বিগত কিছু সময় ধরে ইরান স্থায়ী ভাবে চাঞ্চল্যকর খবরের উত্স হয়েছে. তা এবারেও ইরানের গত চোদ্দ মাস আগে হজ করতে গিয়ে গায়েব হয়ে যাওয়া পারমানবিক পদার্থবিদ্ শাখরাম আমিরী ইরান ফিরে এসেছেন এবং তাঁকে বিশ্ব জয়ীর মত সম্বর্ধনা দিয়ে দেশের ইমাম খোমেইনি বিমান বন্দরে স্বাগতম জানানো হয়েছে. এই পরিস্থিতির সম্বন্ধে মন্তব্য করতে আমরা প্রাচ্য বিশারদ প্রফেসর ভ্লাদিমির সাঝিন কে অনুরোধ করাতে তিনি বলেছেন:    "এই গত কয়েক মাস ধরে আমেরিকার পক্ষ থেকে একটানা বলে আসা হয়েছে যে, আমিরী স্বেচ্ছায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালাতে চেয়েছিল, আর একই রকমের জোর দিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে সরকারি আমলারা বলে এসেছেন যে, পদার্থবিদ্ সৌদি আরব, ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরদের হাতে লোপাট হয়েছিলেন".    ইন্টারনেটে পাওয়া তিনটি ভিডিও দেখেও এই ইতিহাস সম্বন্ধে স্পষ্ট বোঝা সম্ভব হয় নি. যেখানে দেখানো হয়েছে যে, আমিরী কে যেন দেখতে সেই রকম ৫ই এপ্রিল একজন লোক বলছে যে, মদিনা শহরে সৌদী ও মার্কিন গুপ্তচর দের হাতে সে ধরা পড়েছে, এখন সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে, অ্যারিজোনা রাজ্যের টাকসন শহরে. ২৩ শে জুনের ভিডিও তে দেখা গিয়েছে যে, সে বলছে খুব ভাল আছে, আমেরিকাতে আছে নিজের ইচ্ছায়. আর শেষ ২৯ শে জুনে সে বলেছে যে, তাকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে. এই প্রসঙ্গে সংবাদ মাধ্যম উল্লেখ করেছে যে, ভিডিও অংশের শেষে একজনের ফারসী ভাষায় গলা শোনা গেছে, যে বলছে খুব ভাল! আর বর্তমানে সে তেহরান শহরে রয়েছে.    সংবাদ মাধ্যমে বহু দেশের গুপ্তচর সংক্রান্ত বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করেছেন, তর্ক করেছেন এবং নিজেদের ধারণা বা ভাষ্য দিয়েছেন. এগুলির মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাব্য মনে হয়েছে সাড়ে চারটে ধরনের ভাষ্য.    প্রথমটা এই রকম – আমিরী আমেরিকার পক্ষে নিজেই চলে গিয়েছিল এবং সেখানে ইজরায়েলের মোসাদ ও আমেরিকার সি আই এ কে খবর দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ লক্ষ ডলার পেয়েছে. অন্ততঃ আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম গুলি এই কথাই লিখেছে. পরে সে ইরানে তার বৌ আর সাত বছরের ছেলের কথা মনে করেছে ও ঠিক করেছে দেশে ফিরে আসা. কিন্তু যাতে তার বিষয়ে একটা ভরসা করার মত ভাষ্য তৈরী হয়, তাই তার জন্য একটা লোপাট করে নিয়ে যাওয়া, পাঁচ কোটি ডলার প্রত্যাখ্যান করা ইত্যাদি ধরনের গল্প তৈরী করা হয়েছে, যা আগামী সময়ে তিনি বলতেই থাকবেন, টিভিতে, ইন্টারনেটে, নানা জায়গায়.  আর এই ভাষ্যটি ইরানে গ্রহণ করা হয়েছে, যে প্রায় শহীদ, শয়তানের নরক থেকে ফিরে এসেছে ও বড় শয়তানের নানা ধরনের কুকর্মের জাল ফাঁস করে দিয়েছে. কিন্তু এখানে একটা নেতিবাচক অংশ থেকে যাচ্ছে. যদি আমিরী আমেরিকার ব্যাঙ্কে নিজের নামে পাঁচ মিলিয়ন ডলার পেয়েও থাকে, তবে তা হাতে সে পাবে যতদিন বাদে পারমানবিক পরিকল্পনা সমস্যার কারণে ইরানের উপর থেকে সমস্ত বাধা নিষেধ উঠে যাবে, তার পর, ততদিন একটা সেন্ট তার ব্যবহার করা সম্ভব হবে না. অন্যান্য সমস্ত ভাষ্যের ক্ষেত্রেও এই বিষয় টি কিন্তু একই রকমের থেকে যাবে.    এই ভাষ্যের আবার একটা ছোট পরিবর্তিত রূপও আছে, আমিরী কে সত্যই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর সে খুব তাড়াতাড়িই তার লুঠেরা দের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শুরু করেছিল, তারপর থেকে প্রথম ভাষ্যের মত করে ভাবা যেতে পারে.    দ্বিতীয় ভাষ্যটা এই রকম: শাখরাম আমিরী কে সত্যই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে শত্রু পক্ষের হয়ে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, কিন্তু এখানে একটা জোড়ার অভাব রয়েছে. অনেক মাস ধরে আমিরী আমেরিকাতে অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছে, ফলে অ্যারিজোনা থেকে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছে. কলম্বিয়া রাজ্যে, যেখানে সে পাকিস্থানের দূতাবাসে লুকিয়ে ছিল. জানা আছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি খোলা দেশ, কিন্তু ততটাই কি – যাতে খুবই দামী (পাঁচ মিলিয়ন ডলার!) সি আই এ সংস্থার বন্দী এক কোনা থেকে অন্য কোনাতে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে!    তৃতীয় ভাষ্য হল – আমিরী টোপ ফেলা পালিয়ে যাওয়া লোক – যাকে ইরানের গুপ্তচর সংস্থা তৈরী করেছে, যাতে সে গিয়ে শত্রুদের কাছে দেশের সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় কিছুটা সত্য নানারকমের ভুল তথ্য দিতে পারে আর সৌদী, ইজরায়েল ও মার্কিন গুপ্তচর সংস্থাদের প্রশ্নের ধরন থেকে বুঝতে পারে যে, তারা কতটা ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানে? পুরো মিথ্যে সে বলতে পারে না, তবে বানানো কথা বলতেই পারে.    চতুর্থ ভাষ্য হল – শাখরাম আমিরী যে কোন ভাবেই হোক আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থার হাতে পড়েছিল – ইচ্ছা করে বা জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়াতে. যখন সেই সংস্থা বুঝতে পেরেছে যে, আমিরী গোপনীয় কোন খবর জানে না, তখন তারা ওর উপরে সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে ও সে স্রেফ একজন গরীব দেশ পালানো লোকে পরিণত হয়েছে. যার তখন মাথায় একটাই বিষয় ছিল, কি করে বেঁচে থাকা যায়, দেশে ফেরা যায়.    ভ্লাদিমির সাঝিন তাঁর সিদ্ধান্তে বলেছেন যে, "এই সবই অবশ্যই স্রেফ ধারণা, সত্য কি তা কোন দিনই জানতে পারা যাবে না, সব দেশেরই গুপ্তচর সংস্থা এই ধরনের ঘটনা গোপন করে সাত তালার সিন্দুকে ভরে রাখে অথবা কয়েক দশক পরে (কিন্তু তা সব সময়ে নয়) তা প্রকাশ করে".