দশটারও বেশী বাঘ সেন্ট পিটার্সবার্গের মারিনস্ক প্রাসাদের সমস্ত আনাচে কানাচে আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সমস্যা সংক্রান্ত সম্মেলনের প্রতিনিধিদের “রক্ষা” করছে. এই কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরী বাঘ গুলি তৈরী করা হয়েছে সেই সব লোকেদের জন্য, যারা এখানে জড়ো হয়েছেন বাঘকে “দত্তক নিন” এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে, বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থার উদ্যোগে যে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে, তার আগে যত বেশী সম্ভব লোককে এই বাঘ সংরক্ষণের সমস্যার প্রতি ওয়াকিবহাল করতে এই প্রতীক ব্যবহার করা হচ্ছে.

   এই সমস্যাকে কোন একটি একক দেশ সমাধান করতে পারে না. এর জন্য দরকার প্রয়োজনীয় জায়গায় জোর দিয়ে কাজ করা আর বিশ্ব সমাজের কাছ থেকে শক্তিশালী সমর্থন. ২১ শে নভেম্বর সেন্ট পিটার্সবার্গে শুরু হওয়া “বিশ্ব ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সমস্যা নিয়ে সম্মেলনে” প্রতিনিধিদের দেওয়া ভাষণের এইটি হল মূল সুর.

   সোমবারে “আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সমস্যা সম্মেলন” কাজ চালু রেখেছে. এই সম্মেলনে ১৩ টি দেশ, যেখানে এখনও বাঘ রয়েছে, তাদের মন্ত্রীদের অংশগ্রহণ একটা আশার সঞ্চার করতে পেরেছে যে, বাঘকে অবধারিত নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বোধহয় বাঁচানো সম্ভব হবে.আর এই বিপদের আশঙ্কা এতই বেশী যে তাকে এড়িয়ে যাওয়া চলে না. তা ছাড়া এটা শুধু বাঘকে বাঁচানোই নয়, সমস্যা আরও অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত. বাঘ রয়েছে খাদ্য- খাদক সম্পর্কিত পিরামিডের চূড়াতে আর তাই বাঘই প্রকৃতিতে জৈব ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে.

   যদিও বিভিন্ন রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাঘ্র সংরক্ষণ সংক্রান্ত পরিকল্পনা রয়েছে, তাও যেহেতু বাঘেরা বিনা পাসপোর্টেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়, তাই আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক কিছুই করণীয় আছে. এই সমস্যা সমাধান প্রশাসনিক স্তরেই করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর পরিবেশ বিজ্ঞান ও বিবর্তণ ইনস্টিটিউটের উপ প্রধান এবং রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর রেড বুকে থাকা প্রাণী ও অন্যান্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীদের সম্বন্ধে গবেষণার জন্য অনুসন্ধান কারী দলের প্রধান ভিয়াচেস্লাভ রোঝনভ বলেছেন:

   “...বাঘ – এক বিশেষ ধরনের প্রাণী – এক অন্যতম অঙ্গ. আর যদি সরকার সর্বোচ্চ স্তরে কোন ব্যবস্থা না নেয়, আর এটা হল বেআইনি ভাবে যারা শিকার করে তাদের মোকাবিলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, হিসেব রাখা, বনাঞ্চলের সংরক্ষণ ইত্যাদি, তা হলে বাঘ নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে. আর এই কারণেই, তা সে রাশিয়া, কিংবা চীন বা নেপাল, যেখানেই হোক না কেন, দরকার হয়েছে সবাই মিলে বসে ঠিক করা এর পরে কি করা হবে... এই সম্মেলন খুবই প্রয়োজনীয় জীব জগতকে রক্ষা করার জন্যই. আর বাঘ – সে তো প্রকৃতিরই অংশ. তাকে রক্ষা করতে হলে, বন রক্ষা করতে হবে, তার খাবার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি. আর এই সম্মেলন সুবিধা করে দিচ্ছে, প্রকৃতির বহু রূপকে সংরক্ষণ করার, চোরা শিকার বন্ধ করার, জীবন্ত বাঘ নিয়ে ব্যবসা করা বা তার শরীরের অংশ নিয়ে ব্যবসা করা বন্ধ করার. আরও অনেক কিছু. একমাত্র এই ধরনের ব্যবস্থা বন্য প্রকৃতির এই বিস্ময় জাগানো প্রতিনিধিদের সুরক্ষার জন্য কাজ করতে পারে...”

