রাশিয়া ও ভারত আবার বিশ্ব জনসমাজকে দেখিয়েছে, কিভাবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত. দশ বছর আগে মস্কো ও দিল্লি আন্তর্জাতিক-বিধানিক ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক শরিকানার উপলব্ধি চালু করেছিল. ২০-২২শে ডিসেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দমিত্রি মেদভেদেভের এবারের সফরের সময় দু দেশ চালু করেছে নতুন উপলব্ধি- “প্রাধান্যমূলক স্ট্র্যাটেজিক শরিকানা”.

   পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের একটি, বিখ্যাত তাজমহল পরিদর্শন, ভারতের একটি প্রধান প্রযুক্তি বিষয়ক উচ্চশিক্ষালয়ের ছাত্রদের সাথে আলাপ, দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ৩০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে. দমিত্রি মেদভেদেভের ভারত সফর ছিল সমুজ্জ্বল ও পরিপৃক্ত, ভারতীয় চলচ্চিত্রের মতো.

    প্রসঙ্গত, রাশিয়ার রাষ্ট্রনেতা “বলিউডে” - পৃথিবীর বৃহত্তম চলচ্চিত্র স্টুডিওতেও গিয়েছিলেন. এখানে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার চলচ্চিত্র তোলা হয়. দমিত্রি মেদভেদেভ একটি শুটিং দেখেন, “ইন্দুস” (“হিন্দু”) নামে রুশ-ভারত সিরিয়ালের অভিনেতাদের সাথে পরিচয় করেন, এবং ভারত ও রাশিয়ার চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের সাথে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দু দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা আলোচনা করেন. দমিত্রি মেদভেদেভ উল্লেখ করেন, “রাশিয়াবাসীরা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি অনুরাগীদের মধ্যে পড়ে, আর ব্যক্তিগতভাবে আমি  “শ্রী-৪২০” চলচ্চিত্রটি দেখেছি সত্তরের দশকের গোড়ায়”.

   তিনি বলেন, আমরা জানি রাশিয়ায় ভারতীয় চলচ্চিত্র কত জনপ্রিয়. আমি শুধু উল্লেখ করতে চাই যে, এই অর্থে, আমাদের দেশ, হয়ত এমন এক দেশ, যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশিমাত্রায় ভালবাসে. আমাদের দেশে এমনকি স্পুতনিক চ্যানেলও আছে, যাতে দিনে ২৪ ঘন্টা ভারতীয় চলচ্চিত্র দেখানো হয়. মনে হয়, এমন চ্যানেল ভারতে ছাড়া আর কোথাও নেই. আর আমাদের দেশে আছে. সেইজন্য আমাদের দু দেশের জনগণের, নিঃসন্দেহে, পরস্পরের প্রতি বিপুল আকর্ষণ আছে. আমরা আনন্দিত যে, এ সম্পর্ক বিকশিত হচ্ছে.

   রাশিয়া ও ভারতের জনগণের পরস্পরের প্রতি যে বিপুল আকর্ষণ আছে, তা আরও লক্ষ্য করা গিয়েছিল মুম্বাইয়ে আই.আই.টি উচ্চ শিক্ষায়তনের ছাত্র ও অধ্যাপকদের সাথে দমিত্রি মেদভেদেভের সাক্ষাতে. প্রায় তিনশো জন এক ঘন্টার উপর প্রশ্ন করে রুশ-ভারত সম্পর্ক সম্বন্ধে, পররাষ্ট্রনীতি সম্বন্ধে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সম্বন্ধে এবং বিশ্ব নিরাপত্তা সম্বন্ধে, ২৪ বছরবয়সী ছাত্র সুদীপ নাখে সাগ্রহে গ্রহণ করে দমিত্রি মেদভেদেভের এ বিবৃতি যে, রাশিয়া ও ভারত উচ্চ শিক্ষায়তনের মাঝে অ্যাকাডেমিক্যাল বিনিময় বাড়াবে. ভারতীয় ছাত্রটি রুশ ভাষা শেখার কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবতে শুরু করেছে. সে বলেঃ

   রাশিয়া আমার আগ্রহ জাগায় কেন? কয়েকটি কারণে. প্রথমত, আমার খুব ভাল লাগে রাশিয়ার লোকেদের, রাশিয়ার সংস্কৃতি. দ্বিতীয়ত, আপনাদের রাষ্ট্রপতিকে আমার ভাল লেগেছে. আর সবশেষে বলি যে, রাশিয়া ও ভারত –স্ট্র্যাটেজিক শরিক. আমি জানি যে, বৈজ্ঞানিক-প্রযুক্তিগত প্রকল্পের ক্ষেত্রে আপনাদের দেশে বিপুল কাজ হয়েছে, সেইজন্য, ছাত্র-বিনিময়ের কর্মসূচির প্রতি আমার আগ্রহ আছে, আর আমার নিজের রাশিয়ায় পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে আছে.

   সহযোগিতার কথায় এসে দমিত্রি মেদভেদেভ উল্লেখ করেন যে, ওষুধ তৈরি এবং কম্পিউটার প্রকৌশলের ক্ষেত্রে ভারত খুবই শক্তিশালী. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতিকে দেখানো হয় ন্যানো-টেকনোলজির ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনা- বিস্ফোরক বস্তুর ডিটেক্টর. ভারতের জন্য সন্ত্রাসবাদের সমস্যা খুবই তীব্র. দু বছর আগে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির আগের সফর হয়েছিল মুম্বাইয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের মাত্র কয়েক দিন পরে, যাতে প্রায় ১৮০ জন নিহত হয়েছিল. এবারে স্খানীয় গোয়েন্দা বিভাগ আবার সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের সঙ্কেত পেয়েছিল. সেজন্য নিরাপত্তার অভূতপূর্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল.

   দমিত্রি মেদভেদেভ জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে রাশিয়া ভারতকে সাহায্য করতে প্রস্তুতঃ

   রাশিয়া ও ভারতের অতি ভিন্ন ভিন্ন ধারায় শরিকানা আছে, সেই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ব্যাপারেও. আর সাহায্যের কথা যদি ওঠে, তাহলে বলব যে, আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত এবং সাহায্য করব.

    মস্কো ও দিল্লি ৩০টি দলিল স্বাক্ষর করেছে. যেমন, রাশিয়া ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করবে, ভারতীয় সমরসেবীদের রকেট সরবরাহ করবে, মিলিতভাবে পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার বিমান তৈরি করবে, বেসামরিক এভিয়েশন বিকাশ করবে, মহাকাশে মিলিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং “গ্লোনাস” স্পুতনিক নেভিগেশন ব্যবস্থার রিসিভার সরঞ্জাম উত্পাদন করবে. তাছাড়া, ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার স্কোলকোভো নবায়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করতে পারবে. তাছাড়া, দমিত্রি মেদভেদেভ বলেন যে, রাশিয়া ভারতকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য-পদের যোগ্য প্রার্থী বলে মনে করে.

   রাশিয়া ও ভারত উভয় পক্ষই অর্জিত সমঝোতার সংখ্যা এবং প্রধান কথা, তার গুণগত মানে সন্তোষের বিষয় আড়াল করে নি. দমিত্রি মেদভেদেভের ভারত সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে গভীর প্রভাব রেখে গেছে, উল্লেখ করেছে ভারতীয় পত্র-পত্রিকা.