তিরিশ বছর আগে ২৫শে জুলাই রাশিয়ার উপকথা সুলভ লোক গীতিকার ও অভিনেতা ভ্লাদিমির ভীসোতস্কি মারা গিয়েছিলেন. কিন্তু তাঁর স্মৃতি রাশিয়াতে এখনও বেঁচে রয়েছে, যেন এই শোকের ঘটনা শুধু গতকালই ঘটেছে: তাঁর গান বাজছে, কবিতা পড়া হচ্ছে, বই প্রকাশিত হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে তাঁর অভিনয় সমৃদ্ধ সিনেমা. ভীসোতস্কি কে নিয়ে প্রথম কাহিনী চিত্র তৈরী করার কথা হচ্ছে, নাম কালো মানুষ. এই সিনেমার ভিত্তি উজবেকিস্থানের রাজধানী তাসখন্দ শহরে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে ভীসোতস্কির একবার শারীরিক ভাবে মৃত্যু নিয়ে ঘটনা, যা তাঁর সঙ্গে ঘটেছিল.    এই সিনেমা কেমন হতে পারে, ভ্লাদিমির ভীসোতস্কির ব্যক্তিত্বের কোন দিকটি এখানে তুলে ধরা হতে চলেছে, যা বর্তমানের রাশিয়ার লোকেদের কাছে মূল্যবান – এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে রেডিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এক সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে রাশিয়ার বিখ্যাত কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং প্রবন্ধ লেখক দিমিত্রি বীকভের. তিনি বলেছেন:    "যদি এটা মাদকাসক্ত বা পানাসক্ত দের নিয়ে সিনেমা শুধু হয় – তবে এটা একেবারেই আগ্রহ জাগাবে না এবং লজ্জাজনক হবে. ১৯৭০ সালে তো আর কম পানাসক্ত লোক ছিল না, যারা একটা গানও লেখেন নি কখনও, অথচ নিজেদের সোভিয়েত অপশাসনের ভিক্টিম বলে বড়াই করে বেড়াতে ভালবাসতেন. আর যদি সিনেমার মূল বক্তব্য হয় তাঁর শৈল্পিক অনুসন্ধান, মহত্ জীবন – তাহলে কেন তা ভাল হবে না"?    বিখ্যাত চিত্র পরিচালক কিরা মুরাতোভার সঙ্গে সাক্ষাত্কারে একবার কোথায় যেন তিনি বলেছিলেন: ভীসোতস্কি শিল্পের পরিসরে নিজেকে এতটাই খরচ করেছেন যে, তাঁর ব্যক্তিগত ভাবে মানুষ হিসাবে বাঁচার মত কোন সময়ই ছিল না. এই উক্তির সঙ্গে সহমত হওয়া ঠিক মনে হয়েছে দিমিত্রি বীকভের. কিন্তু তিনি তাও মনে করেন যে, "বর্তমানে বেশী করে মানে হয় ভীসোতস্কির পেশাদার জীবনের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলা হলে. আর তার কারণ হল, তিনি খুবই পরিস্কার, আনকমপ্রোমাইসিং লোক ছিলেন. তাঁর কোন এথিক্যাল ভাবে সন্দেহ জনক কাজ কেউ জানে না. তিনি রাজনৈতিক ভাবে স্থির লোক ছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যান নি, যদিও সে সময়ে সকলে মিলে তাঁকে দেশ ছেড়ে ঠেলে বার করে দিতে চেয়েছিল পরবাসে. তিনি বিভিন্ন সময়ে লোকেদের সাহায্য করেছেন, যাদের জীবনে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে, তাদের. তাঁর নিজের সহকর্মীদের সম্বন্ধে কখনও খারাপ কথা বলেন নি. আর যদি কখনও (বলা যাক ডাক্তারী কারণে!)তিনি থিয়েটারের নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, তাহলে পরে তা "সুদে আসলে" কাজ করে তুলে দিয়েছেন, নিজের পেশা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একেবারে চরম পরিশ্রম করে. সিনেমার পরিচালকেরা মনে করেছেন, কি রকম দারুণ তাঁর কাজ ছিল সিনেমার পর্দায়, নিজেকে একটুও রেয়াত না করে কাজ করেছেন, বরং বাকী অভিনেতাদের বিষয়ে ছিলেন খুবই সংবেদনশীল ও চিন্তা করতেন তাঁদের কষ্টের কথা".    