এক মিনিটের নীরবতা, দুবার ঘন্টা ধ্বণি ও ৩৩৬টি সাদা বেলুন আকাশে ছেড়ে দেওয়া. ২০০৪ সালের ট্র্যাজেডিতে উত্তর ককেশাসের বেসলান শহরের ১ নম্বর স্কুলে আজ এই ভাবে নিহতদের স্মৃতি পালন করা হয়েছে. স্কুল দখল করে সন্ত্রাসবাদীরা প্রায় চারশো লোকের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল – তাদের মধ্যে বেশীর ভাগই শিশু. সেই সমস্ত দিনের ঘটনাকে আজ সারা দেশেই স্মরণ করা হচ্ছে, রাশিয়াতে তেসরা সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্য দিবস.    রাশিয়া সমস্ত শহরেই শোক সভা হচ্ছে, সেখানে যারা অংশ নিচ্ছেন তারা মস্কো ও ভলগোদনস্ক শহরে ১৯৯৯ সালের সেই বসত বাড়ীতে বিস্ফোরণ, ২০০২ সালে দুবরোভকা থিয়েটারে বন্দী রাখা, ১১ই সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক শহরের ট্র্যাজেডি, কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া মস্কো শহরের মেট্রোতে বিস্ফোরণ এই ভয়ঙ্কর সবকেই একসাথে মনে করেছেন, আর অবশ্যই বেসলানে শিশুদের বন্দী ও হত্যার কথাও বলছেন.    এই ধরনের ঘটনার মূল কোথায়? আজও এই বিষয় বুঝবার চেষ্টা করছেন বহু দল বিশেষজ্ঞ. তাঁরা একটি বিষয়ে সকলেই অন্ততঃ একমত – অপরাধীদের প্রয়োজন সন্ত্রাসের, যাতে সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করা সম্ভব হয়. সন্ত্রাসবাদীরা চেষ্টা করে জনতার মনে প্রভাব ফেলতে, দেখায় যে তারা শেষ অবধি যেত তৈরী আছে, এমনকি নিজেদের প্রাণের পরোয়া না করে. বিশ্ব সমাজ নিজের পক্ষ থেকে সমস্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করছে যাতে আর কখনও বেসলান বা ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়. অংশতঃ রাশিয়ার সরকার উত্তর ককেশাসের ট্র্যাজেডির পরে অনেক কিছুই করেছে, এই কথা উল্লেখ করেছেন রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাষ্ট্রীয় লোকসভার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য আলেকজান্ডার গুরভ, তিনি বলেছেন:    "বর্তমানে সন্ত্রাস বাদ প্রতিহত করার জন্য আইন নেওয়া হয়েছে, যা আপাততঃ ইউরোপে এখনও নেই. বাস্তবে খরচ করা হয়েছে অর্থ এবং তথ্যের জন্য পরিশ্রম – এর প্রমাণ হিসাবে বলা যেতে পারে যে, গত বছর গুলিতে অন্ততঃ কিছু সন্ত্রাসবাদীকে ধ্বংস করা হয়েছে. দ্বিতীয়তঃ গুপ্তচর, পুলিশ অনুসন্ধান কর্মী ও গোয়েন্দা কাজকর্ম ঠিক করে করা হচ্ছে, তাই এক বছরের মধ্যে পাঁচশরও বেশী সন্ত্রাস বাদী হানা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে. আর তা শুধু উত্তর ককেশাসেই হয় নি. যদি বলতে চাওয়া হয় যে শতকরা ১০০ ভাগ সমস্ত কিছু করা সম্ভব হয়েছে – তা ঠিক হবে না. সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে অবশ্যই শতকরা ১০০ ভাগ সমস্ত কিছু রক্ষা করা সম্ভব নয়. কিন্তু এর বিপদ কমানো সম্ভব, আর এটাই আমার মতে করা হয়েছে".    এই দিন গুলিতে শুধু রাশিয়াতেই সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত লোকেদের মনে করা হয় না, আজ ছয় বছর হতে চলল ইতালির ত্রেন্তো শহরে বেসলানের স্মরণের দিনে একটানা ঘন্টা ধ্বণি করা হয়. এই উত্তর ককেশাসের বেসলান শহরের নাম আজ সারা বিশ্বে চিরন্তন স্মৃতির জন্য একটি প্রতীক হয়েছে, তাই একটি রাশিয়ার সামাজিক সংস্থার প্রেসিডেন্ট এন্নিও বরদাতো বলেছেন যে:    "এই ট্র্যাজেডির প্রথম বছর পরে ২০০৫ সালে এবং পঞ্চম বছরে ২০০৯ সালে আমাদের সংস্থা লরেতো শহরে বেসলান শহরের নিহত বড় ও বাচ্চাদের স্মৃতিতে শহীদ স্মরণে ঘন্টা বাজিয়েছিল. ইতিহাসে এই ঘন্টার ধ্বনির অর্থ খুবই বড়, কারণ মানুষের ইতিহাসে তার মানে খুবই গভীর. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউরোপে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ রত দুই পক্ষের ব্যবহৃত কামান ও অন্যান্য অস্ত্র গলিয়ে এই ঘন্টা বানানো হয়েছিল. আর প্রতি সন্ধ্যায় রাত সাড়ে নটায় এই ঘন্টা বাজে যুদ্ধে নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে. দুবার এই ঘন্টা বেজেছে বেসলানের শিশুদের উদ্দেশ্যে. কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় যখনই এই ঘন্টা বাজে আমরা বেসলানের নিহতদের কথা মনে করি, যাতে আর কখনও বিশ্বের কোথাও কেউ বাচ্চাদের এই ভাবে না মারে. যাতে সারা বিশ্বের জন্যই বেসলান স্মৃতির প্রতীক হয়ে থাকে".    ইতিহাসে মনে হয় প্রত্যেক দেশেই কিছু ঘটনা হয়েছে, যা সেই দেশের জনগণ একসাথে শোক দিবস হিসাবে পালন করে থাকে, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, কাউকেই উদাসীন থাকতে দেয় না. বেসলান ট্র্যাজেডির পর, বাচ্চাদের খুন হয়ে যাওয়ার পর আর কেউ কোথাও সন্ত্রাসবাদীদের স্বাধীনতা সংগ্রামী বলতে সাহস করবে না. প্রত্যেক সাধারন লোকের নজরেই এরা – অমানুষ, যাদের মানব সমাজে কোন জায়গা নেই.