মস্কো শহরে ১২ই জুন "নিষিদ্ধ শিল্প" প্রদর্শনীর আয়োজকদের রায় বের হবে. তিন বছর ধরে চলা এই বিচার প্রচুর প্রচারিত হয়েছে ও বিচারাধীন দের সমর্থনে বহু মিটিং আয়োজন করা হয়েছিল, রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদের উচ্চ কমিসার কে রাশিয়ার মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা এমন কি চিঠিও দিয়েছিলেন এই বিষয়ে. এক বিশেষ সামাজিক মতামত নির্ণয় সমীক্ষাতে রাশিয়ার লোকেদের বাক স্বাধীনতা, সেন্সর ও ধর্মের জনসমক্ষে সমালোচনা সম্বন্ধে মত জানা হয়েছিল.    সেই সমস্ত লোকেরা যাঁরা নিজেরা খুবই খোলা মেলা, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও শিল্পের মাধ্যমে তাঁদের মত প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের নিয়ে এই বিচার রাশিয়ার সমাজের জনমতকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল. শতকরা ৫৮ ভাগ লোক "লেভাদা সেন্টার" কেন্দ্রের সমাজতত্ত্ববিদদের প্রশ্নের উত্তরে মনে করেছেন যে, লোকের বাক স্বাধীনতা থাকা উচিত ও জনসমক্ষে ধর্মের সমালোচনা করার ক্ষমতা থাকা চাই. শতকরা ৪০ ভাগ রুশ লোক মনে করেছেন যে, ধর্ম সংক্রান্ত মানসিকতার বিরূপ মনোভাবের উদ্রেক কারী রচনার জনসমক্ষে প্রকাশ বন্ধ করা উচিত. তা কিসের চারপাশে এত আবেগ উথলে উঠেছে?    ২০০৭ সালে "নিষিদ্ধ শিল্প" নামে এক প্রদর্শনী হয়েছিল মস্কোর বিখ্যাত পদার্থবিদ্ ও মানবাধিকার রক্ষা কর্মী আন্দ্রেই সাখারোভের নামাঙ্কিত যাদুঘরে. সেই প্রদর্শনীতে রাশিয়ার কিছু জনসমক্ষে প্রদর্শনীতে বিরূপ আধুনিক শিল্পীর কাজ সমষ্টি গত ভাবে দেখানো হয়েছিল. এই ছবি গুলি এক বিশেষ ভাবে তৈরী করা দেওয়ালের উল্টো দিকে ঝোলানো হয়েছিল এবং তা দেখতে হলে চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে দেওয়ালের ফুটো দিয়ে দেখতে হয়. যা দেখা গিয়েছিল তা অনেককেই চমকে দিয়েছিল, কিন্তু সবচেয়ে বেশী পরে বোঝা গিয়েছিল যে, চমকে গিয়েছেন ধর্ম বিশ্বাসী ও গির্জায় নিয়মিত যাওয়া লোকেরা. কারণ অনেক শিল্পীই খ্রীষ্ট ধর্মের নানা প্রতীককে খুবই ব্যঙ্গ করে ব্যবহার করেছিলেন. ফলে "জনগনের গির্জা" নামে এক সামাজিক সংঘ মস্কো শহরের অভিশংসক দপ্তরে আবেদন করে যে এই প্রদর্শনীর আয়োজকদের বিরুদ্ধে ধর্ম বিশ্বাসী লোকেদের বিশ্বাসের অবমাননা করার অভিযোগে যেন ফরিয়াদী মামলা করে শাস্তি দেওয়া হয়. এঁরাই বর্তমানের বিচার্য অভিযুক্ত: ইউরি সামোদুরোভ  - সাখারোভের নামের যাদুঘরের প্রাক্তন ডিরেক্টর এবং কিছু দিন আগে পর্যন্ত মস্কোর ত্রেতিয়াকোভ আর্ট গ্যালারীর অধুনাতম শিল্প প্রবাহের বিভাগের প্রধান আন্দ্রেই এরোফেয়েভ "যাদুঘরে প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে" পদচ্যুত হয়েছিলেন.    