৪ই জুন সহস্র রুশ লোক আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি কে শেষ বিদায় জানাবেন. বিখ্যাত তম কবি, যিনি এক যুগের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, জীবনের ৭৮ তম বছরে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন. তাঁর সাথে বিদায়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে সকাল ১০টায়. লোকেরা শোক প্রকাশের ফুল ও মালা নিয়ে  শেষ বারের মত সেই লোককে বিদায় দিতে এসেছেন, যিনি তাঁর জীবন দিয়ে এবং শিল্প দিয়ে আবারও প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, "রাশিয়াতে কবি হওয়া মানে কবির চেয়েও বড় হতে পারা".    আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি – সেই সব কবিদের একজন যাঁরা ১৯৬০ এর দশকে বিশাল সমস্ত হল ঘরে বহু সহস্র লোককে শুধু কবিতা শোনার তাগিদে জড় করতে পারতেন. বহু বছরের ঠাণ্ডা একনায়ক তন্ত্রের রুদ্ধশ্বাস অবস্থা ভেঙে সোভিয়েত দেশে এই সময়ে আসা খোলা হাওয়ার ঝলক, "একটু উষ্ণতা" তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়ে এক রকমের "নীতিগত নূতনত্ব" নিয়ে এসেছিল. যদিও নতুন কমিউনিস্ট নেতারা ভজনেসেনস্কিকে মেনে নিতে পারতেন না ও তখনকার সোভিয়েত দেশের প্রধান নিকিতা খ্রুশ্চেভ জনসমক্ষে তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন. বর্তমানে দেশের প্রধানেরা কবির রচনার প্রতি একেবারেই অন্য দৃষ্টিতে দেখেন, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর পাঠানো শোক বার্তাতে বলেছেন: "আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি তাঁর যুগের প্রতি এক অনন্য তীক্ষ্ণ অনুভূতি পেয়েছিলেন. তাঁর কবিতা ও গদ্য ছিল ভালবাসা, সত্যিকারের অনুভূতি, বদান্যতা ও স্বাধীনতার স্বপক্ষে গাওয়া মহা সঙ্গীত". তাঁর প্রিয় ও পরিজনদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ.    আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির মৃত্যু শিল্পীদের ও যাঁরা তাঁর প্রতিভার সমাদর করেছেন, তাঁদের জন্য এক বিশাল ক্ষতি. "অসীম দুঃখের ও অপরিসীম শোকের" বলে তাঁর মৃত্যুর কথা বলেছেন, কবির নিকটতম বন্ধু এবং কবিতা লেখার কারখানার সহকর্মী বেল্লা আখমাদুলিনা. বেআইনি ভাবে এক সময়ে ছাপা হওয়া "মেট্রোপোল" নামের সাহিত্য পত্রিকা, যা আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির সাথে একসাথে বের করতেন সেই লেখক ভিক্তর এরোফেয়েভ বিশ্বাস করেন যে, "আমরা সেই কবিকে হারালাম, যাঁর কবিতা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম মুখস্থ করে পড়বে, তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতীক, সেই সত্যের প্রতিফলন – যা বলে যে আমাদের একমাত্র রক্ষা কবচ হল সাহিত্য".    দেশের প্রতিটি বইয়ের দোকানে কবির প্রথম কবিতা সংগ্রহ রাখা আছে ক্ল্যাসিক্যাল বইয়ের সারিতে আর শেষ দিকের কবিতা সংগ্রহের বই জায়গা পেয়েছে আধুনিক সাহিত্যের তাকে. তিনি সব সময়েই সেই রকম করে লিখেছেন, যেমন করে শ্বাস নিতে পেরেছেন, তাঁর ছন্দ, বাক্যের বিশেষ গঠন, শব্দ নিয়ে পরীক্ষা রুশ সাহিত্যে অনেক নতুন সংযোজন করেছে. এর সঙ্গে ভজনেসেনস্কি ছিলেন খুবই থিয়েটারে অভিনয়ের উপযুক্ত লোক, তাঁর কবিতা মঞ্চ কাঁপিয়ে দিত. এই কথা মনে করে মস্কোর তাগানকা থিয়েটারের অভিনেত্রী আল্লা দেমিদোভা মনে করেছেন, যেখানে তাঁর কবিতা অবলম্বনে বিখ্যাত নাটক "প্রতিবিশ্ব গুলি" উপস্থাপনা করা হয়েছিল.    