সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নিজের পদ না ছাড়ার নতুন ঘোষণা করেছেন ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি হোসনি মুবারক, এই ঘোষণা শুধু ইজিপ্টের বিরোধী পক্ষেরই অপছন্দের কারণ হয় নি, ওয়াশিংটনেরও হয়েছে. সেখানে যদিও ক্রমাগত বলে যাওয়া হচ্ছে যে, অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো হবে না, আর ইজিপ্টের জনগনই নিজেদের নেতৃত্ব নিজেরা নির্বাচন করবেন. কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকেরই মনে হয়েছে যে, ওয়াশিংটন আজ মুবারকের দ্রুত ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী. এখন কি হচ্ছে "রেডিও রাশিয়াকে" দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাজনীতিবিদ স্তানিস্লাভ তারাসভ এই রকমের মন্তব্য করে বলেছেন:

    "খুবই অসাধারন ও আশাতীত লাগছে আমেরিকার প্রশাসনের ইজিপ্টের ঘটনার প্রতি সম্পর্ক ও মুবারকের প্রতিও. হোসনি মুবারক বহু কাল ধরে পশ্চিমের ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সবচেয়ে ভরসা করার মতো ও পরম্পরা মেনে চলা সহকর্মী, এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক, যিনি এই অঞ্চলে একটা ভারসাম্য বা স্ট্যাটাস কো সমর্থন করে চলেছিলেন. ইজিপ্ট আঞ্চলিক ভাবে ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করেছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সহযোগিতা পেয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের পছন্দ মত নিকট প্রাচ্যের রাজনীতি চালিয়ে এসেছে. কিন্তু এখন ওয়াশিংটন মুবারককে দিয়ে দিচ্ছে. আমেরিকার প্রশাসনের ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতির উপরে চাপ সৃষ্টি করার মতো সমস্ত রকমের উপায় রয়েছে. তারা মুবারকের সঙ্গে এর আগে মঞ্চের আড়ালে আলোচনা করে বর্তমানের ঘটনার উত্তেজনা প্রশমণ বা একেবারেই হতে না দিতে পারতো. কিন্তু আমেরিকার প্রশাসনের প্রতিনিধিরা এমন সমস্ত ঘোষণা করতে শুরু করেছিলেন, যা শুধু বিরোধী পক্ষকে আরও পরিস্থিতি গরম করতে সাহায্য করেছে. এই ক্ষেত্রে হঠাত্ করে বিশেষ কিছুই বাস্তবে ঘটে নি. কিছু দিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রপতির ইউরো এশিয়া ও রাশিয়া সংক্রান্ত সহকারী ম্যাকফলের এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইজিপ্টের পরিস্থিতির বিষয়ে আমেরিকার অবস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া ঘোষণা দেখলেই তা বোঝা যায় এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে সমর্থন রয়েছে, আর অন্য দিকে তারা বিরোধী পক্ষের সঙ্গেও কাজ করছে".

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিকট বা মধ্য প্রাচ্যে যাই করুক না কেন, তারা নিজেদের ভূ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই তা করে থাকে. সোভিয়েত দেশ পতনের পরে এই অঞ্চলের ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করায়ত্ত ছিল. তারা নিজেদের ইরাকের উপরে হামলা করতে দিয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন আদায় করেছে আফগানিস্তানের সামরিক অনুপ্রবেশের বিষয়ে, তারা ইরানের দিকেও বড় মাপের ঝঞ্ঝার উদ্যোগ নিয়েছিল. কিন্তু বাস্তবের ঘটনার পরম্পরা এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক কে অস্থিতিশীল অঞ্চলে পরিনত করেছে, এমনকি নিজেরাই জানে না কি করে ইরাকের পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারবে. বিশ্বে বহু প্রশ্ন ও নিন্দা হয়েছে আমেরিকার কায়দায় আফগানিস্তানের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য. ইরানের উপরে সামরিক আঘাত হানার কথা বোধহয় এখনকার কাজের তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে. দেখাই যাচ্ছে এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমেছে. সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, মার্কিন প্রশাসনে ও অন্যান্য মার্কিন দপ্তরে দুটি দল তৈরী হয়েছে, যারা নানা ভাবে আমেরিকার প্রভাব সংরক্ষণের কথা ভাবছে. এক দল ভাবছে স্ট্যাটাস কো সংরক্ষণের কথা, এই কথা মনে করে যে, তাহলেই আমেরিকার প্রধানের মত প্রভাব সংরক্ষণ সম্ভব, অন্য দল দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলে চরমপন্থী ঐস্লামিক দল গুলির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ও তাই মনে করেছে যে, এদের মধ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি দিয়েও বেশী প্রভাব বিস্তার করা যাবে না. এই দল মনে করেছে যে, তথাকথিত ভারসাম্য বজায় রাখা ঐস্লামিক দল গুলি যদি ক্ষমতায় প্রবেশ করে, তাহলে তাদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া থাকলে এই নতুন ভয়ঙ্কর ঢেউ কে জোয়ারের সময়ে ভাঙ্গার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তারা চরমপন্থীদের আটকে রাখতেও পারে. ইজিপ্টে এই ধরনের হতে পারত "মুসলমান ভাইদের" দল. যদিও মুবারকের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে দেশের গুপ্তচর বাহিনী আমেরিকার গুপ্তচর দের সাথে হাত মিলিয়ে এদের নির্বিচারে ধ্বংস করেছিল, তবুও এই বিরোধী পক্ষ নিজেদের দেশের রাজনৈতিক জীবনে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে. তারা বর্তমানের ইজিপ্টে বিরোধী পক্ষের অংশ. তারা কি বর্তমানের ইজিপ্টে মার্কিন অনুগত নতুন রাজনৈতিক পক্ষের লোক হিসাবে ক্ষমতায় আসতে পারে?

    হোসনি মুবারকের নেতৃত্বে ইজিপ্টের সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র জোটের দল নয়. বর্তমানে এই দেশের ঘটনা ওদের অন্য জোটের পক্ষের লোকেদের কি সঙ্কেত দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে স্তানিস্লাভ তারাসভ বলেছেন:

    "একটা উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে. যারা পশ্চিম বা আমেরিকার পক্ষে থাকা সরকারের দলে ছিলেন, তাদের সামনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে, তারা কতটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বা পশ্চিমের উপরে ভরসা করতে পারেন. উপযুক্ত সময়ে আমেরিকা তাদেরকেও নিজেদের ভূ রাজনৈতিক স্বার্থে বলি দেবে না তো? সম্ভবতঃ এই সব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত লোকেরা শিক্ষা নেবেন. তারা দল বাঁধতে শুরু করবেন, যাতে একসাথে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হয়, নতুন জোটের লোক খুঁজতে বের হবেন".