৬ই মে ১৯৪৫ শুরু হয়েছিল প্রাগ শহর আক্রমণের অপারেশন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাল ফৌজের শেষ ইউরোপীয় পরিকল্পিত আক্রমণ.

    তখন হিটলারের বাহিনীকে বার্লিনের দিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর চেখস্লোভাকিয়ার জমিতেই দখল করে থাকা অবস্থায় একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতা সম্পন্ন নাত্সী বাহিনী ছিল, রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর সার্বিক ইতিহাস ইনস্টিটিউটের যুদ্ধ ও ভৌগলিক রাজনীতি কেন্দ্রের অগ্রজ বৈজ্ঞানিক সহকর্মী ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ওলেগ রেঝেশেভস্কি বলছেন:

    "এই দলটা ছিল হিটলারের "কেন্দ্র" নামের বাহিনীর অন্তর্গত, তাতে প্রায় দশ লক্ষ সৈনিক ও অফিসার, দশ হাজার কামান ও বোমা নিক্ষেপের অস্ত্র, দু হাজারের কাছাকাছি ট্যাঙ্ক এবং প্রায় এক হাজার যুদ্ধ বিমান ছিল. প্রাগ যারা মুক্ত করেছিল, তাদের মূল শক্তি ছিল প্রথম ইউক্রেনের ফ্রন্টের বাহিনী, যার নেতৃত্বে ছিলেন সোভিয়েত দেশের মার্শাল কোনেভ. পশ্চিম থেকে চেখস্লোভাকিয়ার সীমান্তে এগিয়ে আসছিল জেনেরাল প্যাটনের নেতৃত্বে তৃতীয় আমেরিকান সেনা বাহিনী. সোভিয়েত ও আমেরিকার সেনা বাহিনীর এগিয়ে আসার সঙ্গে চেখ প্রতিরোধ আন্দোলনও সক্রিয় হয়ে উঠেছিল".

    প্রাগে বিদ্রোহের আগুণ জ্বলে উঠেছিল. বিদ্রোহীরা রেডিও দপ্তর দখল করে ফেলেছিল. ইথারে বেজে উঠেছিল আহ্বান: প্রাগের বাসিন্দারা, আমরা আপনাদের প্রাগের জন্য লড়াই করতে আহ্বান করছি, এই লড়াই দেশের লোকের স্বাধীনতা ও সম্মানের লড়াই! আমরা যুদ্ধ করব! এগিয়ে চলো যুদ্ধে! রেডিও বিদ্রোহের কেন্দ্র হয়েছিল, শহরের লোকেরা আগ্রাসনের প্রতীক ধ্বংস করতে শুরু করেছিল – জার্মান সাইন বোর্ড ও দিক নির্দেশ সব কিছু. ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়েছিল, এই বিদ্রোহে প্রায় তিরিশ হাজার প্রাগের নাগরিক অংশ নিয়েছিল.

    এই সময়ে মার্শাল কোনেভ তাঁর বাহিনীর সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিলেন দ্রুত আক্রমণ করতে, ক্লান্তিকে আমল না দিয়ে. সেনা বাহিনীর দলেরা প্রতি দিনে ৪০ -৫০ কিলোমিটার করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ৯ই মে ভোর সকালে প্রাগ শহরে বাধা ভেঙে ঢুকেছিল টি -৩৪ ট্যাঙ্ক লেফটেন্যান্ট ইভান গনচারেঙ্কোর নেতৃত্বে. একই দিনে উনি তাঁর দলের লোকেদের সাথে একসাথে ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন কারী দের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন.

    অল্প সময় পরেই ফ্যাসিস্ট দের বিরোধ ভেঙে দেওয়া গিয়েছিল, প্রাগের একজন নাগরিক তার ডায়েরীতে লিখেছিল: "৯ই মে বেলা বারোটা, রাস্তায় গোলমাল. রুশ বাহিনীর বিখ্যাত ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ী যাচ্ছে, সেনা বাহিনীর ছেলেরা সবাই ক্লান্ত, ধূলি মলিন, চারদিক থেকে চিত্কার শোনা যাচ্ছিল: হুররে! জয়! শতশত হাত একসাথে নাড়ছে, প্রতিটি ট্যাঙ্ককে দেখে স্বাগত জানিয়ে চিত্কার করছে. যখন এই বাহিনী এসে থামল, এক রুশী সৈন্য তার একোর্ডিয়নে সুর তুলল, তার কয়েকজন বন্ধু শুরু করল নাচতে. ট্যাঙ্ক গুলিকে লাইলাক ফুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল". লাইলাক ফুল প্রাগে মে মাসের শুরুতে ফোটে, তাই এই ফুলই ছয় বছরের নাত্সী আগ্রাসনের হাত থেকে রাজধানী মুক্ত হওয়ার প্রতীক হয়েছিল.

    বিজয়ের পরেও আরও কিছু দিন ধরে সোভিয়েত সেনারা বাড়ী গুলির চিলে কোঠাতে লুকিয়ে গুলি যারা ছুঁড়েছিল, সেই সব হিটলারের গুপ্তচর বাহিনীর লোকেদের ধরেছিল. ১২ ই মে পর্যন্ত প্রাগের উপকন্ঠে যুদ্ধ চলেছিল. তারপর ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতি হয়েছিল.

    সোভিয়েত বাহিনী পোল্যান্ড, রুমানিয়া ও চেখস্লোভাকিয়ার সেনা বাহিনীর সাথে একসঙ্গে প্রায় ৮ লক্ষ ৬০ হাজার জার্মান সেনা ও অফিসারকে বন্দী করতে পেরেছিল, তার মধ্যে ৬০ জন জেনেরাল ছিল. এই বিজয়ের উপলক্ষে "প্রাগের মুক্তি" নামে পদক ঘোষিত হয়েছিল. প্রাগের অপারেশনে যোগ দেওয়া প্রায় চার লক্ষ সৈন্য এই পদক পেয়েছিল.