এক শতাব্দী তলস্তয়ের অনুপস্থিতিতে কেটেছে তলস্তয়ের সঙ্গ পেয়ে. ২০১০ সালকে এভাবেই রাশিয়া ও সমসাময়িক বিশ্বে দেখা হয়েছে নতুন করে এই গুরুত্বপূর্ণ স্মরণীয় দিনকে পুনর্মূল্যায়ণ করার জন্য: লেভ তলস্তয়ের শততম মৃত্যু বার্ষিকী – যাঁকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ বলে মনে করা হয়.

    "আমরা লেভ তলস্তয়ের মৃত্যুর দিনটিকেই শুধু স্মরণ করি না, স্মরণ করি সেই দিনটিকে, যার পর থেকে একশ বছর ধরে বুঝতে পেরেছি যে, তলস্তয় এতই মহান যে, তিনি কোনদিনই মরবেন না". এই ভাবেই রুশ কথা সাহিত্যের ক্ল্যাসিক লেখকের প্রপৌত্র ভ্লাদিমির তলস্তয় এই স্মরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান গুলির সম্বন্ধে বলেছেন, যা হয়েছে দেশে ও বিদেশে. এর মধ্যেই ছিল "মনীষীদের বাগান" নামে এক আন্তর্জাতিক শিল্প উত্সব, ব্রিটেন থেকে তলস্তয়ের জীবন নিয়ে তোলা ছবি, তাঁর শিল্প নিয়ে রোম ও নিউ ইয়র্কে সম্মেলন, আর লেখকের শেষ রচনা "হাজি মুরাত" নিয়ে নতুন মনুমেন্টের উদ্বোধন. তাছাড়া ঐতিহ্য বাহী ইয়াসনায়া পলিয়ানাতে লেখকের বংশধরদের সমাবেশকে বলা যেতে পারে লেখকের সম্বন্ধে জীবন্ত স্মৃতিসৌধ. আজ সারা বিশ্বে ছড়ানো তলস্তয় পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৩৫০ জন. লেখকের প্রপৌত্র সাংবাদিক পিওতর তলস্তয় এই পরিবারের জাতিগত বিশেষত্ব নিয়ে "রেডিও রাশিয়া"কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন:

    "আমার মনে হয়, লেভ তলস্তয়ের সমস্ত বংশধরদের অন্যতম বিশেষত্ব হল জীবনের প্রতি অনাবিল আগ্রহ, যা তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া. কারণ লেভ তলস্তয় যাই করে থাকুন, সবই করেছেন প্রচুর আগ্রহ সহকারে, এমন কি বলা যেতে পারে এক ধরনের বাজী ধরার মতো করে, যাতে প্রথম হওয়ার ইচ্ছা প্রবল, শেষ অবধি যাওয়া আর নিজের কাছে সত্ থাকা".

    এই গুণের প্রতিসরনের মধ্য দিয়েই - অংশতঃ এই স্মরণীয় বছরে লেভ তলস্তয়ের জীবনীর অনেক ঘটনাকেই দেখা হয়েছে আবার করে, বিশেষত তাঁর গৃহ ত্যাগ, যা তাঁর বেদনা দায়ক মৃত্যুর কারণ হয়েছে. মস্কোতে লেখকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত যাদুঘরে এই বিষয়ে এক তথ্য মূলক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল – নাম দেওয়া হয়েছিল "তিনি ও তাঁর স্ত্রী" – তলস্তয় ও তাঁর সহধর্মিনীকে উদ্দেশ্য করে. তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ককে উল্লেখ করে. লেভ তলস্তয়ের স্মরণীয় মহান রচনা "আত্মপ্রকাশ" লেখার সময়েই তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হতে শুরু করেছিল, কারণ এই লেখা লিখতে গিয়ে লেখকের পুনর্জন্ম হয়েছিল নিজের মধ্যেই. মনীষীর তখন অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী করেই প্রয়োজন পড়েছিল যে তাঁকে বোঝার চেষ্টা হোক, কিন্তু তিনি সবচেয়ে কাছের লোকের কাছ থেকে এই বিষয়ে সহায়তা পেয়েছিলেন সবচেয়ে কম.

