ভারত মহাসাগরে জলদস্যূদের নিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে. যদি সমুদ্রের লুঠেরা গুলো এই রকম কাজ কারবার কোন বাধা ছাড়া করে যেতে পারে, তবে তা খনিজ তেল সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ গুলির উপরে প্রভাব ফেলবে, এ কথা আন্তর্জাতিক স্বাধীন ট্যাঙ্কার মালিকদের সঙ্ঘ ইন্টারটাঙ্কো সংস্থা ঘোষণা করেছে.

    ব্রিটেনের ইঞ্জিনিয়ারেরা সোমালির জলদস্যূদের ভয় দেখানোর জন্য নতুন ধরনের অস্ত্র আবিষ্কার করেছেন, এই অস্ত্রে কেউ মারা পড়বে না – এটা লেসার রশ্মি দাগা কামান. আপাততঃ পরীক্ষা করা হয়েছে সামরিক পরীক্ষার মাঠে ও নানা রকমের মাপ নেওয়ার যন্ত্রের উপরেই, মানুষের উপরে কোন পরীক্ষা করা হয় নি. সুতরাং বাস্তব অবস্থায় কতটা ফলদায়ক হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না.

    এই কামান এক মিটার চওড়া সবুজ রশ্মি বিকীরণ করে, এই রঙ বাছা হয়েছে বিশেষ কারণে, যাতে রোদ চশমা শুধু এই রশ্মির থেকে শুধু বাঁচাতেই পারবে না, এমনকি তার প্রভাব আরও বেশী করে তুলবে. যখন জলদস্যূদের নৌকার উপরে এই রশ্মি ফেলা হবে, তখন তা দ্রুত এই নৌকাকে ঢেকে দেবে সম্পূর্ণ ভাবে. এই ব্যবস্থা যারা বার করেছেন, তারা বলেছেন যে রশ্মি দিয়ে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে থাকা জলদস্যূদের সাবধান করে দেওয়া যাবে, আর যদি তারা আরও কাছে আসে তবে তারা কোন রকমের বন্দুক বা গ্রেনেড ছোঁড়ার অস্ত্র তাক করতেই পারবে না, কারণ এই সবুজ সূর্য তাদের অন্ধের মত করে দেবে. লেসার রশ্মি থেকে দৃষ্টি শক্তির কোন পাকাপাকি ক্ষতি হবে না, কারণ তার শক্তি নিয়ন্ত্রিত. রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর রাষ্ট্র ও আইন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ভাসিলি গুত্সুলিয়াক মনে করেন যে, এই অস্ত্র ভাল, তিনি বলেছেন:

    "তার ফল নিজের থেকেই ভাল – কারণ জলদস্যূদের অন্ধ করে দেয়, তাদের উপরে একটা হুঁশ ফিরিয়ে আনার মতো প্রভাব বিস্তার করে. আর সবচেয়ে ভাল হল – এই প্রযুক্তি গত অভিনব জিনিস কোন রকমের অস্ত্র নয়. বর্তমানে সোমালির তীরের কাছাকাছি জায়গার কথা চিন্তা করলে, যে কোন ব্যবস্থাকেই ভাল মনে হতে বাধ্য".

    লেসার রশ্মি দাগা কামানের গুণ হল যে, তা যথেষ্ট দূর পর্যন্ত কাজ করে, এ কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞ. আর বেশী কাছে চলে এলে, দশ মিটারের মধ্যে, তার জন্য নিজের সাফল্য দেখিয়েছে, আরও একটা ব্যবস্থা – ধ্বণি তরঙ্গের অতি ক্ষুদ্র ও খুব দ্রুত তরঙ্গ ব্যবস্থা, যা অন্য পক্ষের কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়. যতদিন না এই ধরনের কামান ও তরঙ্গ ব্যবস্থা বেশী করে উত্পাদন করা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বাণিজ্য জাহাজের নাবিকেরা জলদস্যূদের আটকানোর জন্য যা কিছুই হাতের কাছে পাবে, তাই ব্যবহার করবে, তার মধ্যে – কাঁটা তার, পিছল ফেনা, শব্দ করার  গ্রেনেড, সঙ্কেত দেওয়ার রকেট থাকছে. এমনকি তুমুল তোড়ের জল দিয়ে কামান ব্যবস্থা গুলিতেও বর্তমানে ফুটন্ত জল দেওয়া হচ্ছে. এই রকমের ব্যবস্থা বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে, কারণ বাণিজ্য জাহাজের মধ্যে সত্যিকারের অস্ত্র প্রচুর সমস্যার সৃষ্টি করে, এই কথা যোগ করে ভাসিলি গুত্সুলিয়াক বলেছেন:

    "জাহাজের উপরে অস্ত্র বাস্তবে রাখা সম্ভব, কিন্তু তা সঙ্গে নিয়ে যে কোন বন্দরে ঢুকতে পারা যায় না. জাহাজের ক্যাপ্টেন তার নিজের বিপদ বাড়াতে পারেন, কারণ তাকে কোন বন্দরে ঢুকতে নাও দেওয়া হতে পারে. বিভিন্ন দেশের আইন এই ক্ষেত্রে খুবই কড়া. আর এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিক ভাবে কোন সম্মিলিত সমাধান করা হয় নি".