দিমিত্রি বীকভের মতে, "আমি বলতে পারি না যে, ভীসোতস্কি তাঁর সময় কালের জন্য "বিবেক" ছিলেন কিনা. তিনি সোলঝেনিতসীনের মত কোন "ভবিষ্যত বক্তা" ছিলেন না, আ কোন রকমের "গুরু" বলে নিজেকে মনে করেন নি. কিন্তু তাঁকে বলা যেতে পারে সমসাময়িক দের জন্য এক "সুর বাঁধার যন্ত্র" – কারণ ছিল তাঁর সার্বজনীন গ্রহণ যোগ্যতা. "স্রেফ মানুষের মত ব্যবহার করো – পুরুষ মানুষের মতো"! – শুধু এই ভাবেই তিনি পুরুষোচিত ব্যবহারের কথা লোককে মনে করিয়ে দিয়েছেন, আর তাতে কোন রকমের "বড়াই করার" মত কিছু নেই. "স্রেফ নিজের নারীকে ভালোবাসো, নিজের দেশকে সম্মান করো, সরকারের সঙ্গে সমানের মতো আচরণ করো" – এই শুধু স্বাভাবিক ভাল কাজ করতে পারা লোকেরাই বর্তমানে ভীষণ কম পড়েছে. আর যদি ভীসোতস্কির কাছে কিছু একটাও মানুষের মতো শিখতে হয়, তবে তা হবে এই রকমের মূল্যবোধের ভিতের শিক্ষা. আমি মনে করি, এটা করলে অনেক বেশী ভাল হতে পারে, তাঁকে শিল্পের ক্ষেত্রে নকল করতে যাওয়ার চেষ্টা করার থেকে".    দিমিত্রি বীকভের মতে, "যারাই এখন উপকথা, লোক গীতি, গণসংগীত ইত্যাদি ধরনের গান গাইছেন, তাদের সকলের উপরেই ভীসোতস্কির প্রভাব কোন না কোন ভাবে লক্ষ্য করতে পারা যায়, যে কোন বড় কবি বা বিখ্যাত সঙ্গীতকারের মতই তিনিও কয়েকটি বিশেষ রকমের গুরুত্বপূর্ণ নতুন ধরন তৈরী করে দিয়েছেন. যেমন তার কথা বলার মতো করে গান এবং লোক গীতি উপকথার কাব্যের মতো ছন্দের টান, কবিতায় প্রচুর চলিত কথার সংকলন". আর আমি মনে করি "বিখ্যাত লোক গীতিকার নভেল্লা মাতভেয়েভা একেবারেই ঠিক কথা বলেছেন – ভীসোতস্কি রুশ কবিতায় প্রথম অভিনয় সংস্কৃতি নিয়ে এসেছেন – অন্যের ভূমিকায় গান গাইতে পারা. আর ভীসোতস্কি অনেক কিছু করেছেন যাতে কবিতার কথ্য ভাষা স্বাভাবিক যেন হয়, বলা যেতে পারে -  "দেমাকের উঁচু বুট জুতো যেন ছুঁড়ে ফেলে মাটিতে পা দিয়ে চলে"".   

দিমিত্রি বীকভ বলছেন – "আমি মনে করি না বর্তমানের যুব সমাজের কাছে আলাদা করে ভীসোতস্কি কে পরিচয় করাতে হবে, তারা এমনিতেই তাঁর গান শোনে", সেটা বীকভ নিজের ছেলে মেয়েদের দিয়েই বুঝতে পারেন, "বেশীর ভাগই ভীসোতস্কির গানের বহু উক্তি ব্যবহার করে থাকে. এই খানেই ভীসোতস্কি সবার জন্যই ধরাছোঁয়ার মধ্যে. সব বয়সেরই আলাদা করে তিনি আছেন – যেমন, বয়স্কদের জন্য "স্বর্গের আপেল গুলি", "নাক উঁচু ঘোড়ার দল". যুবক যুবতীদের জন্য "শৈশবের ব্যালাড", "রবিন হুডের ব্যালাড". আরও যাদের কম বয়স তাদের জন্য রয়েছে "ভিতকা করাব্লিওভ সম্বন্ধে ভূমিকা". ভীসোতস্কির ব্যঙ্গ ও রূপকথার গান এক বিরাট, একেবারেই নকল হতে পারে না এমন এক ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে, আর অনেকে আধুনিক কবিই তা গ্রহণ করেছেন. কিন্তু মনে করি – সব মিলিয়ে বলতে গেলে – আজকের দিনে তাঁর ব্যক্তিত্বের মূল্যবোধের দিকটাই বেশী করে প্রভাব ফেলছে, আর তা লক্ষ্য করতেও পারা যাচ্ছে".