বিশ্বের প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের বিভিন্ন রূপ যেমন অবধারিত ভাবে লোপ পাচ্ছে, তেমনই পৃথিবীর নানা ভাষা হারিয়ে যাওয়ায় আজকের দিনে উদ্বিগ্ন করেছে সকলকেই. এই পরিস্থিতিকে বদল করতে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে. ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতক আগের ঘটনার স্মরণে পালন করা হয়ে থাকে, সেই দিন বর্তমানের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে (প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তান) এই দেশের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে মিছিলে উপস্থিত হয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন বহু লোক. তাঁদের দাবী ছিল বাংলাও জাতীয় ভাষা হবে.

আজকের বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ভাষা রয়েছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে. খুবই সম্ভব একবিংশ শতকের শেষে তাদের অর্ধেক নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে, এই ভবিষ্যদ্বাণী খুবই বাস্তব পরিসংখ্যানের মতে প্রতি মাসে দুটি ভাষা মুছে যাচ্ছে. যদি বিংশ শতকের শুরুতে একটা ধারণা করা হত, যে, সংখ্যালঘু লোকেদের ভাষা প্রগতির অন্তরায়, তবে বর্তমানে লোকেরা বুঝতে পেরেছে যে, কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এই ভাষাকে সংরক্ষণ করা, এই বিষয়ে মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ংক্রিয় ভাষা বিন্যাস ব্যবস্থা দপ্তরের ল্যাবরেটরীর প্রধান ভাষাবিদ ওলগা কাজাকিয়েভিচ বলেছেন:

"আমাদের সভ্যতা সাংস্কৃতিক ও ভাষার বিভিন্ন রূপের উপরে নির্ভর করে তৈরী হয়েছে. ভাষা – এটা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, বহু প্রজন্মের ঐতিহ্য ও জ্ঞানের এবং সংস্কৃতির ধারকও বটে. শুধু এই কারণেই নয় যে, এই সব ভাষাতে জ্ঞানের কথা লেখা হয়েছে, বরং ভাষার কাঠামোর ভিতরে বিশ্ব সম্বন্ধে কিছু ধারণার ঘনীভূত দৃষ্টি ভঙ্গীও লুকিয়ে আছে বলে. মানুষ তার নিজের ভাষার প্রিজমের (সংক্ষেত্র) মধ্যে দিয়ে বিশ্বকে দেখে. প্রত্যেক ভাষাই তার দিকে অন্য রকম ভাবে নতুন করে দেখতে সাহায্য করে থাকে. আর প্রতিটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আমরা বিশ্বের কিছুটা চিত্র হারাই".

শুধু ইউরোপেই প্রায় পঞ্চাশটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার সীমানায় রয়েছে, রাশিয়াতে সার দিয়ে রয়েছে প্রায় দশটি. রাষ্ট্রসংঘের তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার উত্তরে সাইবেরিয়া ও সুদূর প্রাচ্যের আদি স্থায়ী বাসিন্দা কম সংখ্যক বেশ কিছু প্রজাতির মধ্যে অর্ধেকের ভাষা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে. যদিও কেউই এই ভাষা গুলিকে কোন রকমের চাপ সৃষ্টি করছে না, তারা রাষ্ট্র ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না. কারণ প্রায় সমস্ত ধরনের কাজকর্মের ভাষা, তা শিক্ষা, ব্যবসায়িক কথাবার্তা, সংবাদ মাধ্যমের ভাষা – সবই রাষ্ট্র ভাষার সঙ্গে জড়িত. স্বল্প প্রচারিত ভাষা গুলির জন্য প্রায় কোন রকমের জায়গাই থাকছে না, এই কথা উল্লেখ করে কাজাকিয়েভিচ বলেছেন:

"অনেক ভাষা রয়েছে, যাদের মাত্র কয়েকজন থেকে কয়েক দশক বা শতক লোক আজ জীবন্ত বাহক রয়েছেন, প্রথমতঃ এই কথা সেই সমস্ত ভাষা সম্বন্ধে বলা যেতে পারে, যাদের কোন পুনর্জন্ম হচ্ছে না, নতুন প্রজন্মের লোকেরা আর সেই সব ভাষা শিখতে উত্সাহী নন, কারণ কর্ম ক্ষেত্রে তার কোন প্রয়োজন নেই বলে, বাচ্চাদের শেখানো হয় না আর পুরনো লোকেরা একের পর এক পরলোকে চলে যাচ্ছেন, ভাষাকে সঙ্গে নিয়ে".

রাশিয়াতে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য সাধনের পরিকল্পনা করা হয়েছে উত্তরের আদি কম সংখ্যক বাসিন্দাদের সহায়তার জন্য. সেই পরিকল্পনাতে শেখানোর জন্য বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে: তুন্দ্রা অঞ্চলে পরিবার নির্ভর স্কুল, যাযাবর সম্প্রদায়ের জন্য চলমান ক্লাস, গরমের সময়ে আলাদা করে ভাষা শিক্ষার ক্লাস – যাতে এই সব যাযাবর প্রজাতির ছেলেমেয়েরা তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পেতে পারে. বিভিন্ন পাঠ্য বিষয়ে ও অন্য নানা রকমের বই প্রকাশ করা হচ্ছে, জাতীয় রূপকথার নানা সংকলন প্রকাশ করা হচ্ছে, টেলিভিশন স্টেশন ও রেডিও চ্যানেল খোলা হয়েছে খান্তি, মানসি, কোমি, নেনেত্স, তুভা, খাকাসিয়া, ইয়াকুতিয়ার লোকেদের জন্য তাদের ভাষায়. রাশিয়ার সংবিধানে দেশের ভাষাগুলির সম্পর্কে বলা হয়েছে: "রুশ প্রজাতন্ত্রের লোকেদের ভাষা – দেশের জাতীয় সম্পদ". আর তাই প্রতিটি স্বল্প সংখ্যক মানুষের ভাষার জন্য সমস্ত রকমের সম্ভাব্য উপায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, বাঁচিয়ে রাখার জন্য.