পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আন্তর্দেশীয় বিমান পরিবহন পরিষদের মস্কো শহরে স্মোলেনস্ক শহরের উপকণ্ঠে বিমান দূর্ঘটনার তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের খবর পেয়ে তড়িঘড়ি নিজের ছুটি মুলতুবি করে রাজধানী ওয়ারশ ফিরে এসেছেন. পোল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যম থেকে জানানো হয়েছে যে, বৃহস্পতিবারে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই দেশের পরিষদের সঙ্গে, যাঁরা এই দূর্ঘটনার তদন্ত করেছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করবেন. পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি লেখ কাচিনস্কির বিমান টি ইউ – ১৫৪ ১০ ই এপ্রিল ২০১০ সালে ভেঙে পড়েছিল, দুর্ঘটনায় ৯৬ জন নিহত হয়েছিলেন, তার মধ্যে রাষ্ট্রপতি ও তাঁর স্ত্রী সহ দেশের বহু নেতারাও ছিলেন.

রাষ্ট্রপতির বিমান ভেঙে পড়ার কারণ ছিল চালকদের যেন তেন প্রকারেণ এই বিমানকে স্মোলেনস্ক বিমান বন্দরে অবতরণ করানোর প্রচেষ্টা. আন্তর্দেশীয় বিমান পরিবহন পরিষদের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, স্মোলেনস্ক শহরের "সিয়েভেরনি" বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের কর্মীরা একাধিক বার টি ইউ ১৫৪ বিমানের চালকদের খারাপ আবহাওয়া ও কুয়াশা সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়েছিলেন. রাশিয়া ও পোল্যান্ডের বিশেষজ্ঞরা সম্মিলিত ভাবে এই দূর্ঘটনা সম্বন্ধে তদন্ত করতে গিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, চালকদের উপরে খুবই জোরালো মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল. পাইলটের কেবিনে অন্য লোক ছিলেন. তাঁরা স্মোলেনস্ক শহরেই বিমান নামানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন. পোল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির প্রশাসনের প্রোটোকল দপ্তরের ডিরেক্টর ও পোল্যান্ডের বিমান বাহিনীর প্রধান আঞ্জেয়া ব্লাসিকা পাইলটের কেবিনে যে সব কথাবার্তা বলেছেন তা বিমানের "ব্ল্যাক বক্স" থেকে পাওয়া গিয়েছে, আর পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ব্লাসিকা ছিলেন মদ মত্ত অবস্থায়. "যদি এই ধরনের চাপ দেওয়া না হত, তাহলে এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটত না" – এই কথা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বীর পদক প্রাপ্ত বিমান পরীক্ষা করার পাইলট মাগমেদ তলবোয়েভ বলেছেন:

"তাঁরা চালকদের নিজেদের পাইলটের কেবিনে যাতায়াত, কথাবার্তা দিয়ে, উপদেশ দিয়ে অসুবিধা করেছেন. চালকদের প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ রকমের বিচ্ছিন্ন অবস্থা, কারণ পরিস্থিতি যত খারাপ, পাইলটের কেবিনে নৈশব্দের প্রয়োজন ততই বেশী. কে দায়ী? এই সব রাজনৈতিক নেতারা, যাঁরা এই বিমানের ভিতরে ছিলেন. এখানে চালকেরা দ্বিতীয় সারির দায় বহন করে, যার কিছুটা আবার আবহাওয়ার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপের উপরে নির্ভর করেছে".

পোল্যান্ডের বিমান পরিবহন সভার বিমান প্রযুক্তিবিদ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ  টমাশ খীপকির মতে এই বিমান দূর্ঘটনা কোন একটি কারণে ঘটে নি, এর কারণ একসাথে অনেক গুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে. তার মধ্যে তিনি বলেছেন সার্বিক নিয়মের অভাব, পোল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায়ভার অস্বীকার করার প্রচেষ্টা. "এখন পরিস্থিতি এমন যে, রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বহীণতা তাদের পেছনে থাকা সমস্ত লোকের দায়িত্বহীণতার কারণ হয়েছে, এমনকি তাদের মধ্যে পাইলট ও যাঁরা এই উড়ানের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁরা সবাই রয়েছেন". – পোল্যান্ডের এই বিশেষজ্ঞ বলেছেন:

"রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ চলতেই থাকবে, এটা এহ বাহ্য. কারণ একটি পক্ষ, যারা রাশিয়ার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে তার থেকে রুশ বিরোধীতার বা রুশ আতঙ্কের নামে রাজনৈতিক ফায়দা তুলবে নির্বাচনের সময়ে ভোটের বাক্সে, তারা রয়েছে – এরা "আইন ও ন্যায়" নামের দলের লোক. আর অন্য পক্ষ – যারা প্রশাসনে রয়েছে – তারা নিজেদের উপর থেকে সমস্ত দায়িত্ব এড়াতে চাইছে, কারণ তারা বাধ্য ছিল এই সব কিছু নিয়ে উত্তর দেওয়ার. পাইলটেরা এই শৃঙ্খলের সব থেকে নীচে রয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, সমস্ত রকমের দায়িত্ব এড়ানোর প্রচেষ্টা, সব কিছুতেই, এমনকি চালকদের প্রয়োজনীয় উড়ানের অভিজ্ঞতা, তাদের জন্য প্রশিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা, বিমানে জ্বালানীর অভাব ইত্যাদি. আর এই সমস্ত কিছুই দেন নি – রাজনৈতিক নেতারা. তারা তো জানতেন যে, এই বিমান বন্দর একটা স্বাভাবিক অবস্থায় বন্ধ বিমান বন্দর, তাও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানেই উড়ে যাওয়ার. এর জন্য কে উত্তর দেবে? যদি পোল্যান্ড স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে চায়, তাহলে এই ধরনের কাজ করার ধারণা পাল্টাতেই হবে, আর আমি আশা করবো যে এই ধরনের রাজনৈতিক নেতা এখন হোক বা পরেই হোক উদয় হতে বাধ্য. আমি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করাতে চাই যা আমাদের রাষ্ট্রপতি ব্রোনিস্লাভ কমারোভস্কি বলেছেন: 'সত্য – সেই রকমই যা রয়েছে. তা পোল্যান্ডের লোকেদের জন্য ট্র্যাজেডির ও এই দূর্ঘটনার সমস্ত দায়ভার পোল্যান্ডের পক্ষের, তার মধ্যে চালকদের দায় আছে, যারা খারাপ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, আর এর উড়ানের বিষয়ও সঠিক ভাবে তৈরী করা হয় নি'. আমি মনে করি যে এই সত্য কথা, যা রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তা বেশীর ভাগ পোল্যান্ডের জনগন, যারা নিজেদের স্বার্থ চিন্তা করছেন ও বেশীর ভাগ পোল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, তাদের সকলেরই মাথায় ঢুকবে, তারা এর প্রতি মনোযোগ দেবেন, আর শেষ অবধি দেশের পরিস্থিতির বদল হবেই".

স্মোলেনস্ক শহরের উপকণ্ঠে বিমান দূর্ঘটনার তদন্ত অনেক দিন হল রাজনৈতিক স্তরে চলে এসেছে. এ সম্বন্ধে বিচার করা সম্ভব, যদি পোল্যান্ডের সমাজে নতুন এক শব্দ চয়ন "স্মোলেনিজাতসিয়া" – বা এই ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনা ঘিরে খুব বেশী রকমের রাজনৈতিক ফাটকা বাজী যা হচ্ছে, তার নাম হিসাবে এটি ব্যবহার করাকে দেখা হয়.

কিন্তু আন্তর্দেশীয় বিমান পরিবহন পরিষদের, যেখানে পোল্যান্ডের বিশেষজ্ঞরাও অংশ নিয়েছেন, রিপোর্টকে বা তার ফলকে সন্দেহ করার কোন কারণ নেই. পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এঝি মিল্লের আন্তর্দেশীয় বিমান পরিবহন পরিষদের এই রিপোর্টের উপর কাজ শেষ হওয়াতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন. "রিপোর্ট – এটা পরবর্তী অধ্যায় যাওয়ার পথ – এই বিপর্যয়ের পিছনে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার উপায়". – তিনি এই কথা বলেছেন, পোল্যান্ডের তরফ থেকে নিজেদের আলাদা অনুসন্ধানের বিষয়কে মনে রেখে. প্রসঙ্গতঃ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের তুলনায় পোল্যান্ডের পরিষদের রিপোর্ট হবে পোল্যান্ডের পক্ষে "আরও কড়া". বৃহস্পতিবারে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এক সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দেবেন, যাতে তিনি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন পরিষদের রিপোর্ট সম্বন্ধে নিজের মন্তব্য বলবেন.