এই বছরে ভারত ও চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬০ বছর আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করছে. এই দিন গুলিতে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে উচ্চ পদস্থ চৈনিক প্রতিনিধি দল সফর করছে. প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন চৈনিক কমিউনিস্ট পার্টির প্রখ্যাত নেতা ঝোউ ইউনকান. এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃ শ্রীমতী সোনিয়া গান্ধী সাক্ষাত্ করেছেন. আর এই উত্সব উপলক্ষে বসন্ত কালে চীন সফরে গিয়েছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী প্রতিভা পাতিল.

    বিষয়টি নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    ভারত ও চীনের সম্পর্ক জানে নানা রকমের সময়কে. কখনও সেখানে ঝড় বয়েছে, কখনও ছিল শীতল শান্ত, কখনও উড়ান, কখনও পতন. এই রকমের বহুরূপী ও পরস্পর বিরোধী সম্পর্ককে অনেকেই ব্যাখ্যা করেছেন দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ও এলাকা সংক্রান্ত বিবাদের ফল হিসাবে, যা দুই দেশের মানুষের উপর বর্তেছে অতীতের জের হিসাবে. তাদের সম্পর্ক এমনকি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কারণেও তীক্ষ্ণ হয়েছে. যেমন, দিল্লী চীনের পক্ষ থেকে পাকিস্থানকে বিশাল সামরিক সাহায্য করাকে বা পাকিস্থানের গাদার এলাকায় গভীর বন্দর তৈরী করে দেওয়াকে ভাল চোখে দেখতে পারে নি. বেইজিং এর এই ধরনের কাজের পিছনে নিজেদের জন্য বিপদই দেখতে পেয়েছে. নিজেদের পক্ষ থেকে বেইজিং ভারতকে সমালোচনা করেছে তিব্বত থেকে নির্বাসিত দালাই লামাকে সমর্থন করার জন্য, আর সন্দেহের চোখে দেখেছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক নৈকট্য কে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার আগামী ভারত ও চীন সফর শুধু এই বিষয়ে নতুন করে তিক্ততা যোগ করেছে.

    কিন্তু ভারত নিজেদের জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে কোন রকমের আপোশ করবে এমন দেশ নয়. রাশিয়ার বিজ্ঞানী প্রাচ্য বিশারদ গেন্নাদি চুরফিন এই বিষয়ে বলেছেন:

    "ভারত খুবই বড় করে নিজেদের নিরপেক্ষ দেশ হিসাবে অবস্থানকে দেখে, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকেই আগে রেখে কাজ করে থাকে. এই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সহকর্মী দেশ হয় নি. এটা ঘটে নি ও বোধহয় ঘটবেও না. নিরপেক্ষ দেশ হিসাবে চলার রাজনীতি ভারতকে যথেষ্ট নমনীয় রাজনীতি নিয়ে চলতে সাহায্য করে. "ঠাণ্ডা যুদ্ধের" বছর গুলিতেও এই রকমই ছিল. বর্তমানেও এটা একই রকম রয়েছে. অবশ্যই আমেরিকা বর্তমানে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা প্রসার করতে পেরেছে, কিন্তু এর ফলে ভারতের রাজনীতিতে কোন বদল হয় নি".

    এছাড়া দিল্লী ও বেইজিং বর্তমানে খুব ভাল করেই বুঝতে পরেছে যে, তারা প্রতিবেশী দেশ এবং তাদের মধ্যে সুপ্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক থাকাই ভাল. ১৯৬২ সালের সামরিক বিবাদ দিল্লী ও বেইজিং কে শান্তিকে মূল্য দিতে শিখিয়েছে, বিবাদের প্রশ্ন গুলিকে বাধ্য করেছে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে. ভারত ও চীনের মধ্যে সম্বন্ধ প্রতি দিনের সঙ্গেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যতই তাদের মধ্যে এলাকা ও সীমান্ত নিয়ে বিবাদ থাকুক না কেন. বর্তমানের বিশ্বে এই দুটি দেশেরই অর্থনীতির উন্নতির হার সর্ব্বোচ্চ. আশা অনুযায়ী এই বছরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমান ৬০ বিলিয়ন ডলার হতে চলেছে. বিশ্বের বাজারে অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ভারত ও চীনে, সব মিলিয়ে দেখলে, এই বিষয়কে শান্ত ভাবেই মেনে নেওয়া হয়েছে. হ্যানয় শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে চীনের প্রশাসনের প্রধানমন্ত্রী ভেন জিয়াবাও এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে, "বিশ্বে বর্তমানে যথেষ্ট জায়গা রয়েছে ভারত ও চীনের আলাদা করে উন্নতি করার এবং একই সময়ে সুযোগ রয়েছে সহযোগিতা করার".

    ভারতের পররাষ্ট্র নীতিতে একটি দিক চিহ্ন হিসাবে আজও রয়েছে চীনের সঙ্গে সুপ্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা. চীনও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বড় মূল্য দেয়. দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছাড়াও দুই দেশই রাষ্ট্রসংঘে রাশিয়ার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে কাজ করে, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিক সংস্থার মধ্যেও তারা সক্রিয়, তাদের এক সাথে রেখেছে ত্রৈদেশীয় সহযোগিতা ও এই সম্ভাবনা তাদের কেউই ছাড়তে রাজী নয়. এলাকা ও সীমানা নিয়ে যে বিবাদ দুই দেশের মধ্যে রয়েছে তা নিয়ে এই বছরের নভেম্বর মাসেই আবার আলোচনা শুরু হতে চলেছে. দুই পক্ষই সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের জন্য উপযুক্ত সমাধান সূত্র খোঁজার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে. যদিও এটা যথেষ্ট কঠিন কাজ হবে.