১৫ই মে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বলে বাস্তবেই যাকে মানা হয়, সেই মস্কো শহরের পাতাল রেলের ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে.

    রাশিয়ার রাজধানীর প্রধাণ ও সবচেয়ে বিশ্বাস যোগ্য পরিবহণ ব্যবস্থা হল মস্কোর পাতাল রেল. ব্যবহারিক পরিমাপে শুধু টোকিও শহরের পাতাল রেলের চেয়ে এটি পিছিয়ে. মেট্রো রেলের ব্যবস্থায় ১২ টি লাইন, যার মোট দৈর্ঘ্য ২৯৮ কিলোমিটারেরও বেশী ও ১৮০ টি স্টেশন রয়েছে.

    সকোলনিকি থেকে পার্ক কুলতুরি অবধি প্রথম রেল লাইন খোলা হয়েছিল ১৯৩৫ সালের ১৫ই মে. মাটির নীচের প্রাসাদোপম সৌন্দর্য্য – আলোর প্রাচূর্য্য ও স্টেশন গুলির ভিতরের কারুকার্য সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রীদের মুগ্ধ করেছিল. শুধু দেওয়ালের গায়ে লাগানোর জন্যই ২২ হাজার স্কোয়ার মিটার মর্মরের টালি ব্যবহার করা হয়েছিল, আর প্রায় ২০ রকমের মর্মর ককেশাস, আলতাই, উরাল ও মধ্য এশিয়া থেকে আনানো হয়েছিল. তার সঙ্গে ছিল গ্র্যানাইট, রডোনিট, গোমেদ ও অন্যান্য পাথর ও. প্রথম দিকের বহু স্টেশনের ভিতরের সজ্জার স্রষ্টা আলেক্সেই দুশকিনের নাতনি বাস্তুকার নাতালিয়া দুশকিনা বলেছেন:

    "বিশ্বের অন্য কোন মেট্রোতেই নানা শিল্পের সমন্বয়ের এই রকমের কাজ ব্যবহার করা হয় নি. প্রথমে মস্কো মেট্রোতে দেখা গিয়েছিল স্থাপত্য, দেয়াল অঙ্কন বা ফ্রেস্কো, মোজাইকের কাজ. কেন মোজাইক বেছে নেওয়া হয়েছিল, প্রসঙ্গতঃ প্রথম মোজাইকের ব্যবহার হয়েছিল দুশকিনের সময়ে, তার কারণ হল গলানো অস্বচ্ছ কাচ, এই ছোট্ট রঙীণ কাচের টুকরো গুলো যেন নিজের মধ্যে আলো শুষে নিয়ে তারপর একটা ওজন বিহীণ, হাল্কা স্বচ্ছতা সৃষ্টি করে, অন্ততঃ তিনি এই কথাই কারণ হিসেবে তাঁর জীবন স্মৃতিতে লিখেছিলেন. মনে হত যেন এই গুলো ছাদ থেকে খুলে নিলেই মাথার উপর পরিস্কার নীল আকাশ দেখতে পাওয়া যাবে".

   খুবই কষ্টকর হয় আজ মনে করা যে, এই সমস্ত সৌন্দর্য্য বাস্তবে খালি হাতে করা হয়েছিল. আজ আমরা জানি যে, তখনকার কংক্রীট ঢালাই করার কাজ মোটেও যন্ত্র দিয়ে করা হয় নি, তখন সিমেন্ট ও বালির মিশ্রণ বালতী করে আর স্ট্রেচারের মত বহন যোগ্য জিনিসে করে নিয়ে যাওয়া হত. মাটি খোঁড়ার জন্য নিউম্যাটিক হাতুড়ি বেশী ছিল না বলে গাঁইতি দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছিল. তা স্বত্ত্বেও আশ্চর্য সুন্দর সব স্টেশন তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল, যার একটাও অন্যটার সঙ্গে এক রকমের নয়. অবশ্যই তা সম্ভব হয়েছিল উপমা বিহীণ প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত ব্যবহার করেই, তাই বাস্তুকার নাতালিয়া দুশকিনা বলেছেন:

