রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ল্যারি কিং কে এক সাক্ষাত্কার দিয়েছেন. এই সব প্রশ্ন বর্তমানের প্রধান সমস্যা গুলিকে ঘিরেই ছিল: ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা, উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্থানের পরিস্থিতি, স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্রসজ্জা সংক্রান্ত চুক্তি, উইকিলিক্স সাইটে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ইতিহাস, আর তার সঙ্গে আগামী নির্বাচন এবং গুপ্তচর বাহিনীদের কাজ.

   ল্যারি কিং এর জন্য এটি শেষ রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্কার. ডিসেম্বরে এই কিংবদন্তী সাংবাদিকের অনুষ্ঠান, যা গত ২৫ বছর ধরে সি-এন-এন কোম্পানীর প্রচারের অঙ্গ হয়েছিল ও যেটিকে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নথিবদ্ধ করা হয়েছে, তা শেষ হয়ে যাচ্ছে.  ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য - এটি ল্যারি কিং এর সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাত্কার. প্রথমবার তাঁরা কথা বলেছিলেন ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে. কিন্তু তাদের দুজনের জন্যই কম করে হলেও আরও একটি দেখা হওয়া বাকী রয়েছে: ল্যারি কিং আগামী বছরে রাশিয়া আসবেন বলে আয়োজন করছেন.

   সাক্ষাত্কারের একটি প্রধান বিষয় ছিল স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্রসজ্জা এবং রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা. প্রধানমন্ত্রী যেরকম ঘোষণা করেছেন যে, রাশিয়া কাউকেই কোন ভয় দেখাতে চায় না, কিন্তু যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নূতন স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্রসজ্জা সংক্রান্ত চুক্তি পার্লামেন্টে গৃহীত না হয়, তবে মস্কো বাধ্য হবে তার উত্তরে ব্যবস্থা নিতে, যাতে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে.

   “যদি আমাদের প্রস্তাবগুলির উত্তর শুধু নেতিবাচক হয় আর আমাদের সীমান্তের পাশে বাড়তি বিপদ তৃতীয় প্রতিরক্ষা অবস্থানের নতুন উপায় হিসাবে উদ্ভব হয়, তবে রাশিয়াকে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্তা নানা ভাবে করতেই হবে নূতন বিপদের বিরুদ্ধে নূতন আঘাত হানার ব্যবস্থা করতে হবে, যা আমাদের সীমান্তের পাশেই তৈরী করা হবে, রকেট-পারমানবিক ব্যবস্থার নূতন প্রযুক্তি তৈরী করতে হবে. এটা আমাদের বাছা পথ নয়, আমরা এটা চাইও না”.

   জাতীয় সভার সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ ঘোষণা করেছেন যে, রাশিয়া প্রস্তাব করেছে নিরাপত্তার বিষয়ে সকলের সমস্যা নিয়ে একসাথে কাজ করার, এ কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন পুতিন. আমরা ন্যাটো জোটের সঙ্গে তথ্য বিনিময় নিয়ে চুক্তি করতেই পারতাম, সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েও হতে পারত, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত রাশিয়ার স্বার্থের বিষয় দেখা না হচ্ছে, ততক্ষণ তা করা সম্ভব নয়. ইরানের পারমানবিক বিপদের বিষয়ে, আপাততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ব্যবহার করছে, রাশিয়ার সীমান্তের ধারে ২০১৫ সালে রাডার ও রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা বসানোর জন্য. রাশিয়া নিজেদের রকেট গুলিকে তো আর আমেরিকার এলাকার কাছে বসাতে যাচ্ছে না,  কিন্তু এই ধরনের পরিকল্পনা রাশিয়াকে না চিন্তিত করে পারে না, উল্লেথ করেছেন প্রধানমন্ত্রী.

   কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের পরিস্থিতি এর থেকে কোন অংশে কম উদ্বিগ্ন করে না. সবার আগে এই কারণে যে, এটা রাশিয়ার সীমান্তের থেকে খুব কাছেই ঘটছে. পুতিন আশা প্রকাশ করেছেন যে, কিন্তু মস্কো মনে করে, আবেগ তাও দূর হয়ে যাবে, সবার আগে মাথা চাড়া দেবে সুবুদ্ধি ও দুই পক্ষই আলোচনা করতে বসবে.

