আমেরিকার সরকার পুনরাবৃত্তি করতে ক্লান্ত হচ্ছে না যে, স্ক্যাণ্ডাল তৈরী করা বিখ্যাত উইকিলিক্স সাইটে ফাঁস হওয়া খবর নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন. এরই মধ্যে সাইটে ফাঁস করা দলিল গুলি দেখলে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে যে, তাতে এমন কিছু নেই, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়. কিন্তু অন্য কিছু দেশ, বিশেষত নিকট প্রাচ্যের দেশগুলির স্বার্থের জন্য বেশ কিছু বিষয় ভাল রকমই ধাক্কা খেয়েছে – বলা যেতে পারে অনেকখানিই.

    বিশেষজ্ঞরা যে রকম উল্লেখ করেছেন, এখানে সেই সমস্ত সরকারকে নিয়ে কথা আছে, যাদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সহজ নয়, আর সেই সমস্ত সহযোগী দেশ, যাদের কাজকর্ম নিয়ে কোন না কোন কারণে ওয়াশিংটন সন্তুষ্ট হতে পারছে না. যে রকম প্রকাশিত দলিলে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উপদেষ্টাদের সম্বন্ধে ব্যঙ্গোক্তি রয়েছে. ঠিক করে বলতে হলে ইজরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের বাস্তব পরিপন্থী রাজনীতির কথা বলা হয়েছে. বেশ কিছু দলিল প্রকাশ করা হয়েছে, দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করানোর জন্য. সবার সমক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে যে, বেশ কিছু আরব দেশ ইরানের উপর সামরিক আঘাত হানার জন্য জোর করেছিল. এটা কি সত্যই হয়েছিল, সেটা অন্য কথা. কিন্তু পরিস্কার যে, এই ধরনের তথ্য ফাঁস হওয়ার ফলে ইরান ও অন্যান্য আরব দেশ গুলির মধ্যে সম্পর্ক আরও বেশি করে জটিল হবে ও এই অঞ্চলে উত্তেজনার মাত্রা বাড়বে. ইরানের জন্য বলা যেতে পারে যে, তাদের রাজনীতি, তাদের নেতৃত্ব, এই সমস্ত দলিলে সবচেয়ে খারাপ দিক থেকে দেখানো হয়েছে ও তাদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য দিয়ে ভর্তি.

    এই সব দলিলে আফগানিস্তানের নেতা হামিদ কারজাই এরও চরিত্র চিত্রণ করা হয়েছে অত্যন্ত কুত্সিত ভাবে. প্রকাশিত তথ্য তাঁর উপরেই আঘাত করেছে, তাঁর পরিবারের উপরে ও তাঁর সরকারের উপরেও আগাত করতে ছাড়ে নি. কিন্তু এ ক্ষেত্রে, বোঝাই যাচ্ছে যে, এই সব কিছু করা হয়েছে এই সরকারকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তাকে আরও বাধ্য ও অনুগত করার জন্য, এই কথা মনে করে এই অঞ্চলের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই গ্রোজিন বলেছেন:

    "উইকিলিক্স সাইটে প্রকাশিত তথ্য প্রাথমিক ভাবে সেই সমস্ত দেশের উপরেই আঘাত করেছে যাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক কারণে শত্রু ভাবে ও সেই সমস্ত সহযোগী দেশের প্রতি, যাদের কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্তুষ্ট নয়. যেমন, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে, ইরাকের পরিস্থিতি নিয়ে, ইরানকে নিয়ে, অথবা অন্য কোন দেশকে নিয়ে. এটা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেয়. আর তা হল, এই বিশাল তথ্য প্রকাশ করা ব্যাপারটা অনুমতি পেয়েছিল, অথবা হতে পারে যে, তৈরী করা হয়েছিল আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনীর হাতেই. এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, কে এটা করেছে – জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, সি আই এ, অথবা অন্য কোন আরও বেশী গোপন আমেরিকার গুপ্তচরদের সংস্থা. যে কোন ক্ষেত্রেই খুবই অবিশ্বাসের ব্যাপার হল যে, প্রকাশিত হওয়া বিশাল পরিমান দলিল, যা প্রায় সমস্ত বিশ্বের দেশ গুলির স্বার্থকে ছুঁয়েছে, তা কোন একটা সাইটের ক্ষমতার মধ্যে বা কোন একজন অসন্তুষ্ট মার্কিন সরকারি কর্মীর বা সামরিক বাহিনীর কর্মীর আয়ত্বের নাগালের মধ্যের ব্যাপার, যে সে তা ফাঁস করে দিয়েছে".

