খাবারভস্ক প্রথম শহর হতে চলেছে, যেখানে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি তাঁর সুদূর প্রাচ্য ভ্রমণের শুরুতে যাচ্ছেন. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি এর আগেও সুদূর প্রাচ্যের রাজধানীতে গিয়েছিলেন. এক বছর আগে এখানেই রাশিয়া ও ইউরোপীয় সংঘের শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল. আর সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে খাবারভস্ক সম্বন্ধে দিমিত্রি মেদভেদেভ খুবই উষ্ণ মন্তব্য করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন:"আমি আপনাদের শহরকে পছন্দ করি, এটা আমার এখানে প্রথমবার আসা নয়. খাবারভস্ক খুবই পরিস্কার, সুন্দর আর যত্ন পাওয়া শহর. আর একই সঙ্গে এখানে যেটা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে, তা হল এখানে ঐতিহাসিক প্রাসাদ গুলিকে সুরক্ষিত ভাবে রাখা হয়েছে, যার ফলে একটা ঐকতান গড়ে উঠেছে নতুন আর আজ থেকে ১০০ – ১৫০ বছর আগে বানানো বাড়ী ঘরের মধ্যে. শহরে নিজের একটা চেহারাও আছে, এটা খুবই জরুরী. ভাল হয় যদি খাবারভস্ক অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা হয়, যাতে এই শহরের একটা আত্ম পরিচয় থাকে, অননুকরণীয় মাহাত্ম্য থাকে. আর আমার মনে হয়, বর্তমানে এই সব কিছুই এখানে আছে".খাবারভস্ক বিগত দশ বছরের মধ্যে দুই বার দেশের সবচেয়ে ভাল করে সংরক্ষিত শহর বলে সরকারি ভাবে স্বীকৃত হয়েছে. নবীন ও পুরাতন এর জীবন্ত সমাবেশে, ইউরোপীয় ও এশিয়ার সংস্কৃতির সম্মিলনে এই শহর একেবারেই আলাদা রকমের. একজন জাপানী কূটনীতিবিদ একবার এই শহরকে নাম দিয়েছিলেন "সুদূর প্রাচ্যের প্যারিস" বলে.চীন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে আমুর নদীর উপরে যে বন্দর রয়েছে. তার একটা অসাধারণ ইতিহাস আছে, এখানে প্রকৃতি খুবই সুন্দর এবং দেখবার মতো জায়গাও প্রচুর. ১৮৫৮ সালে সেনা বাহিনীর ছাউনি হিসাবে রুশ স্থল পথে অভিযাত্রী এরোফেই খাবারভের স্মৃতিতে এখানে একটি ছোট জনপদ নির্মাণ করা হয়েছিল, তিনি প্রথম রুশী লোক, যে রাশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদীর মোহনাতে এসে পৌঁছে ছিলেন. এর প্রায় ৪৫ বছর পরে এই জায়গার নাম বদলে খাবারভস্ক রাখা হয়েছিল.ঐতিহাসিক ভাবেই এই শহর একটি শক্তিশালী পরিবহন কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল. এই শহরে রেল পথ, নদী পথ, স্থল পথ ও বায়ু চলাচল পথের কেন্দ্রীয় ঘাঁটি রয়েছে যা রাশিয়া মহাদেশ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে এবং সুদূর প্রাচ্যের উত্তর দিকে যোগাযোগ স্থাপন করেছে. খাবারভস্ক শহরে মধ্যে দিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে সুদীর্ঘ রেল পথ ট্রান্স সাইবেরিয়ার রেল ওয়ে গিয়েছে. এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আমুর নদীর উপর দিয়ে সেতু, যা শহরে ঢুকতে হলে প্রথমেই চোখে পড়ে. ১৯১৬ সালে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল সেতু তৈরী করা হয়েছিল. প্রফেসর লাভর প্রসকুরিয়াকভ এর পরিকল্পনা করেছিলেন, ১৯০৮ সালে আইফেল টাওয়ারের