৩১শে আগষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে সামরিক কাজের মেয়াদ শেষ হচ্ছে. ইরাকের প্রশাসনের হাতে দেশের নিরাপত্তার ভার তুলে দেওয়ার অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপরাষ্ট্রপতি জোসেফ বাইডেন.    দুই বছরেরও কম সময়ের উপরাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার সময়ে এটি তাঁর ষষ্ঠ ইরাক সফর. এত বেশী বার তিনি বিশ্বের আর কোনও দেশেই আসেন নি. ইরাক মার্কিন প্রশাসনের মাথা ব্যাথা ছিল এবং আজও আছে.    বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, আমেরিকার সেনা বাহিনীর ইরাক দখলে যা আসা করে গিয়েছিল সেই রকম প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় নি. সেই দেশে আগের মতই চরমপন্থা বেড়েই চলেছে. ধর্মীয় বিদ্বেষ চলেছে, দেশের বেশীর ভাগ লোকই নিঃস্ব হয়ে বেঁচে আছেন.    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনী ইরাকে অনুপ্রবেশের পর থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশী সৈন্য নিহত হয়েছেন. গত সাত বছরে ইরাকে নিহত হয়েছেন সেই দেশের দশ লক্ষেরও বেশী লোক. এটা – গণতন্ত্রের দাম, যা আমেরিকার প্রশাসন বন্দুকের নলে ঝুলিয়ে এই দেশে নিয়ে এসেছে. ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরাকের জনগনকে এক অত্যাচারী স্বৈরাচারী দেশ শাসকের হাত থেকে উদ্ধার, আর বিশ্বকে গণহত্যার অস্ত্র থেকে রক্ষা করা, যা পরবর্তী কালে এক দীর্ঘ কালীণ মাত্সান্যায় ও রক্ত ক্ষয়ে পরিনত হয়েছে. আমেরিকার লোকেরা খুব সহজেই সাদ্দাম হুসেন কে ক্ষমতা চ্যুত করে ফাঁসী দিয়েছে. কিন্তু তাদের অনুপ্রবেশ করার মুখ্য কারণ  - গণহত্যার অস্ত্রের খোঁজ ও তা ধ্বংস করা  - একই রকম ভাবে আজও ত্রিশঙ্কু অবস্থায়. আন্তর্জাতিক সমাজকে সেই অস্ত্রের উপস্থিতির কোন গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আজও দেওয়া সম্ভব হয় নি. ইরাকে মার্কিন উপস্থিতি বোতল থেকে দৈত্যকে মুক্তি দিয়েছে: নিরীহ মানুষের গণহত্যা ও নির্বাসন এবং বাসস্থান ও পরিকাঠামোর ধ্বংসের মধ্যে ইরাকের আভ্যন্তরীন বিরোধ আরও বেশী করে মাথা চাড়া দিয়েছে. এই ঘটনা শুধু ইরাকেই প্রতিক্রিয়া তৈরী করে নি, সারা ঐস্লামিক বিশ্বেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে.    সরকারি ভাবে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দিন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা তাঁর দেশের নাগরিক উদ্দেশ্যে ইরাকে মার্কিন সামরিক ক্রিয়াকলাপের ব্যাখ্যা দিয়ে ভাষণ দেবেন. কিন্তু, সম্ভবতঃ তিনি নীরব থাকবেন মার্কিন বাহিনী কি অবস্থায় দেশ ছেড়ে যাচ্ছে. এই রকমই ধারণা পোষণ করে আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজি বিশ্লেষণ কেন্দ্রের ইরাক বিশেষজ্ঞ ডক্টর আব্বাস কুনফুদ বলেছেন:    "আমেরিকার সেনারা দেশে ঢোকার পর থেকে দেশে বিদ্যুত নেই, যথেষ্ট পরিমানে খাবার জল নেই, চাষের জন্যও জল পাওয়া যাচ্ছে না. আমেরিকার লোকেদের চোখের সামনে বাগদাদে ইরাকের জাতীয় যাদুঘর লুঠ হয়েছে, যাতে বহু সহস্র দ্রষ্টব্য ছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসের অংশ. কিন্তু এটা কি ধরনের লক্ষ্য? দেশকে স্বাধীন করতে চাওয়া? আসলে দেশটাকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে. ওবামা বলবে যে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের কাজ ঠিকমতই হচ্ছে, কিন্তু বলবে না যে, এটা আসলে এক রকমের পলায়ন".    বোঝাই যাচ্ছে যে, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কারণ শুধু তারা যে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ তাই নয়, আমেরিকার সমাজই এই অন্তহীণ যুদ্ধ ও তার নিষ্ফল ক্ষতি দেখতে গিয়ে ক্লান্ত.    সুতরাং ১লা সেপ্টেম্বরের পরে ইরাকে দুটি যুদ্ধ উপযুক্ত বাহিনীতে পঞ্চাশ হাজার সৈন্য থাকবে, যারা ইরাকের সেনা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে. কারণ ইরাকের বাহিনী এখনও এই ধ্বংস হওয়া দেশে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়. তাই রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের উচ্চ বৈজ্ঞানিক সহকর্মী বরিস দোলগভ বলেছেন:    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ছেড়ে যেতে চাইছে না, তাদের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে থাকতে চাইছে. আপাততঃ সেখানে চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন বাহিনীর অংশ থাকছে, যাতে ইরাকের নিরাপত্তার প্রয়োজনে জাতীয় কর্মী তৈরী করা সম্ভব হয়, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরেও ইরাকের এলাকার উপরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইবে ও সব রকম ভাবে চেষ্টা করবে যাতে তারা সবসময়েই আমেরিকার বা মার্কিন প্রভাবের মধ্যেই থাকে".    এই এলাকাতে ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান এবং তার বিশাল কার্বন যৌগ সঞ্চয় ভান্ডার পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ আকর্ষণের কারণ হবে. আমেরিকার সেনাবাহিনীর ইরাকে নেতৃত্ব দেওয়া জেনেরাল রেই ওদিয়ের্নো কিছু কাল আগে ঘোষণা করেছেন যে, দরকার হলে সেনা বাহিনী ইরাকে ফিরতেও পারে.    আগে থেকে ধরে নেওয়া ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ী ইরাক থেকে মার্কিন সেনা বাহিনী ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ে মোটেও দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বাতাবরণ নেই. ইরাকে সামরিক কাজকর্ম শেষ হওয়ার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে খুবই কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের আড়ালে. গত দুই বছরের মধ্যে আগষ্ট মাস ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী. বাইডেন পৌঁছনোর আগেই ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি ঘোষণা করেছেন যে, দেশে সন্ত্রাসের বিপদ সবচেয়ে বেশী এখন. সুতরাং ইরাকের জনতা, সম্ভবতঃ, পরেও বেঁচে থাকবে ও টিকে থাকার চেষ্টা করবে যুদ্ধও নয় এবং শান্তিতেও নয়, এমন অবস্থায়.