আল্লা দেমিদোভা বলেছেন: "তাঁর মধ্যেই ছিল এক অসাধারন ছন্দের বোধ – কখনও রক এন্ড রোল, কখনো কোরাস, কখনও তীক্ষ্ণ স্টাক্কাটো, অথবা হঠাত্ করেই নীরবতা চাই, নীরবতা চাই, স্নায়ু কি তাহলে জ্বলে পুড়ে খাক! কখনও হঠাত্ করেই ভিসোতস্কি ঢুকে পড়েন. এই সব অসংখ্য নানা রকমের ছন্দ আমাদের থিয়েটারের উপস্থাপনায় ভজনেসেনস্কির হাত ধরে শরীরের ভঙ্গিমা হয়ে এসেছিল".    অভিনেত্রী যোগ করেছেন – কবি মারা যান না, তাঁর পরেও থেকে যায়, তাঁর কন্ঠস্বর, তাঁর ছন্দ, তাঁর সুর...    প্রায় তিন দশক হতে চলল মস্কোর "লেন কম" থিয়েটারের উপস্থাপনার তালিকা থেকে রক অপেরা "ইউনোনা ও আভোস" নামের গীতি নাট্য, যা সঙ্গীতকার আলেক্সেই রীবনিকভ আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির কবিতায় সুর দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তা বাদ পড়েনি. সঙ্গীতকার তাঁর ভাগ্য কে অসীম ধন্যবাদ জানিয়েছেন কারণ তাঁর সম্ভব হয়েছিল এমন কবির কবিতাকে সুর দেওয়ার. কবির সঙ্গে কাজ করতে পারার. তিনি বলেছেন, "ভগবান নিশ্চয়ই তখন রুশ দেশকে চুম্বন করেছিলেন, যখন ভজনেসেনস্কি জন্মেছিলেন".    "এই সময়ে যখন তিনি আর নেই, আমি বুঝতে পারছি যে, তিনি – আমাদের সভ্যতার শেষ কবি, শুধু আমাদের নয়, সমস্ত সভ্যতার জন্যই তা সত্য. হতে পারে তিনি সত্যই শেষ এত বড় মাপের কবি".    আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির সম্বন্ধে এমনকি তারাও জানে, যারা উচ্চ স্তরের কবিতার অনেক দূরের শ্রোতা বা পাঠক, কারণ তিনি তো জনপ্রিয় গানের জন্যও কথা দিয়েছেন. দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত গান "লক্ষ লাল গোলাপ" গানটি যেটি জনপ্রিয় রুশ গায়িকা আল্লা পুগাচেভা গেয়েছেন, সেটিও তো তাঁরই লেখা. তাই আজ গায়িকা বলেছেন:    "আমার হৃদয়ে কখনোই এই লক্ষ লাল গোলাপ শুকিয়ে যাবে না, যা তিনি তাঁর কবিতা দিয়ে আমাকে উপহার দিয়েছেন. আমি শোক প্রকাশ করছি এবং মনে করি যে, আমার সঙ্গে তাঁর বহু লক্ষ ভক্তরা আজ এই অনুভূতি প্রকাশ করছেন".    আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি যাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক গুণী মানুষেরা রয়েছেন – যেমন, সালভাদোর দালি, মার্ক শাগাল, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, মায়া প্লিশেত্স্কায়া এবং তাঁর স্বামী – সঙ্গীতকার রদিওন শেদ্রিন. শেদ্রিনের সঙ্গে তিনি এক নতুন ধরনের সৃষ্টি করেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন "পোয়েটেরিয়া" – কবির কবিতা পাঠের সঙ্গে লোক সঙ্গীত শিল্পী মহিলা গায়িকাদের গান, কোরাস এবং সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা. রদিওন শেদ্রিন কিছুতেই মনে করতে চান না যে, তাঁর বন্ধু চলে গেলেন চির কালের জন্য...    "আমি বিশ্বাস করি যে ও অমর হবেই. বড় শিল্পীদের মর জীবন শেষ হলেই চির দিনের জন্য জীবনের শুরু হয়. তিনি সত্যি কারের স্রষ্টা ছিলেন, তাই এটা জানতেন ও বিশ্বাস করতেন"...    আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কিকে মস্কোর নভোদেভিচি কবর খানাতে আজ চির শয্যায় শায়িত করা হবে, যেখানে রাশিয়ার বহু সেরা লোকেরা আছেন, তাঁদের মধ্যে.