রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার প্রথম ভারত সফর তাঁর পূর্বসুরিদের সফরের সঙ্গে অনেক বিষয়েই আলাদা হয়েছে. তাঁর পূর্বসূরিরা সাধারণতঃ প্রাথমিক আলোচনার ক্ষেত্রে প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমস্যা গুলিকেই উল্লেখ করতেন. এবারে পুরোটাই আলাদা.

    বিষয়টি বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা তাঁর ভারত সফরে বেশী করে মনোযোগ দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে গভীরতর করে তুলতে. তাঁর সফর শুরু হয়েছে ভারতবর্ষের আর্থ বাণিজ্য কেন্দ্র মুম্বাই শহরে. সেখানে আমেরিকা ভারত সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে আমেরিকার বিখ্যাত ব্যবসায়ীদের একটি বিশাল প্রতিনিধি দল, যাঁরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এসেছেন, তাঁরা অংশ নিয়েছেন. এখানে সংবাদ পাওয়া গিয়েছে যে, ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশী অর্থ মূল্যের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে. আমেরিকার লোকেরা এর মধ্যেই হিসাব করে দেখেছে যে, ভারতের সঙ্গে হওয়া ২০টি চুক্তির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে এখন বেকারত্ব প্রায় শতকরা ১০ শতাংশ হয়েছে, সেখানে প্রায় ৫৪ হাজার নতুন কাজের জায়গা তৈরী হবে.

    আর ভারত কি পেয়েছে? আমেরিকার রাষ্ট্রপতি এর মধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বেশ কয়েকটি কোম্পানীর উপর থেকে, যাদের মধ্যে সামরিক অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি সংস্থা, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, পারমানবিক শক্তি সংস্থাও রয়েছে, দ্বিমুখী বিষয়ে ব্যবহার যোগ্য প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সম্বন্ধে বাধা নিষেধ তুলে নিয়েছে. এই ভাবে, শেষ অবধি, আমেরিকার কোম্পানী গুলি ২০০৮ সালে স্বাক্ষরিত ভারত ও আমেরিকার মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিপূর্ণ পরমাণু ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তির কাজ স্বাভাবিক ভাবে করতে পারবে. ভারত বহু দিন ধরেই এই ধরনের সিদ্ধান্ত আশা করছিল বলে ভারতের সাংবাদিক বিনয় শুক্লা জানিয়েছেন, তিনি বলেছেন:

    "এই সফরের আগে বলা হয়েছিল যে, সফরের মূল উদ্দেশ্য হল – ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসার এবং সন্ত্রাস বাদের বিরুদ্ধে যৌথ ভাবে মোকাবিলা. ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে তা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হয়েছে. এ বিষয়ে কোন রকমের সন্দেহ নেই. কিন্তু এখানে আমেরিকার আভ্যন্তরীণ কিছু বিষয় রয়েছে. এই চুক্তি স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে ওবামা নিজের অবস্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শক্ত করতে চেয়েছেন. মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য অন্তর্বর্তী নির্বাচনের ফলাফল খারাপ হওয়া, দেশে বেকারত্বের বৃদ্ধি, তার মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতির দামী পররাষ্ট্র সফর রাষ্ট্রপতি ওবামার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দের স্বর উঁচু করতে সাহায্য করেছিল. ভারতের সঙ্গে এই বহু হাজার কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর নিঃসন্দেহে ওবামার প্রতিপক্ষের স্বর নীচু করতে বাধ্য করবে ও তাঁর দেশের ভিতরের অবস্থানকে শক্ত করবে.

    সন্ত্রাস বাদ সম্বন্ধে যা হয়েছে, তা হল ভারত পাকিস্থান সম্বন্ধে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থানে খুশী হয় নি. ভারতীয়রা চেয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্থানকে তাদের দেশের মধ্যে বহু ভারত বিরোধী সন্ত্রাস সৃষ্টি কারী কার্যকলাপ করা দল গুলিকে একঘরে করতে বাধ্য করবে. এই প্রশ্নের সমাধান ছাড়া এই অঞ্চলে বা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ কমানো সম্বন্ধে বলার কোন অর্থ হয় না".

    একই সঙ্গে বলতে হবে যে, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু পাকিস্থানেই নয় এমন কি আফগানিস্থানের পরিস্থিতিকেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে. যদি ওয়াশিংটনে ভাবা হয়ে থাকে যে, তালিবদের সঙ্গে আলোচনা করা সম্ভব, তো ভারত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে. এছাড়াও অন্যান্য সমস্যা রয়েছে, যা ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একে অপরের চেয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছে. যেমন, ভারতীয় সেনা বাহিনীর দাবী অনুযায়ী আমেরিকা বারাক ওবামার সফরের আগে দুটি পূর্ব পরিকল্পিত চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত হতে বাধ্য হয়েছে: যৌথ ভাবে সেনা বাহিনীর ছাউনি ব্যবহার ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যৌথ সহযোগিতা. এই দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভারতকে এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক রাজনীতিতে আরও বেশী করে জড়িত হতে হত. এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ভারতের পক্ষে ভাল নয়, কারণ পাকিস্থানের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে বলে. শেষ পর্যন্ত একই সঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসার করেও ভারত একেবারেই চায় না অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সহকর্মী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে, বিশেষত রাশিয়ার সঙ্গে.