মস্কো ও রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের প্রধান কিরিল অবশ্য গির্জার তরফ থেকে বিচার চাওয়ার বিষয়টিতে না করেন নি. কিন্তু তা কি রকম হওয়া উচিত, সেটাই দেখার বিষয়. মস্কো অর্থোডক্স গির্জার জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আর্খপুরোহিত ভ্লাদিমির ভিগিলিয়ানস্কি এই সম্বন্ধে "রেডিও রাশিয়া"কে জানিয়ে মন্তব্য করেছেন:    "যে শিল্প ও শিল্পীরা অন্য লোকের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করে নিজের প্রতি লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আমি অবশ্যই সেই শিল্পের ও শিল্পীদের বিরোধী. আর রাশিয়ার আইন ও এর বিরোধী. আমাদের সংবিধানের ফরিয়াদী আইনের ২৮২ নম্বর ধারাতে আছে যে, জাতীয় ও ধার্মিক বিশ্বাসে আঘাত হানা অপরাধ. "সাবধান ধর্ম" এবং "নিষিদ্ধ শিল্প" এই দুটি প্রদর্শনী এমন সব জিনিস দেখিয়েছে, যা ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করে. এই প্রদর্শনী যাঁরা করেছেন, তাঁদের রায় বেরোবে, তাঁরা আইন ভঙ্গ করেছেন. কিন্তু আমার মূল অবস্থান এই রকম যে, যদি কোন লোক অন্য লোকের উপর শক্তি প্রযোগ না করে থাকে, তবে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া উচিত নয়. অন্য কোন শাস্তি হতে পারে. আমার মনে হয় তাকে জরিমানা করা যেতে পারে অথবা তাকে সেই পেশা বহির্ভূত করে দেওয়া যেতে পারে – জানি না, আর কি হতে পারে, আমি এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই, কিন্তু এই লোকেদের জেল হওয়া উচিত নয়".    এটা সত্য যে, এই রকমের মানবাধিকার মেনে নিজের অবস্থান বর্ণনা রাশিয়ার অর্থোডক্স গির্জার সকলে করছেন না. আন্দ্রেই এরোফেয়েভ ও ইউরি সামোদুরোভ এই পরিস্থিতিকে বিভিন্ন ভাবে দেখেছেন. যেমন রায়ের প্রাক্কালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সামোদুরোভ এই বিষয়কে গির্জা ও সমাজের মধ্যে বিবাদ হিসাবে দেখেছেন. তিনি মনে করেন "রায় যে রকমই হোক না কেন তা এই বিষয়ে বিবাদে কোন ইতি করতে পারবে না". তাই "রায় নির্দোষ প্রমাণ করুক বা দোষী সাব্যস্ত করুক, যাই করুক তাতে বহু লোকই অসন্তুষ্ট হবেন". সাখারোভ যাদুঘরের প্রাক্তন ডিরেক্টর বিশ্বাস করেন যে, বর্তমানে আগ্রাসী নিষেধের বিরুদ্ধে সংগ্রামই একমাত্র পথ. কার জন্য?      "সেই সব লোকেরা যারা বর্তমানের শিল্প ও তার ভাষাকে মূলতঃ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন, যারা চান যে, আমাদের দেশ যেন "অর্থোডক্স সৌদি আরব" না হয়ে যায় – যদিও তা হতে এখনও দেরী আছে, কিন্তু বর্তমানে সমাজে গির্জার কর্ম বিভাগ হয়েই চলেছে. সেই সব লোকেরা যারা মনে করেন গির্জার স্তর বিভাগ রাশিয়ার সংবিধানের সঙ্গে এক হতে পারে না: আমরা বহু ধর্মের সম্মিলিত দেশে থাকি, কিন্তু আমরা একটি ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ. আমি কোন দিনও ধর্মের সঙ্গে যুদ্ধ করি নি আর তা করবও না, কিন্তু আমি মনে করি যে, ধর্মীয় জ্ঞান ও ধর্ম নিরপেক্ষ জ্ঞান একে অপরকে সম্পূর্ণ করে, তা সব সময়ই ছিল এবং তা থাকবেও. আদালতের কাজ – এমন করা যাতে, ধর্ম বিশ্বাসী ও নিরপেক্ষ দের মধ্যে কম সংঘর্ষ ও "স্ফুলিঙ্গ" হয়. এইটা অনায়াসে করা যেতে পারত আমাদের জাতীয় আইনের ২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী "বিবেকের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সংগঠন" সংক্রান্ত আইন