    "প্রথমতঃ স্টেশন গুলির আয়তন অবিশ্বাস্য রকমের বড় করা হয়েছিল, যা তখন পশ্চিমের দেশ গুলিতে ছিলই না. রেলের সুড়ঙ্গের ব্যাস প্রায় পাঁচ ছয় মিটার পর্যন্ত, তখন লন্ডনের মেট্রোর ব্যাস ৩. ৭ মিটার আর বার্লিনের ৩. ৫ মিটার ছিল. আর আমাদের যেন জায়গাটাকে ফুলিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্ল্যাটফর্মের প্রস্থ ৪ মিটার থেকে বাড়িয়ে ২২ মিটার করা হয়েছিল. আর এটাও বিরাট জায়গা, যদি ইউরোপে সবচেয়ে দীর্ঘ স্টেশন ছিল ১১০ মিটারের, তবে মস্কোর মেট্রোতে স্টেশন তৈরী করা হয়েছিল প্রায় ২০০ মিটারেরও বেশী. আসলে কার্যক্ষেত্রে মস্কোতে মাটির নীচে আরও একটা একই রকম শহর তৈরী করা হয়েছিল, যা শিল্প সম্মত, মূল্যবান ও অর্থবহ. আর স্টেশন গুলি পরিণত হয়েছিল এক রকমের খুব বড় মাপের মাঠ ও রাস্তার মত".

    এই সব স্টেশনের স্থাপত্য ও ভিতরের কাজে অংশ নিয়েছিলেন সেই সময়ের সোভিয়েত দেশের সবচেয়ে নাম করা বাস্তুকার, স্থপতি ও শিল্পীরা – যেমন, শ্যুসেভ, দুশকিন, কোরিন, লানসেরে, দেনেইকা. এঁদের সম্মিলিত প্রয়াসেই সত্যিকারের মাস্টার পীস তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল. ক্রাসনিয়ে ভারোতা ও ক্রপোতকিনস্কায়া স্টেশন ও ১৯৩৮ সালে তৈরী মায়াকোভস্কায়া স্টেশন আজ স্থাপত্য ও নির্মাণের অমূল্য উদাহরণ হয়ে দেশের সংরক্ষিত সম্পদে পরিণত হয়েছে.

    মেট্রো নির্মাণের কাজ মহান পিতৃভূমির যুদ্ধের সময়েও থেমে তাকে নি, শুধু একটা ঘটনা শুনলেই অনেক কিছু বোঝা যায়, ফ্যাসিস্ট বাহিনীর ঘেরাও করা লেনিনগ্রাদ শহরে মস্কো শহরের নতুন মেট্রো স্টেশনের জন্য স্থপতি আলেক্সেই ফ্রোলভ বিখ্যাত শিল্পী আলেকজান্ডার দেনেইকা যেমন এঁকেছিলেন, তেমন সমস্ত মোজাইক এর ছবি তৈরী করেছিলেন. ১৯৪২ সালে কাজ শেষ হওয়ার পর ফ্রোলভ বুভুক্ষার কারণে মারা যান, তাঁর সম্বন্ধে নাতালিয়া দুশকিনা বলেছেন:

    "স্থপতি তাঁর স্মৃতি কথাতে লিখেছিলেন যে, "আমি সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা ঘরে বসে আছি, খুব খিদে, ঘর গরম করার জলের পাইপ ফেটে তাতে জল জমে বরফ হয়ে গেছে, আর আমি জানি যে, আমরা সেই স্টেশনের জন্য মোজাইক বানাচ্ছি, যা সেই সব মানুষের শ্রমের জয়গান গাইবে, যারা দেশকে রক্ষা করছেন. এই স্টেশনের ঠিক উপরেই লিখাচেভ এর নামে কারখানা আছে, সেখানে আমাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রের পুরো ভাগে ট্যাঙ্ক তৈরী করে পাঠানো হচ্ছে". দুশকিনা বলেছেন যে, অবশ্যই এই দুঃখ কষ্ট ছিল অবিশ্বাস্য, মোজাইক তৈরী করা হয়েছিল লেনিনগ্রাদে আর তা একমাত্র যোগাযোগের জীবনের পথ দিয়ে আনা হয়েছিল মস্কো মেট্রোর কাজের জন্য. এটা অবশ্যই অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক বাস্তব. সমস্ত শক্তি দেওয়া হয়েছিল এমন সব স্টেশন তৈরী করায়. যাতে তা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে ও মানুষ সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ধৈর্য্য ধরে জিততে পারে".

    আমাদের সময়ে বিদেশীদের বিশেষ করে মস্কোর মেট্রো স্টেশন বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়, শহরের অতিথিরা এই সব মেট্রো স্টেশনের শিল্প কলা দেখে অভিভূত হয়, তাঁরা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ছবি তোলেন মস্কো মেট্রোর প্রাসাদের এই সব মোজাইকের কাজের, মূর্তির ও খোদাই করা স্থাপত্যের নিদর্শনের. এই রকম কিছুই অন্য দেশে নেই, সেখানে ব্যবহারের জন্য তৈরী মেট্রোর দেওয়ালে থাকে শুধু বিজ্ঞাপনের রঙীণ পট. মস্কোর মেট্রো সত্যই এক বিরল স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের স্মৃতি সৌধ. এই রকমই ভাবা হয়েছিল আজ থেকে ৭৫ বছর আগে.