রাশিয়াতে সহস্র বর্ষ পূর্তি উত্সব হচ্ছে. না – না, রাষ্ট্রের সহস্র বর্ষ পূর্তি নয়, একটি আলাদা শহরের আরও একটি সহস্রাব্দ. এই শহর – পিতৃ সম ইয়ারোস্লাভল. ভোলগা নদীর উঁচু পাড়ে এই শহর অবস্থিত আর নিজের নামে প্রতিষ্ঠাতা রাশিয়ার রাজা জ্ঞানী ইয়ারোস্লাভের কীর্তি চির স্মরণীয় করেছে.    ইয়ারোস্লাভল এই দিন গুলিতে হাজার বছর পূর্তি উত্সব পালন করছে. রুশ লোক গীতিতে এই শহরকে বলা হয়েছে বাপ আমার ইয়ারোস্লাভল, এমনিতেই এই শহরে বহু লক্ষ পর্যটক সারা বিশ্ব থেকে আসেন. আর এই উত্সবের দিনগুলিতে বোঝাই যাচ্ছে যে, তাঁদের সংখ্যা ইয়ারোস্লাভলের মাটিতে বাড়বেই.    ইয়ারোস্লাভল – সবচেয়ে প্রধান ও জনপ্রিয় শহর মস্কোর চারপাশের স্বর্ণ বলয় নামে বিশ্ব বিখ্যাত প্রাচীন শহর গুলির মধ্যে. ইয়ারোস্লাভল – শুধু প্রাচীন তমই নয়, এটি রাশিয়ার অল্প কয়েকটি শহরের একটি – যেখানে এক বিরল পরিমানে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় দ্রষ্টব্য রয়েছে. শুধু স্থাপত্যের নিদর্শনই রয়েছে ৮০০ টি. ইয়ারোস্লাভলের ঐতিহাসিক কেন্দ্র অঞ্চল ইউনেস্কো সংস্থার বিশ্বের ঐতিহ্য তালিকার একটি. "আঠেরোশ শতকের শহর তৈরী করার নিদর্শনের উদাহরণ" হিসাবে এটি বিখ্যাত. আজও ১৭৭৮ সালের শহর নির্মাণের প্রধান পরিকল্পনার মানচিত্র, যেখানে রাস্তা ও বাড়ীর অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে উদাহরণ হিসাবে উদ্ধৃত করার মতো, তা বিখ্যাত. এই গুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল – স্পাসো- প্রিঅবরাঝেনস্কি মঠ ষোড়শ শতকের এই স্থাপত্যের উদাহরণ, যেই ইয়ারোস্লাভলে একবার এসেছে, সেই শহরের স্মৃতি হিসাবে উদ্ধৃত করতে বাধ্য.    আজ এই সংরক্ষিত মঠে ইয়ারোস্লাভলের রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য ও ইতিহাসের যাদুঘর এবং শিল্প সংগ্রহ শালা রয়েছে. এই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর এলেনা আনকুদিনোভা "রেডিও রাশিয়া"কে দেওয়া একটি সাক্ষাত্কারে বলেছেন:    "স্পাসো- প্রিঅবরাঝেনস্কি মঠ এই শহরের ঐতিহাসিক অংশে অতিথিদের স্বাগত জানায় প্রথমে. মস্কো শহরের দিক থেকে শহরে ঢোকার মুখে এই মঠের সৌন্দর্য সকলকেই মোহিত করে. তারপরে তারা প্রশ্ন করতে শুরু করেন এবং জানতে পারেন যে, এটি শহরের সবচেয়ে প্রাচীন অংশ, যা ষোড়শ শতকের মত একই রকম রাখা হয়েছে. অন্য সমস্ত কিছুই সতেরোশ শতকের শুরু থেকে তৈরী হয়েছে, কিন্তু এই সবই সতেরোশ শতকের স্থাপত্যের বিরল উদাহরণ! আর স্পাসো – প্রিঅবরাঝেনস্কি মঠ – আমাদের মণি, এখানে খনন কার্যের সময়ে ১৩শো শতকের মঠের হদিস মিলেছে, এখানেই ১৫শো শতকের ইয়ারোস্লাভল এমনকি ১৩শো শতকের ইয়ারোস্লাভল কেমন ছিল তা দেখতে পাওয়া যায়. দুঃখের বিষয় হল এই সমস্ত অংশ বিশ্লেষণ করা খুব সহজ নয়, কারণ অনেক কিছুই পরে তৈরী হওয়া গির্জার নীচে রয়েছে".    