দিয়ে, যেখানে যে কোন রকমের ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত করতে পারে এমন জিনিস নিয়ে জলসা অনুষ্ঠান বা জন সমক্ষে প্রকাশ্যে প্রদর্শনী করতে পারার আইন আছে অথচ তা কখনই কোন ধর্ম স্থানের কাছে করতে দেওয়া যাবে না বলা আছে, তা ব্যবহার করে. এই আইনে ধর্ম নিরপেক্ষ ও ধর্মীয় জায়গার আলাদা করে বর্ণনা আছে. কিন্তু বর্তমানে আদালত এত চাপের মধ্যে আছে যে এই সীমানা প্রায়ই মুছে যাচ্ছে. আমরা এই সীমানা নির্ধারণ করার জন্য সংগ্রাম করতে বাধ্য."    আন্দ্রেই এরোফেয়েভ মূল সমস্যা শিল্প ও ধর্মের মধ্যে কোন বিবাদ দেখেন নি. তিনি লক্ষ্য করতে বলেছেন এই বিচার আয়োজক জনগনের গির্জা সংগঠনের আদর্শ গত উদ্দেশ্যকে.    "এই আন্দোলনের বয়স বছর দশেকের কম, এরা বর্তমানে নিষিদ্ধ নিও ফ্যাসিস্ট "রুশ জনগনের ঐক্য" ও এই ধরনের নানা জাতীয়তা বাদী দলের ভাঙা অংশ নিয়ে তৈরী, এরা নতুন কিছু নয়, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক রাজনীতির বিষয়ে যথেষ্ট ঐতিহ্যশালী ও পরম্পরা মেনে চলে. নিও ফ্যাসিস্ট দলেরা বিশ্বের সব দেশেই আধুনিক শিল্পের বিরুদ্ধে. এই সব লোকেরা নিজেদের উপর নিজেরাই সাংস্কৃতিক সেন্সর করার দায়িত্ব আরোপ করেছে আর যথেষ্ট সক্রিয় ভাবে এই অবস্থান থেকে কাজ করছে. এই সব বিচার, শাস্তি ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে তারা জনতার রাজনীতির প্রসারিত ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চাইছে, সংবাদ মাধ্যমের ব্যক্তিত্ব হতে চাইছে. জার্মানীর ফ্যাসিস্ট লোকেরা ঠিক এই ভাবেই কাজ করেছিল, তারা "পচন ধরা শিল্পের" বিরুদ্ধে এই ভাবেই ধ্বংসোত্সব করেছিল. সুতরাং এই আলাদা অবস্থান, যা প্রাথমিক ভাবে মনে হয়েছিল ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত হতে পারে এমন প্রদর্শনীর আয়োজকদের বিরুদ্ধে মামলা, তা একেবারেই মিথ্যা. আমরা চোখের সামনে এক ফ্যাসিস্ট দলকে দেখতে পাচ্ছি, যারা আমাদের আক্রমণ করছে".    এর মধ্যে অবশ্য আন্দ্রেই এরোফেয়েভ, যিনি কিনা এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক দিক থেকে এত কড়া সমালোচনা করেছেন, তিনি কিন্তু প্যাট্রিয়ার্ক কিরিলকে লেখা তাঁর খোলা চিঠিতে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, যদি বিনা উদ্দেশ্যে ধর্ম বিশ্বাসীদের আঘাত করে থাকেন, তার জন্য. আর ইউরি সামোদুরোভ নিজের কোন দোষ আগেও স্বীকার করেন নি, বোধহয় করবেন ও না.    রাশিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অবস্থান এই রায় বেরোনোর আগে ঘোষণা করেছেন এই দপ্তরের প্রধান কৃষ্টি মন্ত্রী আলেকজান্ডার আভদেয়েভ. তিনি বলেছেন যে, "এই প্রদর্শনীর জন্য কোন বিচার করার প্রয়োজনই নেই, সামোদুরোভ ও এরোফেয়েভ আইনের "রক্ত রেখা" পার হন নি. এটা একটা বোকা আয়োজন হয়েছে, আর আমার মতে, ফরিয়াদী আইন এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা চলে না. এই ধরনের প্রচেষ্টা আমাদের দেশে সব সময়েই হয়েছে কিন্তু তা সফল হয় নি, আর পরে তার জন্য শুধু আয়োজকদের নিজেদের ঠিক মনে হয় নি".