যে মুহূর্তে মেয়ে হবু বরের প্রস্তাব মেনে নেয়, তখন থেকে তাকে কনে নামেই ডাকা হয়. কিন্তু যখন একটি মেয়ের সামনে দুইজন হবু বর হাজির হয় ও তারা সমানে নিজেদের প্রস্তাব করতে থাকে, তখন কি হবে? এই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাকিস্থানের সামনে দাঁড়িয়েছে, তাদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের অধিকার নিয়ে আরও বেশী করে ওয়াশিংটন ও বেইজিং তর্ক করছে.আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ বিষয় টি বিশদ করে লিখেছেন. ভৌগলিক অবস্থানের জন্য পাকিস্থান সব সময়েই এশিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক ভূমিকা নিয়েছে. সেই দেশ চীন, ভারত, ইরান, আফগানিস্থানের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে, আবার প্রাক্তন সোভিয়েত দেশের মধ্য এশিয়ার দেশ গুলির সঙ্গেও তার সীমানা রয়েছে. বোধহয় এই কারণেই পাকিস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে ছিল. তার ওপরে গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, আফগানিস্থানে তালিবান আন্দোলনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো জোটের সহযোগী দেশ গুলির যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে. পাকিস্থান বাস্তবে আফগানিস্থানে যুদ্ধে রত আমেরিকার সেনাদলের রসদ যোগানোর জায়গায় পরিণত হয়েছে.চীন পাকিস্থানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশী সুলভ ঐতিহ্য মেনেই রেখে এসেছে, প্রথমতঃ ভারতের বিরুদ্ধে তাদের জটিল সম্পর্কের বিষয়ে পাকিস্থানের সহযোগিতা পাবে বলে. বড় ভাইয়ের অধিকার দেখিয়ে চীন পাকিস্থানের অর্থনীতি, সৈন্যবাহিনী ও পরিকাঠামো বদলের জন্য অনেক সাহায্য করেছে. বর্তমানে চীনের বিশেষজ্ঞরা পাকিস্থানে সড়ক নির্মাণ এবং গোয়াদার অঞ্চলে গভীর বন্দর তৈরী করা ছাড়াও তাদের পারমানবিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে উন্নতি করিয়ে দিচ্ছে. আর সবই ভাল হতে পারত, যদি পাকিস্থানের ধনী ও শক্তিশালী অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গী ও লক্ষ্য না বদলাতো. ২০০৬ সালে ওয়াশিংটনের ঘোষিত ভারতের সাথে স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার লক্ষ্য ও দিল্লীতে শান্তিপূর্ণ পারমানবিক শক্তি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, ভারতে আমেরিকা থেকে আধুনিকতম সামরিক অস্ত্র সরবরাহের জন্য ক্রম বর্ধমান আগ্রহ ইসলামাবাদে খুবই সাবধানে দেখা হয়েছে. আর যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্থান আগের মতই স্ট্র্যাটেজিক সহযোগী দেশ বলে নাম দিয়ে আসছে, কিন্তু সব মিলিয়ে পাকিস্থানের ভিতরে সেই রকম আর মনে করা হচ্ছে না. এই ভাব আরও বেশী করে বেড়ে উঠেছে আমেরিকা বিরোধী মনোভাব বেড়ে ওঠার সঙ্গে. অংশতঃ পাকিস্থানের আফগানিস্থান সীমান্ত অঞ্চলে আমেরিকার ড্রোন ব্যবহার করে বোমা বর্ষণ চলতে থাকার জন্যও. ওয়াশিংটন থেকে পাকিস্থানের ইসলামাবাদের কাছে সেই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরান – পাকিস্থান – ভারত গ্যাস পাইপ লাইন তৈরী করার বিষয়ে সহযোগিতা বন্ধ করার যে দাবী করা হয়েছে, তাও এই ক্ষেত্রে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে. শেষ অবধি পাকিস্থানীরা নিজেদের জন্য অপমান জনক মনে করেছে ভারতের সঙ্গে যে রকম শান্তিপূর্ণ পারমানবিক শক্তি সংক্রান্ত চুক্তি আমেরিকা সই করেছে, সেই রকম চুক্তি তাদের সঙ্গে সই করতে চায় নি বলে.পাকিস্থান আরও বেশী করে চীনের দিকে তাকানো শুরু করেছে, মনে করা যেতে পারে যে, বর্তমানের পাকিস্থানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারীর চীন সফর এই সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করবে. পাকিস্থান চীনের কাছ থেকে সেই জিনিস পাওয়ার আশা করেছে, যা ওয়াশিংটন দৃঢ় ভাবে দিতে অস্বীকার করেছে. অংশতঃ আসা করা হয়েছে যে, চীনের সঙ্গে তাদের চাশমা শহরে ৬৫০ মেগাওয়াটের দুটি নতুন পারমানবিক রিয়্যাক্টর বসানোর বিষয়ে চুক্তি করবে, এই দুটি আগের দুটি রিয়্যাক্টরের সঙ্গে যোগ হবে, যার একটি এখন তৈরী হয়ে গিয়েছে ও অন্যটি ২০১২ সালে চালু হবে. যদিও এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মন্তব্য করেছে, তাও চীন এই গুলি তৈরী করবে. এই বিষয়ে রাশিয়ার প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী প্রফেসর সের্গেই লুনেভ বলেছেন:"চীনের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রতিবাদের বিরুদ্ধে যা বলা বে, তা হল ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্থানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১, ২, ৩ নামের বিখ্যাত চুক্তি, যদিও ভারত পাকিস্থানের মতই পারমানবিক অস্ত্র প্রসার নিরোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি. সেই ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাই দৃষ্টান্ত তৈরী করেছে শান্তিপূর্ণ পারমানবিক শক্তি প্রযুক্তি ও  জ্বালানী সেই দেশে রপ্তানী করার, যারা প্রসার নিরোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি এবং এই ভাবে আন্তর্জাতিক প্রসার নিরোধের যে ব্যবস্থা ছিল তা লঙ্ঘণ করেছে. তাই মনে হয় না যে, চীন ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবাদে কান দেবে. সম্ভবতঃ এই চুক্তি স্বাক্ষর হবেই".প্রসঙ্গতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মনে হয় না যে, পাকিস্থান – চীন পারমানবিক শক্তি চুক্তির কারণে ঝগড়া বাঁধাবে অথবা এই প্রশ্নটি পারমানবিক সরবরাহ কারী দেশের মধ্যে তুলবে. বিনিয়োগ ও কর্ম বিষয়ে এই দুই দেশের একে অপরের প্রতি আগ্রহ এই চুক্তির কাঠামোর বাইরে অনেক বেশী দূর পর্যন্ত প্রসারিত.