তুর্কমেনিস্তান – আফগানিস্তান – পাকিস্তান – ভারত গ্যাস সরবরাহ পাইপ লাইন, যা নিয়ে আজ আশখাবাদ শহরে চুক্তি স্বাক্ষর হতে চলেছে, তা তাত্ত্বিক দিক থেকে এই চারটি দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ. বিশেষ করে আফগানিস্তানের জন্য, যার এলাকার মধ্য দিয়ে এই পাইপ লাইন বসবে. যদি তা এখানে করা সম্ভব হয়, তবে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরী হবে, দেশের শক্তি সংক্রান্ত ব্যবসাতে উন্নতির সম্ভাবনা হবে. এখানে প্রশ্ন যে বিষয়ে আছে – তা হল এই তাপি প্রকল্প রূপায়ণ করা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবে কতটা সম্ভব হতে পারে.

    আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে গ্যাস পাইপ লাইন বসানোর প্রকল্পের ইতিহাস অনেক দিনের, এই প্রকল্পের প্রাথমিক চিন্তা করা হয়েছিল গত শতকের নব্বইয়ের দশকের প্রথম অর্ধে, যখন তুর্কমেনিস্তানের প্রশাসনের নেতৃত্ব দিতেন সাপারমুরাদ নিয়াজভ. সেই সময়ে নাম করা হয়েছিল "ডেলটা", আমেরিকার "ইউনিক্যাল" ইত্যাদি কোম্পানীর, যারা এই প্রকল্প তৈরী করবে. প্রকল্প বেশ কয়েকবার কবর দেওয়া হয়েছে ও আবার আমেরিকার স্বার্থের কথা ভেবে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে. বর্তমানে চলছে এতে নতুন করে জীবন দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা – এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই গ্রোজিন চেষ্টা করছেন অঞ্চলকে এই প্রকল্প কি দেবে? - ব্যাখ্যা করে বলার:

    "পাইপ লাইন বসাবো আর উন্নতি করতে থাকবো – এই ধরনের আশার সঞ্চার ছাড়া কঠোর বাস্তব রয়েছে. প্রধান সমস্যা – আফগানিস্তানের স্থায়ী অশান্ত পরিস্থিতি. অন্য একটা সমস্যা, যা আফগানিস্তানের সঙ্গেই জড়িত, তা হল, এর জন্য কোথায় বিনিয়োগ কারী পাওয়া যাবে. বর্তমানের আফগানিস্তান – কম করে বললে বিদেশী পূঁজি বিনিয়োগের জন্য খুব একটা লোভনীয় জায়গা নয়. আর এই গ্যাস পাইপ লাইনে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকি নেওয়ার মত কাজ, রাস্তা বানানো বা বাণিজ্য বাড়ানোর মত সহজ নয়. সন্ত্রাসের জন্য গ্যাস পাইপ লাইন খুবই স্পর্শকাতর জায়গা. তা সব সময়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, এই কথা সকলেই বুঝতে পারছে, আর তার জন্য যেখান দিয়ে পাইপ লাইন বসবে, সেখানকার সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত ছোট বড় নেতাকেই যে পয়সা দিতে হবে, তা এহ বাহ্য".

এটা শুধু আফগানিস্তানের জন্যই প্রযোজ্য নয়. পাকিস্তানের যে প্রদেশ দিয়ে পাইপ লাইন বসবে, সেখানেও বিরোধ রয়েছে. যেমন, বেলুচিস্থান. যদি সেখানকার স্থানীয় নেতা ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের দলপতিদের এই পাইপ লাইন সুরক্ষা করার জন্যও পয়সা দিতে হয়, তবে বোঝাই যাচ্ছে যে, এই প্রকল্পের নির্মাণের ও ব্যবহারের ব্যয় বিশাল হবে. এখানে ধারণা করা যেতে পারে যে, আফগানিস্তানে একটা লড়াই শুরু হবে, কে কোন অঞ্চলে গ্যাস পাইপ লাইন সুরক্ষার জন্য দায় নেবে. অর্থাত্ প্রকল্পের ব্যয়ের অঙ্ক অবশ্যই বাড়বে – এটাও এহ বাহ্য. আর বিনিয়োগ নিয়ে কি হল? এই প্রশ্নের আপাততঃ শেষ অবধি উত্তর মেলে নি, - এই কথা উল্লেখ করে আন্দ্রেই গ্রোজিন বলেছেন:

"এশিয় পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়ন ব্যাঙ্ক, যারা এই তাপি প্রকল্পের প্রযুক্তিগত-অর্থনৈতিক হিসাব করার জন্য অর্থ দিয়েছে ও এই ধরনের হিসাব, যা গত দশ বছরে কম করে হলেও পাঁচ বার করা হয়েছে, - তারা এই নির্মাণের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে, মনে তো হয় না যে তৈরী হবে. একই রকম ভাবে বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও রাজী হবে না. যতই বলা হোক না কেন, বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য লোক পাওয়া যাবে, আপাততঃ তা রাজনৈতিক ঘোষণা হয়েই রয়েছে. প্রত্যেকেই এই প্রকল্প নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক ও এমন কি রাজনৈতিক কৌশলের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহার করছে".

এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, তাপি প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো আরও প্রকল্প রয়েছে. যেমন, ইরান থেকে পাকিস্তান হয়ে ভারত অবধি গ্যাস সরবরাহের প্রকল্প. প্রযুক্তিগত দিক থেকে তা তাপি প্রকল্পের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়. কিন্তু এই প্রকল্প আমেরিকার প্রশাসনের কাছে রাজনৈতিক কারণে পছন্দের নয় ও তারা নিয়মিত তা নষ্ট করার চেষ্টা করছে. একই সঙ্গে তারা নাবুক্কো গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পকে সমর্থন করছে, যে প্রকল্পের গ্যাস সরবরাহ করার একটি উত্স আবার সেই তুর্কমেনিস্তানের উত্পাদন ক্ষেত্র. আরও লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, এখনও তুর্কমেনিস্তানের সম্ভাব্য গ্যাসের ভাণ্ডারের পরিমান সংক্রান্ত কোন বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সর্ব সম্মত ধারণাই নেই. সুতরাং, এটা রাজনৈতিক প্রকল্পের জন্য সাধারন ব্যাপার, তাপি প্রকল্প এই ধরনেরই, যেমন, নাবুক্কো প্রকল্প.