    উইকিলিক্স সাইটের প্রতি যখন আমেরিকার সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বজ্র ও বিদ্যুত বর্ষণ করছেন, তখন সেই পরিস্থিতিটা খানিকটা বেন লাদেনের উপরে শাস্তি ঘোষণার মত শোনাচ্ছে বোধহয়. তাকে অভিশাপ দেওয়া হয়, বলা হয়ে আমেরিকার সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু, কিন্তু তার সম্বন্ধে তখনই মনে করা হয় অথবা সে নিজেই জানান দেয়, যখন এটা আমেরিকার জন্য লাভজনক. হয়. অথবা সেই জন্য, যাতে দেশের ভিতরে প্রয়োজনীয় দেশ ভক্তির মাত্রাকে ঠিক রাখতে হয়, অথবা সেই কারণে, যখন সহযোগী দেশগুলি সংশয়ের দোলায় দুলতে থাকে, তাই গ্রোজিন বলেছেন:

"অর্থাত্ দেখা গেল যে, আমাদের সামনে একটা ভাল করে পরিকল্পনা করা অপারেশন করা হয়েছে, - এই সাইটে আফগানিস্তান ও ইরাকের সম্বন্ধে দলিল ফাঁস হওয়ার পরে, তা প্রমাণিত হয়েছে. উইকিলিক্স সাইটকে দেখানো হয়েছিল যে, খুবই নিঃস্বার্থ ও বলা যেতে পারে কি ভাবে যেন আমেরিকার সরকারের বিরোধী সাইট বলে প্রমাণ করতে চাওয়া হয়েছিল. হতে পারে যে, এই সাইটের স্রষ্টার নামে ইন্টারপোল থেকে হুলিয়া জারী করা হয়েছিল, যাতে তাকে সত্য কথনের জন্য তাড়া খেতে হচ্ছে, এমন লোক বলে প্রমাণ করা যায়. এখন এই চরিত্র চিত্রণ, যা এই সাইট তৈরী করেছে, তা সম্পূর্ণ ভাবে কাজ করতে শুরু করেছে, যে রকম দরকার, সেই রকম ভাবে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্দেহ নেই যে, বিশ্বের সমস্ত নেতাদের এই সাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলির বিষয়ে প্রতিক্রিয়াকে খুবই মনোযোগ দিয়ে বিচার করা হচ্ছে ও তাদের মধ্যে ঝগড়া বাধানোর চেষ্টা করা হচ্ছে. ধারণা করা যেতে পারে যে, এবারে আরও দিক স্থির করে তথ্য ফাঁস করা হবে, যা আমেরিকার তৈরী চিত্র নাট্য অনুযায়ী অন্য সব দেশ ও তাদের নেতাদের জন্য তৈরী করা হয়েছে".

অন্যভাবে বলতে হলে, এখানে বোধহয় চক্রান্তের কথা বলা হচ্ছে? আন্দ্রেই গ্রোজিন উল্লেখ করেছেন যে, আসলে চক্রান্তের তত্ত্ব, নানা রকমের গোপন চক্রান্তের কাঠামোতে প্রচুর ফাঁক ফোকর থাকে. কিন্তু এই ক্ষেত্রে চক্রান্ত একেবারে পরিস্কার করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এখান থেকেই মার্কিন কূটনৈতিক দলিল ফাঁস হওয়ার বিষয়ে পূর্বে ও পশ্চিমে অনেক সন্দেহ তৈরী হয়েছে.