   জানা আছে যে, বাঘ এশিয়াতে থাকে, কিন্তু আজ বন্য বাঘের সংখ্যা মাত্র তিন হাজারের মত, আর এর সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে. মনে করা হয় ভারতে দেড় হাজারের কম বাঘ রয়েছে, সারা চীন দেশে পঞ্চাশের বেশী নয়, রাশিয়াতে তিনশ থেকে চারশটি, আর তাদের সংখ্যা কমেই যাচ্ছে. যদি এখনই কোন ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কাল হতে পারে, খুবই দেরী হয়ে যাবে.

   এই সম্মেলনে আসা দক্ষিণ এশিয়াতে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ফান্ডের আঞ্চলিক প্রধান বিবেক মেনন আমাদের সাংবাদিককে নিজের মত হিসাবে বলেছেন:

   “পরিবেশ সংরক্ষকেরা বাঘকে বলেন প্রতীক প্রাণী. এর অর্থ হল, “বাঘের প্রতীকের নীচে” একসাথে বহু প্রাণীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়, বলা যেতে পারে এক সম্পূর্ণ জৈবব্যবস্থা. আসলে বাঘ সংরক্ষণ করলে, তার সাথে বন ও বনের অন্যান্য প্রাণীও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়. মনে তো হয় না যে মানুষকে কোন একটা ছোট পাখী, ব্যাং বা ব্যাঙের ছাতা সংরক্ষণ করতে রাজী করানো সম্ভব হবে, কিন্তু বাঘ – এটা অন্য ব্যাপার. আর আগের সব গুলোই বাঘের থাকার জায়গায় থাকে. অর্থাত্ বাঘ – এটা হল প্রকৃতি সংরক্ষণের ও ত্রাণের প্রতীক. এই সম্মেলনে কোনএকজনও মন্ত্রী অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কথা তোলেন নি, শুধু বলেছেন সংস্কৃতি, ধর্ম, পরিবেশ বিজ্ঞান এই সব সম্বন্ধে. এশিয়ার জন্য বাঘ একটা ঐক্যের প্রতীক হতেই পারে.”

    রাশিয়াতে পূর্ব সাইবেরিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের কাজ পুরো দমে শুরু হয়েছে, খনিজ তেল উত্তোলন, তেলের জন্য পাইপ লাইন পাতা চীন অবধি ও প্রশান্ত মহাসাগরের বন্দর অবধি, অর্থাত্ সেই সমস্ত জায়গায় কাজ হচ্ছে, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আমুর অঞ্চলের বাঘের বসতি. তাই এই ক্ষেত্রে কি ভাবে বাঘের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তার সম্বন্ধে আমাদের সাংবাদিক প্রতিনিধিকে রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ মন্ত্রী ইউরি ত্রুতনেভ বলেছেন:

   “বর্তমানের রাশিয়াতে প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণের আইন যথেষ্ট কড়া. জানা আছে যে, পূর্ব সাইবেরিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত খনিজ তেলের পাইপ লাইন পাতার সময়ে দেশের মন্ত্রীসভার প্রধান ভ্লাদিমির পুতিনের হস্তক্ষেপে এই পথ কয়েক কিলোমিটার সরিয়ে আনা হয়েছিল, যার ফলে এই প্রকল্পের দাম বেড়ে গিয়েছিল এক বিলিয়ন ডলার. তা স্বত্ত্বেও এটা করা হয়েছিল. সেই ভাবেই যে কোন প্রকল্প, যা বর্তমানে হচ্ছে, তা যদি কোন ভাবে বাঘ বা চিতাবাঘের স্বাভাবিক বিচরনের জায়গা দিয়ে করা হয়, তবে আমরা খুবই মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা করে থাকি ও সমস্ত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি, যাতে প্রকৃতিতে এই প্রকল্পের প্রভাব হয় অতি সামান্য ও প্রকল্পটি যাতে নিরাপদ হয়.”

   আজ এই সম্মেলনে আশা করা হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বন্য প্রকৃতি সংক্রান্ত অধিকার লঙ্ঘণের মোকাবিলা করার জন্য এক সহযোগিতা সংস্থা তৈরী সম্বন্ধে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে. আর এটা হবে মানব সমাজের পক্ষ থেকে মানুষের বন্য প্রাণী শিকার প্রতিরোধে প্রথম সম্মিলিত চুক্তি.