তালিবদের সঙ্গে আলোচনার পিছনে কি হচ্ছে, তা বর্তমানের আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অন্যতম কৌতূহল সৃষ্টিকারী ব্যাপার. তার চারপাশ ঘিরে অনেক কিছুই পরিস্কার নয়, এমন কি বলা যেতে পারে গুপ্ত বিষয়. আফগানিস্থানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই জানিয়েছেন যে, আফগানিস্থানের নেতৃত্ব তালিবান আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অবশ্য সত্য যে, বেসরকারী ভাবে. তালিবান আন্দোলনের ধর্মীয় নেতা মুল্লা ওমর এর মধ্যেই কাবুলের সরকারের সাথে ততক্ষণ যে কোন রকমের আলাপ আলোচনার সম্ভাবনার কথা নাকচ করে চলেছেন, যতক্ষণ আফগানিস্থানের জমিতে কোন বিদেশী সৈন্য রয়েছে. এ ছাড়া প্রায় দশ বছর ধরে চলা যুদ্ধে তালিবেরা জিতছে বলে মুল্লা ওমর মনে করেন, তাই তাদের আর কি দরকার বিপক্ষের সঙ্গে কথা বলার?

   পশ্চিমে কিন্তু অনেকদিন ধরেই কাবুল ও তালিবদের মধ্যে গোপন আলোচনা নিয়ে খবর ফাঁস হয়েছে. এই ধরনের ফাঁস হওয়া খবর থেকে বোঝা যায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী ন্যাটো জোটের লোকেরা শুধু যে এই আলোচনা সম্বন্ধে জানে তাই নয়, এমন কি এর জন্য সাহায্যও করেছে. এই সব থেকেই একটা সিদ্ধান্তে আসা যায় যে – আলোচনা সত্যিই হয়েছে, আর তা ঘিরে বিবাদের অর্থ হল প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের জন্য সবচেয়ে সুবিধা জনক অবস্থান খুঁজে পেতে চাইছে. মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্থানের সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই গ্রোজিন এই রকম মনে করে বলেছেন:

   “আফগানিস্থানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই প্রায়ই দেশে শান্তি আনার কথা বলেন, এই আলোচনাতে তথাকথিত মধ্য পন্থী তালিব দেরও টেনে আনার কথা বলেন. তিনি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত. হামিদ কারজাই বোঝেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো জোটের সহকর্মীদের স্ট্র্যাটেজির কিছু ব্যাপার তার অবস্থানকে নীচে নামায়, তার মধ্যে তালিবদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টা রয়েছে. এমনকি তিনি বর্তমানে বহু আলোচিত ওয়াশিংটনের তথাকথিত নতুন স্ট্র্যাটেজির ও সমালোচনা করতে সাহস করেছেন. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে. আসলে হামিদ কারজাই বোধহয় ভয় পেয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট মিলে তাকে কখনও না কখনও শেষ অবধি তালিবদের হাতে খাবার হিসাবে তুলে দিতেও পারে”.

   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো জোটের সহযোগিদের জন্য মনে হচ্ছে, খুব একটা পরিস্কার নয় যে, এর পরে কি করা উচিত. তাদের ভাবসাব দেখে মনে পড়ে যায়, দমকলের সেই সমস্ত কর্মীদের অবস্থা, যখন সারা বাড়ীই জ্বলছে, আর তা নেভানোর জন্য যা হোক কিছুই চলতে পারে বলে তারা মনে করতে থাকে. ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস মনে করেছে আফগানিস্থানে ইরাকের ধরনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার (যদি অবশ্য ইরাকে কোন রকমের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হয়েছে বলে মনে করতে হয়). তারা চাইছে এই সমস্যাকে আগের থেকে বেশী সময় দিয়ে, দীর্ঘকালীণ ভাবে তথাকথিত আফগানিস্থানের অভ্যন্তরীন বিবাদ বলে চালু রাখতে. রাষ্ট্রপতি ওবামার কথা অনুযায়ী আগামী বছরের গরমের মধ্যে আফগানিস্থান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি তো দেখে মনে হচ্ছে যে, পিছিয়ে দিতেই হবে.

   “এখানে একটা কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের উদয় হয়: তালিবদের নেতারা কি কাবুলের সরকারের সঙ্গে কোন রকমের গম্ভীর আলোচনা করতে পারে, না কি তারা মুল্লা ওমর নির্দেশিত পথে নিজেদের শান্তি প্রস্তাবের অযোগ্য অবস্থানেই অনড় থাকবে?

   আন্দ্রেই গ্রোজিন এক্ষেত্রে বলেছেন যে, এই আন্দোলনে চরমপন্থী দল রয়েছে, যেমন, হাক্কানি গোষ্ঠী, যাদের বলা হয় সবচেয়ে অনড় প্রতিপক্ষ. কিন্তু কম চরমপন্থীরাও এর মধ্যে রয়েছে. কিন্তু যদি কেউ পশ্চিমে চায় যে, এই ধরনের মতের অমিলকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার কথা, তবে বলতে হবে যে, সেই সম্ভাবনা অলীক. সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে ভাল- খারাপ বাছা, বা তালিবদের মধ্যে মধ্য পন্থী বা অনড় বলে আলাদা করার প্রচেষ্টা আজ অনেক বছর ধরেই চলছে. কিন্তু জোট সেনা বাহিনীর জন্য তার কোন মানে এখনও দেখতে পাওয়া যায় নি”.

   তালিবেরা নিজেরাই মনে করেছে যে, সরকারি ভাবে কাবুলের সঙ্গে আলোচনার আসল মানে হল প্রতিপক্ষের সামর্থ্যের অভাব. আসলে, এই ধারণা বাদ দেওয়া যায় না যে, তালিবান আন্দোলনের নেতারা অথবা তাদের কোন অংশ হয়ত আলোচনাতে বসতে রাজী হতে পারে. কিন্তু তারা এটা কাবুলের সরকারের সাথে সহমতে পৌঁছনোর জন্য করবে না, বা তাদের বিদেশী সহকর্মীদের জন্যও নয়, যদি করে, তাহলে করবে আলোচনার টেবিলে ঘুঁষি মেরে নিজেদের জন্য সবচেয়ে বেশী সুবিধা আদায় করে নিতে. এই অবস্থান থেকে পরে বর্তমানের সরকারের উপরে আক্রমণ শুরু করা যাবে, যাতে তাদের দেশের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থেকে হঠিয়ে দেওয়া যায়.