    অবশ্যই লেসার কামান বা অন্য যে কোন ধরনের ব্যবস্থাই ভাল, কিন্তু তা সমস্যার মূল কোন সমাধান করতে পারে না. তা পাল্টাতে হলে রাষ্ট্রসংঘের সেনা দলকে সোমালির জলদস্যূদের ঘাঁটি গুলিতে সমতল দিয়েই আঘাত হানতে হবে, কিন্তু খুব অল্প দেশই এই ধরনের কাজে অংশ নিতে রাজী হবে. আর ভারত মহাসাগরে বর্তমানে কর্ম রত আন্তর্জাতিক যুদ্ধ জাহাজের দল এক সঙ্গে সব সময়ে কুড়ি লক্ষ বর্গ কিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা পাহারা দিতে অক্ষম, যদিও আলাদা রকমের সাফল্য হয়েছে, তবুও ভুললে চলবে না যে, বর্তমানে জলদস্যূদের দখলে রয়েছে তিরিশেরও বেশী বাণিজ্যিক জাহাজ.

    যদি টের পায় যে অপরাধের রাস্তায় গেলে সাজা হবেই, তবে বহু জলদস্যূ সমুদ্রে যাওয়া ত্যাগ করবে. আর এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জলদস্যূ বিরোধ ট্রাইব্যুনাল এর উপরে অনেক আশা রয়েছে. রাশিয়া এই ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিয়েছে ও অনেক কিছুই করেছে যাতে লুঠেরা দের উপরে সম্যক্ সাজা দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়. এই উদ্যোগে বিশ্বের অনেক বড় দেশই সাড়া দিয়েছে.

মাল পরিবহন কারীরা সাবধান করে দিয়ে বলেছেন যে, ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আর গ্রহণ যোগ্য নয়. চিঠির লেখকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সোমালির জলদস্যূদের হাতে আটকে রয়েছে তিরিশটির বেশী জাহাজ ও ৭০০ জনের বেশী নাবিক. আন্তর্জাতিক জলদস্যূ সমস্যার ফলে বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৭ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার. আর কোন কিছু পাল্টানো না হলে এই সব জাহাজ মালিকদের সংস্থা বাধ্য হয়ে সমাধানের রাস্তা খুঁজবে, তার মধ্যে জাহাজ চলাচলের পথ পাল্টে দেওয়াও থাকছে. এর ফলে জাহাজে মাল পরিবহনের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্বের অর্থনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে পারে.

    রাশিয়া, ভারত, চিন ও ন্যাটো জোটের দেশ গুলি নিয়মিত নিজেদের সামরিক জাহাজ পাঠাচ্ছে ভারত মহাসাগর পাহারা দেওয়ার জন্য, অন্যান্য এলাকাতেও টহল চলছে. তারা বাণিজ্যিক জাহাজ গুলিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে, সম্ভাব্য আক্রমণের এলাকাতেও চলছে পাহারা. কিন্তু কেবলমাত্র সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে জলদস্যূ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না, এই কথা মনে করে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ইগর জুবকভ বলেছেন:

    "আমরা বুঝতে বাধ্য যে, বর্তমানের আফ্রিকাতে জলদস্যূ হওয়া বাড়ছে. বাণিজ্যিক জাহাজ দখল করে জলদস্যূরা এত অর্থ রোজগার করছে, যা তাদের বেশ কিছুদিন গরীব থাকা থেকে রেহাই দিচ্ছে. জলদস্যূদের নতুন দল বাড়ছে. তারা বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে, তাদের কাছে আছে আধুনিক যন্ত্র, অস্ত্র. তাদের কাছে নতুন সৈনিক বা অস্ত্র যোগাড় করা কোন কঠিন কাজ নয়. সম্ভবতঃ আন্তর্জাতিক সমাজের জন্য সময় হয়েছে সোমালি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার, সেখানে এক শাসনের উপযুক্ত সরকার তৈরী করাতে আর্থিক ও রাজনৈতিক সাহায্য করার".

    আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের মতই এই জলদস্যূ সমস্যা. এই ক্ষেত্রেও সকলকে একসাথে হয়েই কাজ করতে হবে, কিন্তু এখনও তা অনেক দূরের ব্যাপার. এমনকি এই বদমাশ দের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তৈরী করার কাজও বাস্তবায়ন হতে দেরী আছে. আর যতদিন কূটনীতিবিদেরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন, সোমালির জলদস্যূরা তাদের কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে. ৮ই ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবারে ইতালির একটি ট্যাঙ্কার ধরা পড়েছে সোমালির জলদস্যূদের হাতে, সেখানে ১৭ জন ভারতীয় নাবিক ও ৩ জন ইতালির নাবিক রয়েছে সংবাদ পত্র লে রিপাব্লিকা জানিয়েছে জাহাজের নাম সাভিনা কেইলিন. এর আগে ধরা পড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সুপার ট্যাঙ্কার সামো ড্রিমের জন্য ৯ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপন দিতে হয়েছিল, আর পানামার সুপার ট্যাঙ্কার ইরেন বুধবার ৯ই ফেব্রুয়ারী ধরা পড়েছে. সন্ত্রাসবাদী আল শাবাব দলের লোকেরা এখন জলদস্যূদের সাহায্য করছে. কিছু একটা এবারে সবাই মিলে না করলে আর রক্ষা নেই.