সঙ্গে তাঁর এই প্রকল্প একসাথে প্যারিসের বিশ্ব প্রদর্শনীতে পুরস্কার পেয়েছিল. বর্তমানে পুরনো সেতুর সারানোর কাজ শেষ হয়ে এসেছে, শহরে প্রশাসনের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান ভ্লাদিমির এরোখিন রেডিও রাশিয়া কে জানিয়ে বলেছেন:"ওই সেতুটা অন্য সেতুর মত করে বানানো হয় নি, আমাদের সেতুর নীচ দিয়ে আবার রেল পথ রয়েছে, আর উপরে রয়েছে গাড়ী চলাচলের রাস্তা, অন্য সব সেতুতে এটা সাধারণতঃ উল্টো হয়ে থাকে. বর্তমানে একটা দিক খুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, সেখান দিয়ে দুই দিকেরই গাড়ী যাচ্ছে, কর্মীরা দ্বিতীয় দিকটা সারাচ্ছেন, সেটা অনেক বেশী চওড়া হবে. সমস্ত সেতু তে যোগাযোগের রাস্তা সমেত এই সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটার". খাবারভস্ক শহরের বিশেষ গর্বের বস্তু  - এখানকার ঐতিহাসিক যাদুঘর, রাশিয়াতে একটি সেরা যাদুঘর. ১৮৯৪ সালে এটি আয়োজিত হয়েছিল, এই যাদুঘরের নাম দেওয়া হয়েছে আমুর অঞ্চলের জেনেরাল রাজ্যপাল ও রুশ ভৌগলিক সংস্থার এক সময়ের আঞ্চলিক দপ্তরের চেয়ারম্যান ও যাদুঘরের সংস্থাপক নিকোলাই গ্রোদেকভের নামে.যাদুঘরের বাড়ীটি তৈরী হয়েছিল দুই বছর পরে এবং তার সামনে এক চ্ঝুরচ্ঝেন অঞ্চলের পাথরের কচ্ছপ রাখা হয়েছিল, যার ওজন ৬৪০০ কিলোগ্রাম. এখানে রুশ দেশের সমস্ত জায়গা থেকে আমুর নদীর তীরে আসা লোকেদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা জিনিসপত্র রাখা হয়েছে. আমুর অঞ্চলের আদিবাসী লোকেদের সংস্কৃতিও বিশাল সংগ্রহশালাতে দেখানো রয়েছে, অংশতঃ এভেন প্রজাতির লোকেদের. আলাদা একটি বাড়ী আছে আমুর এর যাদুঘর হিসাবে – এই সুদূর প্রাচ্যের মহান ৪৪৪৪ কিলোমিটার লম্বা নদীর জন্য. যাদুঘরের বিশেষ গর্বের বিষয় হল সামুদ্রিক স্টেলার গরুর সম্পূর্ণ একটি কঙ্কাল এখানে আছে. এই সামুদ্রিক জলজ উদ্ভিদ ভোজী বিশাল সিরেন প্রজাতির জন্তুটাকে প্রথম বর্ণনা করেন জার্মান বংশ জাত ও রুশ নাগরিকত্ব প্রাপ্ত জর্জ স্টেলার, যা ১৮ শতক শেষ হওয়ার আগেই মানুষ নির্মূল করে ফেলে প্রজাতি হিসাবে. এই বিষয় নিয়ে যাদুঘরের ডিরেক্টর নিকোলাই রুবান বলেছেন:"আমাদের কাছে বিশ্বমানের এক বিরল বস্তু – স্টেলার সামুদ্রিক গরুর সম্পূর্ণ কঙ্কাল রয়েছে, আলেউত্স দ্বীপ থেকে এটিকে আনা হয়েছে, এই রকম জিনিস বিশ্বে বর্তমানে পাঁচটির বেশী পাওয়া যাবে না, কেউ বলে যে, ইংল্যান্ডে ছয় নম্বর টি রয়েছে. আমাদের আরও অনেক বিরল জিনিস আছে, যাদুঘরে প্রায় চার হাজারেরও বেশী দ্রষ্টব্য রয়েছে".খাবারভস্ক শহরের যাদুঘর সংগ্রহের জন্য প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল সেই ১৯০০ সালে প্যারিসের বিশ্ব প্রদর্শনীতে. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির প্রচুর কাজের তালিকা সহ সফরে অবশ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কোন জায়গা নেই, কিন্তু শহরের প্রশাসনের ইচ্ছা আছে, দিমিত্রি মেদভেদেভ কে সন্ধ্যা বেলায় নদীর পারে বেড়াতে বলার, যেখান থেকে আমুরের পারের চড়াই থেকে দেখতে পাওয়া যায় এই বিশাল নদীর প্রসার ও তার অপরিসীম সৌন্দর্য্য.