রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি সবচেয়ে বেশী জানা কবিতার অংশ "আমার গান- আমার বিদায়ের উপহার- পথ হতে পাঠিয়ে তোমায়". মস্কোতে ভারতের সংস্কৃতি কেন্দ্রে সে দিন অনেক রাত অবধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতাটি ও আরও অনেক কবিতা, গান ও সঙ্গীত ধ্বণিত হয়েছিল. ঐতিহ্য মেনে এবারেও এই রবীন্দ্র সন্ধ্যায় গান, কবিতা ও পাঠে অংশ নিয়েছিলেন ভারতীয় ও রাশিয়ার স্কুলের ছেলেমেয়েরা, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রীরা, ব্যবসায়ী ও ভারতীয় হিন্দুস্থানী সমাজের সদস্যরা. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪৯ তম জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে এই সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছিল.    রাশিয়ার জাতীয় শিল্পকলা ইনস্টিটিউটের অগ্রণী বৈজ্ঞানিক কর্মী ডঃ তাতিয়ানা মরোজভা আমাদের দেশে রবীন্দ্র সঙ্গীতের উত্তরাধিকারের উপরে বইয়ের লেখিকা, তিনি এই দিন বললেন তাঁর জীবনে রবীন্দ্র সঙ্গীত কি করে অনুপ্রবেশ করেছিল.     "মস্কোর কনজারভেটরি শেষ করার পর তখন সংবাদ সংস্থা এ পি এন প্রকাশিত সোভিয়েত দেশ পত্রিকার বাংলা ভাষা দপ্তরের কাজের প্রধান আমার স্বামীর সাথে কলকাতা শহরে যাই, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি আগে না জানা এক অপূর্ব সঙ্গীতের জগতে প্রবেশ করি. একদিন স্থানীয় রেডিওতে একটি দারুণ সুন্দর গান বাজছিল, আমি জানতে পারলাম যে এই গান ও তার কথা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সোভিয়েত দেশে থাকতে আমি তো তাকে শুধু কবি ও লেখক বলেই জানতাম, তিনি যে এত সুন্দর সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন তা জানা ছিলনা. স্বভাবতই মনে হয়েছিল কয়েকটা অন্ততঃ গান শেখা দরকার, কিন্তু তা করতে গিয়ে আমার এক অন্তহীণ পথ চলা শুরু হয়েছিল, যা আজও চলছে. তাঁর গানের মানে বয়সের সঙ্গে, উপলব্ধির সঙ্গে পাল্টায়, প্রায় প্রতিটি মানবিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির জন্যই কোন না কোন গান তিনি লিখেছেন, তার সুরের বিস্তার ও প্রসার আন্তর্জাতিক সঙ্গীত থেকে, ধ্রুপদ, ধামার, রাগ সঙ্গীত, পল্লী গীতি কোথায় নেই. আমার গুরু দেব শঙ্কর দ্বিবেদী আমাকে গান শিখিয়েছিলেন, কলকাতাতে থাকার সময়. আজও আমার প্রিয় গান কিন্তু সেই প্রথম গানটিই – সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে…."    কথা বলতে বলতে তিনি নিজেই গানটি গেয়ে উঠেছিলেন, সম্মিলিত জনতা হর্ষ ধ্বনি করে উঠেছিল.    অবশ্যই রবীন্দ্র সঙ্গীত, কবিতা ইত্যাদির সবচেয়ে ভাল পরিবেশক তাঁর দেশের মানুষেরাই. আর তাই সে দিন বাঙালীরা তাঁদের রবীন্দ্র বোধ ও জ্ঞান রুশীদের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল. স্কুল ছাত্র উদিতাংশু ঔরঙ্গবাদকর রবীন্দ্রনাথের ছড়া "আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে" পড়ে হাততালি কুড়িয়েছিল. তারপরে বাংলায় ও হিন্দীতে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছিলেন হারমোনিয়াম নিয়ে রুমি দাস, তাঁর সঙ্গে সঙ্গতে ছিলেন তবলায় আমাদের "রেডিও রাশিয়া" কর্মী সুমিত সেনগুপ্ত ও জওহরলাল নেহরু সংস্কৃতি কেন্দ্রের ছাত্র সের্গেই এমিলিয়ানোভ বাজিয়ে ছিলেন বাঁশি.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা আমাদের দেশে আগেও চর্চা করা হয়েছে ও এখনও তা অব্যাহত. বর্তমানে তা রাশিয়ার মস্কো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউট ও মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া ও আফ্রিকা ইনস্টিটিউটে পড়ানো হয়. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের শিক্ষিকা ইরিনা প্রকোফিয়েভা খুবই শঙ্কিত ছিলেন, তাঁর ছাত্রীরা কি রকম বাংলা কবিতা পড়বে তাই নিয়ে, তিনি তাই আগেই অনুরোধ করেছিলেন যে, তাঁর ছাত্রীদের উচ্চারণের জন্য খুব সমালোচনা না করতে, কারণ মাত্র দুই বছর হল তাঁরা বাংলা শিখছে, যদিও তাদের রবীন্দ্রনাথকে বাংলায় জানার আগ্রহ অনেক.    ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৫০ বছর পূর্তি উত্সব সারা ভারতে ও বিশ্বে সাড়ম্বরে পালিত হতে চলেছে, এই বিষয়ে গঠিত আয়োজক জাতীয় পরিষদের প্রধান হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ, মস্কোর জওহরলাল নেহরু সংস্কৃতি কেন্দ্রের ডিরেক্টর মনীশ প্রভাত এই খবর জানিয়ে বলেছেন যে, তিনি আশা করেন যে আগামী বছর রাশিয়াতেও এই জয়ন্তী বহু জায়গায় পালিত হবে. ভারতের এই সঠিক অর্থে আন্তর্জাতিক লেখক, কবি, সঙ্গীতকার, শিল্পী, দার্শনিক এবং মনীষীর জন্ম তিথি পালনের মধ্যে দিয়ে সম্মান জানানো হবে.

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অবিস্মরণীয় রচনা শেষের কবিতা থেকে নেওয়া একটি কবিতাতে রাশিয়ার সঙ্গীতকার আলেক্সেই রীবনিকভ সুর আরোপ করে গান রচনা করেছিলেন. গানটি প্রথম বেজেছিল "আপনি স্বপ্নেও দেখেন নি" নামের একটি বিখ্যাত সিনেমাতে. রাশিয়ার বিভিন্ন রেডিও স্টেশন প্রায়ই শ্রোতাদের অনুরোধে এই গানটি বাজিয়ে থাকেন. রবীন্দ্র সন্ধ্যায় সভাপতি ও আয়োজক হিন্দুস্থানী সমাজের প্রেসিডেন্ট "রেডিও রাশিয়া"র বাংলা বিভাগের প্রবীণ কর্মী ডঃ রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের আগে এশিয়া ও আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছাত্রীরা গীটার বাজিয়ে এই গানটি গেয়েছিল. তাঁদের সারা হলের লোকেরা গলা মিলিয়ে ও হাততালি দিয়ে উত্সাহিত করেছিল.