   আলোচনার আলাদা একটি বিষয় হয়েছিল আফগানিস্থান. আন্তর্জাতিক জোট আফগানিস্থানে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে ও রাশিয়া জোটকে তাতে নানাভাবে সাহায্য করছে. প্রধানমন্ত্রী বিশেষ করে বলেছেন যে, তা করা হলেও, একই সময়ে রাশিয়া সেখানে “সামরিক বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হতে পারে না ও হবেও না”. সব মিলিয়ে যদি বর্তমানের পরিস্থিতিকে দেখা হয়, তবে তা আশার সঞ্চারই করে:

   “বর্তমানে সমস্যা আগের চেয়ে বেশী হয়েছে. কিন্তু আমি তাও আশাবাদী. আর আমি মনে করি, যে আমরা আজ আমাদের কাছে এখন যা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও সমাধান অযোগ্য বিষয় বলে মনে হচ্ছে, সেই বিষয় গুলিতেও সহমতে আসতে পারবো”.

   আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েছিল রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি. ল্যারি কিং এই ক্ষেত্রে কিছু অনন্য সাধারন হন নি, তিনিও সাক্ষাত্কার শুরু করেছেন নির্বাচনের প্রশ্ন দিয়েই. উত্তর কি হবে তা তো আগে থেকেই জানা ছিল:

   “আমরা রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেই কাজ করে থাকি, আর বহু দিন আগেই নিজেদের জন্য স্থির করে রেখেছি যে, ২০১২ সালের নির্বাচনে একসাথে রাশিয়ার জনগনের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবো. নির্বাচনের এখনও যথেষ্ট দেরী আছে. আমাদের দেশে এই নির্বাচন হবে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে. আবারও পুনরাবৃত্তি করে বলছি আমরা পরামর্শ করবো ও দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে তবেই কোন সিদ্ধান্ত নেবো”.

   রাশিয়াতে বাস্তব ক্ষমতা পুতিনের করায়ত্ব এবং মেদেভেদেভের তা নেই এই ধরনের ধারণা সম্বন্ধে প্রধানমন্ত্রী খুবই কড়া উত্তর দিয়েছেন: এই ধরনের উক্তি করা হয়ে থাকে, যাতে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরানো যায়, কিন্তু এটা করা সম্ভব হবে না. যেরকম ভাবে গণতান্ত্রিক নীতি থেকে হঠিয়ে দেওয়াও সম্ভব হবে না. অন্য কথা হল, মার্কিনরা রুশ দেশে গণতন্ত্র নেই বলে কম কিছু অভিযোগ করে না. কিন্তু প্রধান মন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন দেশেই দুইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন এমন প্রার্থীরা, যাঁরা দেশের নির্বাচকদের সর্বাপেক্ষা বেশী ভোট পান নি. এখানে প্রশ্ন ওঠে গণতন্ত্র কোথায় গেল? কিন্তু মার্কিনদের এক্ষেত্রে তৈরী উত্তর থাকে:

   “যখন আমরা আমাদের মার্কিন সহকর্মীদের কাছে বলি যে, এই ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে, আমরা শুনতে পাই উত্তরে আপনারা আমাদের বিষয়ে নাক গলাবেন না, আমাদের এই রকম করা অভ্যাস, আর তাই করা হবে. আমরা সেখানে আর ঢুকতে যাই না, কিন্তু আমি আমাদের সহকর্মীদেরও উপদেশ দেবো আর আপনারাও আমাদের বিষয়ে নাক গলাবেন না. এটা রুশ দেশের লোকেদের সার্বভৌম নির্বাচন, নব্বই এর দশকের শুরুতে রুশ দেশের লোকেরা গণতন্ত্রের পক্ষে বিকল্প না রেখেই নির্বাচন করেছে নিজেদের পথ আর এই পথ থেকে অন্য দিকে কখনোই ঘুরে যাবে না”.

   ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছাড়া সাক্ষাত্কার শেষ হয় নি. শেষে ল্যারি কিং প্রধানমন্ত্রীর মেয়েদের কথা জিজ্ঞাসা করেছেন. পিতা ভ্লাদিমির পুতিন খুব ছোট উত্তর দিয়েছেন: “ওরা নিজেদের সাধারন জীবন নিয়েই আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে. ওরা খুশী যে, ওদের বন্ধু বান্ধব আছে, - সব কিছু ঠিকই আছে. ওদের জনসমক্ষে সামাজিক কাজকর্মের মঞ্চে আমি টেনে নিয়ে আসার দরকার দেখি না, আর ওরাও তা চায় না”.