    সততার সঙ্গেই মস্কোতে লেখকের স্মরণে আয়োজিত হয়েছিল রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জার সঙ্গে লেখকের বিরোধ নিয়ে তর্কের. যা বিশ্বের সকলেরই জানা রয়েছে ও যা এখনও রাশিয়ার সমাজকে বিড়ম্বিত করে. এখানে ঐতিহাসিক সত্য হল – ১৯০১ সালে পবিত্র সিনোডের সিদ্ধান্তে লেভ তলস্তয়কে গির্জার থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল. লেখক নিজেই এই সিদ্ধান্তকে বলেছিলেন ন্যায় বিচার ও নিজে তার সমর্থনও করেছিলেন, এই বলে যে, তিনি বুঝতে পারেন যে, গির্জা যে রকম মনে করে, তিনি সেই অর্থে গির্জার সদস্য হতে পারেন না. তাই বর্তমানেও রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জা জনমত অন্য হলেও নিজেদের সিদ্ধান্তকে বদল করতে পারে না.

    আসলে, এই তর্ক বিতর্ক দেখিয়েছে যে, সততা খুবই সংক্রামক. রুশ সাহিত্যের আমেরিকার প্রফেসর মার্ক টিটের মন্তব্য করেছেন: "বেশীর ভাগ লোকই তলস্তয় সম্বন্ধে শুধু নামেই জানেন, হয়ত তাঁর লেখা পড়েন নি". আর এটা এই প্রসঙ্গে যে, তলস্তয়ের লেখা যদিও বিশ্বের ৩২০টি ভাষাতে অনুদিত হয়েছে, আর তাঁর লেখা "যুদ্ধ ও শান্তি" বাইবেলের পরেই সবচেয়ে বেশী বার ছাপা হয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় ছাপা বই হয়ে রয়েছে.

    মার্ক টিটের বলেছেন:

    "বহু আমেরিকার লোকই এই উপন্যাসকে এক মহান উপন্যাস বলে থাকেন, যা যে কোন শিক্ষিত আমেরিকা বাসীর পড়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়. তাদের জন্য এই উপন্যাস এক ধরনের আইকন, কিন্তু খুব কম লোকই এটা মন দিয়ে পড়েছে. এই বই সম্পূর্ণ আলাদা রকমের এক উচ্চতায় রয়েছে, আর তার পড়ার ফলে অবশ্যই বুদ্ধিজীবির জন্ম হয়. মানসিক ভাবে বিকশিত হওয়ার জন্য সিনেমা "যুদ্ধ ও শান্তি" দেখাই যথেষ্ট, কিন্তু বুদ্ধির বিকাশের জন্য এই বই একমাত্র পড়ে ফেলা দরকার".

    "সময় এসেছে তলস্তয়কে আবার করে পড়ার", এই কথা বিশ্বাস করেন ভিতালি রেমিজোভ, রাশিয়ার জাতীয় সাহিত্যের যাদুঘরের তিনি প্রধান. ২০শে নভেম্বর লেখকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত দিনে তিনি আহ্বান করেছেন সকলকে এক ছোট রেল স্টেশন আস্তাপোভো তে হাজির হতে. এই খানেই লেভ তলস্তয়ের জীবনাবসান হয়েছিল – "১২ নম্বর রেল গাড়ীর এক যাত্রী" – লেখক এই ভাবেই তাঁর মরনাপন্ন অবস্থায় রেল গাড়ী থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর যে ডাক্তার তাঁকে দেখেছিল – তাঁকে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন.

    "রেডিও রাশিয়া"কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ভিতালি রেমিজোভ বলেছেন:

    "সমস্ত মানব সমাজের জন্যই লেভ তলস্তয় তাঁর জীবত্কালে ছিলেন এক মূল্যবোধের প্রতীক, এটা সকলেই মানেন. আজ এই ধরনের কোন একক লোক আর নেই. সেই কারণেই সারা বিশ্বে স্বাভাবিক ভাবে আজ বিভিন্ন পেশার লোকেরা লেখকের কথার দিকে খেয়াল করেন. তাও লেভ তলস্তয় এখনও আমাদের বহু দূরের ভবিষ্যত মানব সমাজ, দুঃখের হলেও নিজেদের মূল্যবোধের খোঁজে এখনও অনেক অপরিণত".

    ভিতালি রেমিজোভ বিশ্বাস করেন: "মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে, এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে হিংসা, দ্বেষ, বিরোধকে ত্যাগ করে প্রেম ও সৌভ্রাতৃত্বের দর্শনকে গ্রহণ করতে হবে – তখনই বোঝা যাবে যে, লেভ তলস্তয় এই সম্বন্ধেই লিখেছেন – বিশ্বে অনেক কিছুই তখন পাল্টে যাবে!"