ইয়ারোস্লাভলের মাটি আরও অনেক ধাঁধা লুকিয়ে রেখেছে, আবার সেখানেই অনেক সূত্র পাওয়া গিয়েছে সেই ধাঁধা সমাধানের – যেমন, একটি বেশ জটিল প্রশ্ন, কবে রাজা জ্ঞানী ইয়ারোস্লাভ ভোলগা ও কোতোরোসলি নদীর সঙ্গমে শহরের কেল্লা স্থাপন করেছিলেন. ঐতিহাসিকরা তিনটি সম্ভাব্য বছর ১০১০, ১০২৪ ও ১০৭১ এর মধ্যে প্রথম টিকেই বেছে নিয়েছেন, কারণ এই বছরের সম্ভাবনার জন্য সবচেয়ে বেশী প্রমাণ সংগৃহীত হয়েছে. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি দেখিয়েছেন ইয়ারোস্লাভলের মধ্য যুগের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ মিখাইল মীরোভিচ, তিনি বহু ঐতিহাসিক পুঁথি, ঐতিহ্য ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে এই বছরের কথাই বলেছেন. "প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা এখানে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছেন" – বলেছেন এলেনা আনকুদিনোভা.    "মাত্র কয়েক বছর আগেই শহরের সবচেয়ে পুরনো অঞ্চলে খনন কার্যের সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুঁজে পেয়েছিলেন কিছু শিল্প সামগ্রী, যা সম্পূর্ণ ভাবেই ইয়ারোস্লাভল শহরের প্রতিষ্ঠার সময় এগারো শতক বলে প্রমাণিত করেছে, অর্থাত্ জনপদ, যেখানে বিভিন্ন স্তরের লোক বাস করে. এখানে মাটির পাত্র, সামরিক বস্তু সবই আছে, তার মানে হল এর স্বপক্ষে প্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ. আমরা প্রায় সাত হাজার বিরল জিনিস পেয়েছি, রাজার দেউল ও জহুরীশালা খনন করে. এই জিনিস গুলি রুশ প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসেও অনন্য. এই সবই ভোলগা ও কোতোরোসলি নদীর সঙ্গমে শহরের প্রতিষ্ঠার জায়গা, যেখানে পুরানো কেল্লা ছিল সেখানে পাওয়া গিয়েছে. এই কেল্লা ধ্বংস হয়েছে সতেরোশ শতকে, তারপরে আর বানানো হয়নি. এই কেল্লার ভূমিকা পরে নিয়েছিল মঠ, যেখানে রুশ রাজাদের ধর্মীয় আশ্রয় ছিল, যে কোন বড় কাজের আগে, তাঁরা এখানে আশীর্বাদ নিতে আসতেন. তাঁদের মৃত্যুর পরে এখানেই কবর দেওয়া হত, তাই এটি ছিল সমস্ত অর্থে খুবই ধনী মঠ. সতেরোশ শতকের শুরুতে এটাই ছিল রুশী প্রশাসনের জমা হওয়ার জায়গা. ইয়ারোস্লাভলের সমাবেশেই প্রথম রাশিয়ার সমস্ত রাজারা একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মিখাইল রমানভ কে রাশিয়ার প্রথম সম্রাট বা জার হিসাবে ঘোষণা করার. তখন প্রায় ছয় মাস সময় ইয়ারোস্লাভল ছিল রুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী, আর এই মঠ ছিল তখনকার ক্রেমলিন. আমাদের ইতিহাসের এই রকম একটি পাতাও ছিল".    ইয়ারোস্লাভলের সহস্র বছর – এটা শুধু একটি আলাদা শহরের জীবনের ইতিহাসই নয়, বরং রাশিয়ার সংস্কৃতির ইতিহাসের এক জীবন্ত বিবরণ, যার কাছে আমরা বারে বারেই ফিরে আসব.