাভাবিক ভাবেই মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে. কেউ এই বিক্ষোভ কে নিকট প্রাচ্যের আরব দেশ গুলির ঘটনার সঙ্গে তুলনা করতে চাইলেও, আমি সে রকম কোন মিল পাচ্ছি না. ভারত গণতান্ত্রিক দেশ, পার্লামেন্ট এই দেশে যথেষ্ট প্রভাবশালী, সংবিধান অনুযায়ী নিজেদের মনোভাব ও ধারণা প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে ও তা ব্যবহৃত হচ্ছে. বর্তমানের মিছিলের লক্ষ্য সাধারন মানুষের জীবনের দশার প্রতি সরকারের নজর কাড়া, যা বাজেট তৈরীর সময়ে খুবই জরুরী".

    কিন্তু তাও, যারা আরব দেশ গুলিতে প্রতিবাদ করছে আর যারা দিল্লীর রাস্তায় বেরিয়েছেন, সমস্যা অনেকটাই একই রকম. দারিদ্র, মূল্য বৃদ্ধি, দুর্নীতি. বিগত কিছু কাল ধরে ভারতে খাবার জিনিসের দাম যেমন, ফল, দুধ, ডিম, চালের দাম বেড়েছে একের চতুর্থাংশ, আর ভারতীয় খাবারে অপরিহার্য জিনিস যেমন, পিঁয়াজের দাম বেড়েছে একের তৃতীয়াংশ. তার মধ্যে দেশের বেশীর ভাগ লোকই দিনে ২- ৩ ডলার খরচ করে বেঁচে থাকেন.

    ভারতীয়রা বেকারত্বের জ্বালায় কষ্ট পাচ্ছেন, ভাল থাকার জায়গার অভাব, সামাজিক অন্যায়ের কষ্ট পাচ্ছেন. দেশের পরিস্থিতি আরও বেহাল হচ্ছে বহুমুখী দুর্নীতির জ্বালায়, জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে আজ প্রবেশ করেছে দুর্নীতি ও এক ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে. এর জন্য আরেকটু হলেই কমনওয়েলথ গেমস বন্ধ হতে বসেছিল. বহুল প্রসারিত দুর্নীতি আজ যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী এ. রাজাকে ও আরও কিছু উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মীকে পদত্যাগ ও গ্রেপ্তার হতে বাধ্য করেছে. নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সরকারের মর্যাদার প্রশ্নে ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নীতির উপরে. ভারতীয় লোকসভার শীত অধিবেশন দুর্নীতির স্ক্যাণ্ডালের জন্য স্থগিত হয়েছিল.

    কিন্তু তাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত স্ক্যাণ্ডাল ভারতীয় গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য কে ও বর্তমানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্যারাডক্স হলেও প্রমাণ করে দিয়েছে, এই কথা মনে করে রুশ রাজনীতিবিদ আলেক্সেই মাকারকিন বলেছেন:

  "এই দেশে পরের বারে ভোটের সময়ে লোকে তাদের ভরসার অভাব জানাতেই পারে, যে সরকার নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে, তাকে ভোট নাও দিতে পারে. যদি সরকার দুর্নীতির বিষয়ে খুবই দূরে চলে যায়, তবে বিরোধী পক্ষকে ক্ষমতায় আনা যেতেই পারে, আর তা সভ্য পথেই, রাস্তায় নেমে নয়. তাই আমি মনে করি ভারতে ওই ধরনের কোন ঘটনা ঘটতেই পারে না, যা আমরা নিকট প্রাচ্যে হতে দেখছি".