কায়রোর তহরির ময়দান (স্বাধীনতা চক) খুবই মনোযোগ দিয়ে রক্ষা করছে নিজের সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা. স্বাধীন জায়গায় ঢুকতে পারা সহজে পরা যাচ্ছে না. এই ময়দানে ঢোকার সমস্ত দিকের রাস্তাতেই এখন সৈন্যদের জায়গায় – ছাত্রদের পাহারার দল দাঁড়িয়ে. সঠিক বললে বলা উচিত্ সৈন্যরাও এখনও আছে, কিন্তু তারা তাদের ট্যাঙ্কের ঢাকনা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে কিছুটা নিরাসক্ত মুখে আর যা হচ্ছে, তাতে কোন রকমের মাথা গলাচ্ছে না. শুধু মাঝে মধ্যে কচি কাঁচারা ট্যাঙ্কের উপরে উঠে বেশী দাপাদাপি শুরু করলে তাদের বকে তাড়াচ্ছে.

    নতুন পাহারা ওয়ালারা মাথায় মিশরের জাতীয় পতাকার ফেট্টি বেঁধে ঘুরছে, তাদের কিন্তু কাজের শেষ নেই. সমস্ত লোক, যারা তহরির ময়দানে ঢুকতে চাইছে, তাদের এক রকমের খানা তল্লাশী তারা শুরু করেছে, তবে কি যুক্তিতে তা করা হচ্ছে, সঠিক বোঝা গেল না, ওটা শুধু ওরাই জানে. ঢুকতে সকলকেই দিচ্ছে, তবে তল্পি তল্পা আঁতি পাতি করে দেখে নিয়ে তবেই, কাউকে তো ফিরে যেতে দেখলাম না. এমনিতে তারা খুব ভদ্র ব্যবহারই করছে, তবে তাদের দৃষ্টিতে আর কথাবার্তায় এখনও খানিকটা টেনশন টের পাওয়া যাচ্ছে. তারা বুঝিয়ে দিল যে, মুবারকের পক্ষের লোকেরা কোথাও যায় নি, কিছু কালের জন্য আত্মগোপন করেছে শুধু – আর তাদের কাছ থেকে যে কোন বিপদ হতেই পারে.

    বোধহয়, তা হতেও পারে. কিন্তু যখন এই বানানো আবেষ্টনী পার হয়ে ময়দানে ঢোকা যায়, তখন যে কোন রকমের ভয় কোথায় পালিয়ে যায় মাথা থেকে. বহু ব্যবহারে জীর্ণ লাউড স্পীকার থেকে জোরালো গান বাজছে, বাচ্চা আর বড়রা জাতীয় পতাকা হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গোল গলার ঢোলা জামা পরে সম্মানিত বৃদ্ধরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর সকলকে মিস্টি বিতরণ করছেন সবাইকে তিতিবিরক্ত করে দেওয়া এক রইস আদমীকে তাড়ানোর খুশীতে. আর একই সঙ্গে চলছে শেষ হীণ অবিরত তর্ক – ভবিষ্যতের মিশর কি রকমের হবে. লোকেরা এক ভীড় থেকে আরেক ভীড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে. ভীড় দেখে বোঝা যায়, কোথায় আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা জমেছে. ঢাকনা খুলে মাইক্রোফোন বার করে এক স্যুট টাই পরা গম্ভীর দেখতে ভদ্রলোককে যেই না প্রশ্ন করা যে, তিনি কি ভাবছেন দেশের ভবিষ্যত নিয়ে, সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ঘিরে জমে গেল এক ছোট খাট ভীড়.

"এখানে আর কোন ফারাওন হবে না, লোকে এটা করতে দেবে না – বেশ আত্ম প্রত্যয় নিয়ে আমার বক্তা শুরু করলেন, পরিচয় পাওয়া গেল তিনি হেলুয়ান ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মানসুর আবদেল গারাফ. যদি ভবিষ্যতের কোন নেতা আগের নেতার মতো একই রকম ভাবে নিজেকে সর্ব শ্রেষ্ঠ ভাবে, তবে তার জন্য আমাদের রইল তহরির ময়দান".

