মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে ফ্যাসিস্ট জার্মানীর ধ্বংস উপলক্ষে ৬৫ বছর আগে মস্কোর রেড স্কোয়ারে সোভিয়েত বাহিনীর ঐতিহ্যবাহী প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়েছিল. প্রতি বছরই, সেই বহু দিন আগে, এই প্যারেডে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা উত্কণ্ঠা নিয়ে দিন গুনতে থাকেন আগে থেকেই, যেন আবার করে সেই দিনটিকে অনুভব করতে থাকেন.১৯৪৫ সালের ২৪শে জুন মস্কোতে সকাল থেকেই ভীষণ বৃষ্টি হয়েছিল. কিন্তু এই প্যারেডে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের বোধহয় কোন খেয়ালই ছিল না দুর্যোগের দিকে, তাঁদের পোষাক, মাথার হেলমেট থেকে অঝোরে জল ঝরে চলেছিল. ঠিক দশটার সময়ে ক্রেমলিনের বড় ঘড়ির ঘন্টার শব্দে রেড স্কোয়ারে সাদা ঘোড়ায় চড়ে সোভিয়েত লাল ফৌজের মার্শাল গিওর্গি ঝুকভ উপস্থিত হয়েছিলেন, তিনি প্যারেড কম্যাণ্ডার মার্শাল কনস্তানতিন রকোসোভস্কির রিপোর্ট শুনে তাঁর সঙ্গে একসাথে সমস্ত সেনা দলের সামনে দিয়ে প্রদর্শন শেষ করেছিলেন.গিওর্গি ঝুকভ তাঁর ভাষণে বলেছিলেন: "বর্তমানে সকলেই মেনে নিয়েছে যে, জার্মানীর বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক জয়ে মূল ভূমিকা সোভিয়েত দেশের লাল ফৌজের. তিন বছর ধরে লাল ফৌজ মুখোমুখি যুদ্ধ করেছে জার্মানী ও তার উপগ্রহের মত সমর্থক দেশ গুলির বাহিনীর বিরুদ্ধে. শুধুমাত্র নিজের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষাতেই লাল ফৌজ সমর্থ হয় নি, বরং ইউরোপের জনগনকে জার্মানীর আগ্রাসন থেকে উদ্ধার করেছে".তারপর রেড স্কোয়ার দিয়ে প্যারেড করে গিয়েছিল ৪০ হাজার সেনা ও অনেক সামরিক যানবাহন, তারপর সবচেয়ে মনে রাখার মত সময় শুরু হয়েছিল – অর্কেস্ট্রা থেমে গিয়েছিল, শুধু ৮০ টা ড্রাম বাজছিল সেই নিথর নৈশব্দকে ভঙ্গ করে.প্রথমে এগিয়ে এসেছিল দুশো ফ্যাসিস্ট পতাকা হাত নিয়ে এক বাহিনী সৈন্য. তাদের পতাকা গুলি রেড স্কোয়ারের ভিজে পাথরের উপর দিয়ে প্রায় লেপটে আসছিল, লেনিন মুসোলিয়ামের পাদদেশে রাখা দুটো কাঠের সিঁড়ির উপর যোদ্ধারা ছুঁড়ে ফেলেছিল শত্রুর পতাকা. প্রথমে পড়েছিল হিটলারের প্রতীক বাহী পতাকা. তারপর ভারী জিনিস পড়ার শব্দ করে একেএকে অন্য পতাকা গুলি, সমস্ত দর্শকেরা গ্যালারী থেকে হর্ষ ধ্বনি করে উঠেছিল, করতালি দিয়েছিল, প্রায় মনে হচ্ছিল যেন কোন বিস্ফোরণ হয়েছে. ১৪০০ অর্কেস্ট্রার বাজনদার একসাথে বাজিয়ে প্যারেড করে বেরিয়ে গিয়েছিল রেড স্কোয়ার থেকে অনুষ্ঠানের ইতি ঘোষণা করে.এই বিশেষ প্যারেডের সৌভাগ্যবান অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ১৯ বছরের মেশিনগান চালক নিকোলাই মরোজভ. তিনি প্রাচীন রুশ শহর কিরভ অঞ্চলের কতেলনিচ শহরের লোক, সতেরো বছর বয়সে তিনি চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে, আর যুদ্ধ শেষে ফিরে এসেছিলেন বীর চক্র নিয়ে সম্পূর্ণ যোদ্ধা হিসাবে. মরোজভ বলেছেন যে, তখন প্যারেডের জন্য যাদের বাছা হয়েছিল, তাদের জন্য বিশেষ করে বলে দেওয়া হয়েছিল যে, সকলের যুদ্ধে মেডেল পাওয়া হতে হবে, লম্বায় ১৭৬ সেমি বা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি আর বয়সে ৩০ বছরের বেশী হলে চলবে না. নিকোলাই মরোজভের অবশ্য এই তিনটের সবই ছিল, নিজে রঝেভ শহর রক্ষার যুদ্ধে জান কবুল লড়াই করেছিল, তারপর কুর্স্ক উপদ্বীপ ও দ্নীপার নদী তীরের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, গ্দানস্ক শহরের যুদ্ধে গিয়ে আহত হয়ে ছিল হাসপাতালে, তারপর সে ছিল লম্বা এক অল্প বয়সী ছেলে."আমাদের সকলকে লোকে খুবই সানন্দে বরণ করে নিয়েছিল, নাম মনে নেই আমরা রেড স্কোয়ারে যাওয়ার পথে কোন রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলাম, তবে দু দিকেই লোকে ভীড় করে সারি দিয়ে হাততালি দিচ্ছিল, আমাদের ফুল দিচ্ছিল, গালে চুম্বন করেছিল, তাদের চোখে ছিল একই সাথে হাসি আর কান্না. এ কখনো ভোলা যায় না". আজ অবশ্যই সেই চল্লিশ হাজারের খুব কম লোকই বেঁচে রয়েছেন, তবুও যাঁরা আছেন, তাঁরা কিন্তু প্রতিবারই ২৪ শে জুন ঠিক নাম না জানা সৈনিকদের কবরের সামনে সমবেত হয়ে ক্রেমলিনের আলেকজান্ডারের বাগানে ফুলের মালা দেন, তারপর ক্রেমলিনের দেওয়ালের গায়ের কবর গুলিতে মার্শাল ঝুকভের মূর্তির সামনে ফুল রাখেন – মনে করেন সেই দিনটির কথা, যখন ফ্যাসীবাদকে হারিয়ে দিয়ে একই সারিতে হেঁটে গিয়েছিলেন, সাধারন সেনা ও মার্শাল এবং জেনারেল দের দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে – মানুষেরা যারা এমন কি জার্মানদেরও আজ বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন মানুষের মত.