ইরানের নেতৃত্বকে এবারে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে, আর তা যদি হয় পারমানবিক বোমা বানানো, তবে তা অনেক কঠিন হবে. ১৯শে মে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার বয়ান রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে, এবারে তা আনা হয়েছে বাকী দশ দেশের অস্থায়ী সদস্যদের গোচরে.

    এই দলিলে বলা হয়েছে যে, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ পরিষদের পর্যবেক্ষণের দাবী ও এর আগের নিরাপত্তা পরিষদের গৃহীত তিনটি সিদ্ধান্ত অবহেলা করেছে, আর একই সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কুম শহরে পারমানবিক জ্বালানী শতকরা বিশ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধি করণের উপযুক্ত কারখানা বানিয়ে যাচ্ছে ও জ্বালানী সমৃদ্ধি করণের কাজ করছে. এই দলিলের রচয়িতাদের আরও উদ্বিগ্ন করেছে ইরানের ঐসলামিক বিপ্লব পাহারাদার দলের পক্ষ থেকে পারমানবিক শক্তি পরিকল্পনাতে প্রভাবের প্রসার, এই উচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রযুক্তি কাঠামো বিগত কিছু কাল ধরে ইরানের সমস্ত ক্ষেত্রেই তাদের প্রভাব বিস্তার করছে. এই সবই তাঁদের মতে নিষেধাজ্ঞা জারী করার জন্য কারণ হতেই পারে. কি ধরনের এই নিষেধাজ্ঞা? আমরা তা ব্যাখ্যার জন্য দ্বারস্থ হয়েছিলাম প্রাচ্য বিশারদ প্রফেসর ভ্লাদিমির সাঝিনের কাছে.

    "গত বছরের হেমন্ত কালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা তেহরানের পক্ষ থেকে বাস্তবে প্রমাণ যোগ্য অসহযোগিতার কথা, তখনই ঐসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিপক্ষে নিষেধাজ্ঞা জারী করার কথা আলোচনা করা শুরু হয়. পশ্চিমের দেশ গুলি কঠিন ব্যবস্থার কথা বলেছিল, তার মধ্যে ইরান থেকে খনিজ তেল রপ্তানী ও তাদের পেট্রোল আমদানী বন্ধের কথাও ছিল. রাশিয়া ও চীন এই ধরনের কঠিন ব্যবস্থার বিরুদ্ধতা করেছিল, কারণ তাহলে সাধারন ইরানের মানুষদের স্বার্থহাণী হবে. তাই বর্তমানের বয়ানে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার কথা মূল অংশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে. কিন্তু তাও এই দলিল এই রকম, বলা যেতে পারে নরম বয়ানেও যথেষ্ট কঠিন বলেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, এমন কি আগের তিনটি সিদ্ধান্তের বয়ানের চেয়েও অনেক কঠিন রূপে".

    "এবারের নিষেধাজ্ঞার বয়ানে লেখা হয়েছে যে, ইরানের জাহাজ গুলিকে কোন বন্দরে নোঙর করতেই দেওয়া হবে না, যদি সন্দেহ হয় যে, সেখানে কোন রকমের অস্ত্র রয়েছে. প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞাতে বলা হয়েছে যে, ইরানকে বেশ কিছু ধরনের অস্ত্র সম্ভার বিক্রী করতে দেওয়া যাবে না, যা থেকে ব্যালিস্টিক মিসাইল বা পারমানবিক বোমার কোন অংশ বানানো সম্ভব হয়. একই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে যে কোন ধরনের বিনিয়োগ যা নিরস্ত্রীকরণের ব্যবস্থার প্রতিরূপ হতে পারে. ইরানের ঐসলামিক বিপ্লব পাহারাদার দলের সদস্যদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করে দেওয়া হবে ও তাদের বিদেশের ব্যাঙ্কে রাখা অর্থ ব্যবহারের অযোগ্য করে রাখা হবে. রাশিয়া ও চীন জোর দিয়েছে যে, বহু ব্যবস্থাই যেন অবশ্য কর্তব্য না হয়ে অনুদেশ মূলক হয়. এইটি ইরানের জাহাজ গুলি পর্যবেক্ষণ ও তাদের কাছে অস্ত্র আছে এই সন্দেহে বন্দরে ভিড়তে না দেওয়া ও ইরানে বিদেশী বিনিয়োগ এবং ইরানের ব্যাঙ্কের শাখা গুলিতে অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার বিষয় রয়েছে. কিন্তু সব মিলিয়ে, আবারও বলি যে, এবারে নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই কঠিন হয়েছে. এগুলি সবই প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে, যদি ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আচমকা পর্যবেক্ষণের শর্ত মেনে নেয়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য নতুন প্রকল্প থেকে বিরত হয় ও ইউরেনিয়াম খনিতে বিনিয়োগ করা বন্ধ করে এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা বন্ধ করে".

    "আপনার মতে কেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশ একমাত্র এখন এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে একমত হতে পেরেছে? কি রকমের সম্ভাবনা আছে যে, নিরাপত্তা পরিষদের বাকী অস্থায়ী সদস্য দেশ গুলিও তাঁদের মত মেনে নেবেন? কারণ কয়েকদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মানুচেহর মোতাক্কি ঘোষণা করেছিলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যে নতুন নিষেধাজ্ঞা আদৌ গৃহীত হবে, সে রকমের সম্ভাবনা নেই".

    "প্রথমে আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর দিয়ে শুরু করছি. দশটি অস্থায়ী সদস্য দেশের মধ্যে শুধু ব্রাজিল, তুরস্ক ও লেবানন এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কথা বলেছে, আর এই নিষেধাজ্ঞা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন ১৫টির মধ্যে ৯ টি ভোট. সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত গরিষ্ঠ অংশ ইতিমধ্যেই রয়েছে. এ ছাড়া যারা বিরুদ্ধে, তাদের বুঝিয়ে রাজী করানোর মত সময়ও রয়েছে, যাতে তাঁরা অবস্থান বদল করেন. যাঁরা এই নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করছেন. তাঁদের হাতে ইরানের সরকারই যুক্তি জুটিয়ে দিয়েছেন. তেহরানের ওই লোক দেখানো কাজ কর্ম – যেমন, নিজেরাই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছি বলা অথবা কারখানা বানাচ্ছি বলা, মোটেও কোন ধরনের সহমতে আসার উপযুক্ত প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে না, সুতরাং নিষেধাজ্ঞা জারী হবেই এই রকম চলতে থাকলে. তাদের বোঝানোর বদলে এবারে যারা নিষেধাজ্ঞার পক্ষে তারা চেয়েছেন, ধীরে চাপ বাড়াতে হবে. সুতরাং বর্তমানের কঠিন নিষেধাজ্ঞার জন্য ইরানের সরকারকে নিজেদেরই ধন্যবাদ দেওয়া দরকার. নিষেধাজ্ঞার পক্ষে আরও একটি যুক্তি রয়েছে, যা খুব কম সময়েই শোনা গিয়েছে. অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেছেন যে, এই দলিলের ফলে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রবাহকে হয়ত থামানো সম্ভব হবে, ইজরায়েল ও তার সহযোগী দেশেরা বহু দিন ধরেই যে যুদ্ধের জন্য তৈরী হওয়া মনোভাব দেখাচ্ছিল, তা হয়ত এবারে কিছুটা ঠাণ্ডা হবে. বর্তমানে আমার মতে, সময় হয়েছে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার সমস্যা নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা করার. আর সেই ধরনের কথোপকথন শুরু হবে কি না, তা নির্ভর করছে অনেকটাই ভবিষ্যতে তেহরানের উপরে".