ডক্টর মানসুর বললেন যে, তিনি এই ময়দানে একেবারে শুরু থেকে রয়েছেন. এই সব ভেটেরান দের মধ্যে আছেন হুসেইন আবদুল গানি, তিনি একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট. তাঁকে যখন প্রশ্ন করলাম যে, ভয় করে নি, এই ময়দানে ট্যাঙ্ক আর মুবারকের সমর্থকদের বেষ্টনীর মধ্যে থাকতে, তিনি উত্তর দিলেন – মনে হল সত্যি বলছেন – না করে নি.

"আমার আর সকলের মতই আগে ভয় হত – যখন শুধু মাত্র পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলার জন্যই ধরে জেলে পাঠানো হত. আর আমি এখানে এসেছিলাম, যখন আর ভয় করতেও ক্লান্ত লাগত, - বিষন্ন হাসি তার মুখে দেখতে পেলাম. ভবিষ্যতের কাছে তিনি কি আশা করছেন? – এই প্রশ্নের উত্তরে বললেন শুধু ভাল – কারণ আমরা সকলেই মিশরের লোক – আমরা একটি দেশ, আমাদের কি আর আছে ভাগ করার মতো"?

এই বিষয়ে স্বেচ্ছায় যোগ দিলেন এক অল্প বয়সী মহিলা, যিনি বললেন তিনি  কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরাজী ভাষার অধ্যাপিকা, তিনি বলেছেন:

"পুরনো সরকার শুধু ভয়ই দেখাতো. শুধু নানা রকমের চাপ আর উত্পীড়ন করেই নয়, এমনকি বানানো সব কথা দিয়েও. তারা বলতো, শীঘ্রই খ্রীস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে, এই দল ওই দলের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাবে, সর্বত্র জীবন ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াবে. ফলে আমরা সত্যিই এক ভয়ঙ্কর জীবন যাপন করছিলাম, কিন্তু এবারে আমরা জেগে উঠেছি. চারিদিকে তাকিয়ে দেখুন – সত্যই সব কিছুই আবার নতুন লাগছে, তাই না"!

যখন তহরির ময়দানের দিকে তাকিয়ে দেখি, এটা সহজেই বিশ্বাস যোগ্য মনে হয়. প্রসঙ্গতঃ, কিছু নূতনত্ব শুধু সেখানেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না. যেমন, কায়রোর রাস্তা ঘাট লক্ষ্য করার মতো পরিস্কার হতে শুরু করেছে. আর তহরির ময়দানের মতো অন্যান্য মাঠেও ও রাস্তাতে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ছাত্রদের বয়সী যুবক যুবতীদের, তাদের মুখে ধুলো ঢাকবার জন্য কাপড় জড়ানো, হাতে ঝাঁটা, ধুলো তোলার হাতা আর ময়লা ফেলার প্যাকেট. এটা এখানের বর্তমান ট্রেন্ড – শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে পরিস্কার শহর বানাবো – এই রকম একটা স্লোগান শুনতে পেলাম. আর তহরির ময়দানে যাওয়ার রাস্তায় কাসর আন- নীল ব্রীজের শুরুতে, যেখানে সবচেয়ে বেশী লোক বিক্ষোভের দিন গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন, সেখানে খান দশেক অল্প বয়সী ছেলে মেয়ে ব্রাশ আর সাবান জল দিয়ে গ্র্যানাইটের প্যারাপেট থেকে "মুবারক নিপাত যাও" স্লোগানের প্রচুর দেওয়াল লিখন ঘষে মুছতে ব্যস্ত. এখন আর এই স্লোগানের কোন দরকার নেই. ইজিপ্ট, এখানে লোকে যেমন বিশ্বাস করেছেন, পরিস্কার হতে শুরু হয়েছে.