লিবিয়া সরকারের গণ অভ্যুত্থানের দমনে প্রবল শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক সমাজকে এই দেশের পরিস্থিতির মূল্যায়ণ করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে ও সেই দেশের রাজনৈতিক উচ্চপদাধিকারীদের মধ্যে এক বিভাজনের সূচনা করেছে. রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব বান গী মুন অবিলম্বে শক্তি প্রয়োগ বন্ধ করতে আহ্বান করেছেন ও বিভিন্ন দেশে লিবিয়ার রাজদূতেরা দেশের নেতা মুহম্মর গাদ্দাফি কে আর নেতা বলে মানতে চান নি.

    গাদ্দাফি প্রশাসনের বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ দেখাতে মিছিলে সামিল হয়েছেন, তাদের প্রতি সরকার খুবই নৃশংস ভাবে দমনের কাজ চালিয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তাই জরুরী বৈঠক ডেকেছে. বিশ্ব সমাজের রাজনৈতিক কাঠামো বুঝতে পেরেছে যে, লিবিয়ার ধরনের প্রেক্ষাপট কোন ভাল দিকে নিয়ে যাবে না. পশ্চিমের কিছু অতি স্বাধীনতা প্রিয় রাজনৈতিক নেতা যারা তাদের ব্যক্তিগত উচ্চাশা পূরণের লক্ষ্যে টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টের গণ অভ্যুত্থানকে সহর্ষ অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন, তারা বুঝতে পারছেন যে, এই পথে এগিয়ে লাভ নেই, এবারে ঠাণ্ডা হওয়ার সময় এসেছে. বর্তমানের বিশ্বে যে কোন ধরনের পরিবর্তন, তা যতই যুক্তিযুক্ত হোক না কেন, মানুষের জীবনের বিনিময়ে তা করার মানে হয় না. টিউনিশিয়া বা ইজিপ্টে সরকার নিজেদের দেশের জনগনের উপরে গুলি চালাতে অপারগ ছিল, তাও আবার সেনা বাহিনীর হাত দিয়ে. ইজিপ্টে সেনা বাহিনীই মুবারকের পদত্যাগের পরে তুলনামূলক ভাবে শান্তি রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে. অন্ততঃ তারা বড় মাপের রক্তপাত ঘটতে দেয় নি. লিবিয়াতে সেনা বাহিনী হয়েছে দমনের যন্ত্র.

    লিবিয়ার কূটনীতিবিদেরা নিজেরাই নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের আহ্বান করেছেন, দেশের পরিস্থিতিতে নাক গলাতে ও এই গণ যুদ্ধ থামাতে, এই কথা উল্লেখ করে বান গী মুন বলেছেন:

    "আমি লিবিয়া থেকে পাওয়া ভয়ঙ্কর সব চিত্র দেখেছি, কি করে সেনা বাহিনী মিছিল কারীদের তাড়িয়ে দিচ্ছে, আকাশের হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে. এটা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার. এটা সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনের, বিধি নিয়মের সম্পূর্ণ ভাবে অবজ্ঞা করে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ. আমি গাদ্দাফি কে অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করতে আহ্বান করছি, মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার ব্যবস্থা করতে বলছি. খুবই জরুরী হল, যাতে আঞ্চলিক নেতৃত্ব তাঁদের দেশের মানুষদের কথা শোনেন".

    লিবিয়ার সরকারের মিছিল কারীদের উপরে গুলি চালনার নির্দেশ গত চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে ধৈর্য্য নিয়ে নিজের দেমাকে চলা অদ্ভূত মানুষ গাদ্দাফি কে ভাল মনেই সহ্য করে আসা বিশ্ব সমাজের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে আগুণ ধরিয়ে দিয়েছে বললেই শুধু ঠিক হবে না, বরং বলা উচিত্ যে, সেখানের কূটনীতিবিদেরাও ধৈর্য্য হারিয়েছেন. সরকারের শক্তি প্রয়োগ করা দেখে, চিন, ভারত, গ্রেট ব্রিটেন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও পোল্যান্ডে নিযুক্ত লিবিয়ার রাজদূতেরা ইস্তফা পত্র পাঠিয়েছেন দেশে. সুইডেনে থাকা রাজদূতাবাসের কর্মীরা ও সরকারের এক মন্ত্রীও তাদের পদত্যাগের খবর দিয়েছেন. আর গাদ্দাফি নিজে কোথাও যেতে চাইছেন না, তিনি নিজেকে ঘোষণা করেছেন দেশের জন্য শহীদ বলে.

    বিরোধী পক্ষে সামরিক বাহিনীর ও অন্যান্য আইন রক্ষী বাহিনীর নানা অংশের যোগদানের খবরও রয়েছে. কিন্তু তা লিবিয়ার মাটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনবে অথবা পরিস্থিতি আরও সঙ্গীণ করে তুলবে শক্তি ও জোর খাটানোয়, তা বোঝা যাচ্ছে না, এই কথা উল্লেখ করে নিকট প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সভাপতি ইভগেনি সালতানোভস্কি বলেছেন:

    "লিবিয়াতে যা ঘটছে, তা এক ডোমিনো এফেক্ট তৈরী করবে. এই সবই অনেক দিন চলবে ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, আর আমি এখানে কোন কিছুই ইতিবাচক দেখতে পাচ্ছি না. শুধু লিবিয়াতেই নয়, মরোক্কো থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত অঞ্চল জুড়ে, আর সোমালি থেকে রাশিয়ার সীমান্ত অবধি. এই অঞ্চলে আর আইন কানুন বলে কিছু নেই. আর আমেরিকার লোকেদেরও সেখানে আর কেউই বিশ্বাস করে না, কারণ তারা তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হোসনি মুবারকের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে".

    এখানে উল্লেখ করার মত হল যে, লিবিয়ার সরকার এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতই গণ্ডগোলের শুরুতেই জনতাকে যোগাযোগ ও তথ্য প্রচার করা বন্ধ করেছে, দেশে বিদেশী কেন সাংবাদিক নেই, ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ ও টেলিফোন কাজ করছে না. এই মারামারি কেন চরিত্র নেবে, তা আর বিশ্ব অন লাইন অবস্থায় জানতে পারবে না.

    লিবিয়াতে বিপ্লবের পরিস্থিতিতে ইউরোপ থেকে খবর আসছে যে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা লোকেদের মধ্যে উত্তেজনা ও অশান্ত মনোভাব বাড়ছে, আর যদিও এখনও কোন রকমের উচ্ছাসের চিহ্ন দেখতে পাওয়া নাও যায়, তা হলেও এই সমস্যা নিয়ে আগামী ইউরোপীয় সংঘের শীর্ষবৈঠকে আলোচনা হবে.