তারকোভস্কি সৃষ্ট আধ্যাত্মিক একক গুলিতে সমস্ত সাধারন মানবিক ধারণা গুলি সঠিক জায়গা পেয়েছে. শিল্প সমালোচক ইরিনা ইজমাইলোভা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই খান থেকেই তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলি দীর্ঘ কালের জন্য জীবনী শক্তি পেয়েছে. প্রথমতঃ এটা "স্তালকের" সম্পর্কে বলা যেতে পারে. ঠিক তিরিশ বছর আগে আন্দ্রেই তারকোভস্কি সৃষ্ট এই দৃষ্টান্ত মূলক চলচ্চিত্র প্রথম সোভিয়েত সিনেমার পর্দায় আত্ম প্রকাশ করেছিল, যা বিশ্বের সিনেমার উন্নতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হয়েছিল.

    সোভিয়েত দেশ থেকে পাকাপাকি ভাবে চলে যাওয়ার সামান্য কিছু দিন আগে এটি ছিল তাঁর শেষ এই দেশে নির্মিত চলচ্চিত্র. "স্ত্রুগালস্কি" ভাইদের রচিত কাহিনী "রাস্তার ধারে পিকনিক" অবলম্বনে এই সিনেমার কাজ চলেছিল খুবই কঠিন ভাবে. কাহিনীর লেখকেরা তাঁদের গল্পের চিত্রনাট্য নয় বার বদল করেছিলেন, তাঁরা তাঁদের ধৈর্য্যের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে, আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল এক প্রতিভাধর ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করার. শেষ অবধি এক বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনীর থেকে সিনেমাতে বাকী থেকে গেল শুধু এলাকার আর শিকারীর ধারণা যে সেই এলাকাতে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে. এলাকা – এটা একটা জটিল মারণ ফাঁদে ভর্তি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতি মিনিটে সমস্ত কিছু পাল্টে যায়. শুধুমাত্র এই ব্যবস্থা ঠিক করে কাকে ইচ্ছা ঘরে ঢুকতে দেবে, যেখানে সবচেয়ে বেশী আশা করা ও কষ্ট করে পাওয়া ইচ্ছা পূরণ হয়ে থাকে. তারকোভস্কির সিনেমার পর থেকে "জোনা" -এলাকা ও "স্তালকের" — শিকারী সকলের জানা নামে পরিনত হয়েছিল. সিনেমার চরিত্ররা এক গোপন জায়গায় হঠাত্ই পৌঁছে গিয়ে সব সময়েই তাদের বেদনার বিষয়ে কথা বলেছিল, সেই বিশ্বকে যা তাদের ছেড়ে আসতে হয়েছে, তার সম্বন্ধে. কিন্তু সিনেমার ছবির পট একেবারেই আচমকা নতুন করে এই সব কথাবার্তার মাত্রা বদল করে দেয় এবং বাধ্য করে সমস্ত ছবিটাকেই ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে. "তারকোভস্কি আমার জন্য সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্রকার, কারণ তিনি সিনেমাকে এক নতুন স্বপ্নসম, ছবির বিশেষ ভাষা দিয়েছেন" – এই ভাবেই একবার সুইডেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ইঙ্গমার বার্গম্যান এই রুশ পরিচালকের সম্বন্ধে বলেছিলেন, যাকে তিনি মনে করেছিলেন, তাঁর সমমনা ও যোগ্য উত্তরসূরী. কারণ আর্ট ফিল্মের সঙ্গে তারকোভস্কির নাম অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত. আর আধুনিকোত্তর যুগের সমস্ত শৈলী বোধ, যা ১৯৮০ র দশকের শুরুতে উদয় হয়েছিল, বাস্তবে শুরু হয়েছিল এই "স্তালকের – শিকারী" ছবির সঙ্গেই.

     রেডিও রাশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ইরিনা ইজমাইলোভা স্তালকের ছবিটিকে বলেছিলেন নতুন বিশ্ব গুলির জন্ম দাতা, তিনি বলেছেন:

    শিল্পের মূল্যায়ণে বোধহয় সবচেয়ে নিরপেক্ষ সমালোচক হল সময়. তিরিশ বছর পার হয়ে গেল সিনেমাটি তৈরী হওয়ার পর, কিন্তু আজও তা এক জীবন্ত সত্তার মতো নিজের এক অনন্য পথে বেঁচে রয়েছে, যার থেকে নতুন সব সিনেমার সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্তালকের সিনেমার ছবির শৈলীর সমর্থনে বা তার সঙ্গে বিরোধেই সম্ভব. আমার মনে হয় এর গোপন কথা হল – তারকোভস্কির সিনেমা বিশ্বের সংস্কৃতির সমস্ত বিখ্যাত তম সাফল্যের এক গলিত নিঃসার. এই স্রোতের বাহক হয়ে তারকোভস্কি কাউকে মনে করিয়ে দেন, কাউকে বা পরিচয় করিয়ে দেন এক গভীরতার সঙ্গে, যেখানে সারা বিশ্বের সমস্ত মূল্যবান বিষয় বস্তু, যেমন, বাখ এর সঙ্গীত, আন্দ্রেই রুবলিয়ভের আইকন, পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কোর ফ্রেস্কো, লিওনার্দ দা ভিঞ্চি ও পেত্রা ব্রেইগেলের ছবি. তাঁর সিনেমা – এক অপরূপ সঙ্গম, যেখানে সমস্ত সংস্কৃতি, সময়, ধর্ম এক হয়ে এক অভিনব নতুন বিশ্ব সমষ্টির সৃষ্টি করে, যেমন, রাশিয়াতে প্রথম মানবাধিকারের সম্বন্ধে চলচ্চিত্র উত্সব স্তালকের নামে তৈরী করেছিল. ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি এই উত্সব শুরু হয়েছিল, যখন আমাদের দেশ আগের মূল্যবোধের দিক নির্দেশিকা গুলির পরিবর্তনের ও ভাঙ্গনের সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, যে উত্সব মনে করতে সাহায্য করেছিল যে, তাও কিছু চিরন্তনী সত্য রয়ে গেছে. প্রায় সমস্ত বিশ্বের পরিচালকেরাই চান দর্শকের কাছে সেই ধারণা পৌঁছে দিতে, যা তারকোভস্কির সিনেমাতে বহু দিন আগেই বলা হয়ে গিয়েছে, প্রমাণ হালের ব্লক বাস্টার আভাতার – অবতার, যেখানে পরিচালক প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বিশ্বের সমস্ত কিছুই মানুষের জ্ঞানের উপর নির্ভর করে রয়েছে. ১৯৮০ সালে প্রথম দুই মাসে স্তালকের দেখেছিল বিশ লক্ষ লোক, তার ছবিতে প্রতিটি দর্শকই নিজের মত করে সেই ভবিষ্যত বাণী পড়তে পারেন, যা তারকোভস্কি সবার জন্যেই রেখে গেছেন, আর এখানেই তাঁর ছবির সার্থকতা.

    আন্দ্রেই তারকোভস্কি একবার বলেছিলেন, যে, স্বাধীনতা আলাদা করে বেছে নেওয়ার জন্য নেই – স্বাধীনতা হল মানুষের আত্মিক অবস্থা, তাই এই কথাই তিনি শিকারী ছবিতে পথ নির্দেশনার জন্য বলে গিয়েছেন.