২৫৫ বছর আগে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, রাশিয়ার বৃহত্তম পড়াশোনা করার প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের বিজ্ঞানের এক কেন্দ্র স্থল.

    ১৭৫৫ সালের ৭ই মে তিরিশ জন ছাত্রের সামনে দেওয়া প্রথম লেকচারে প্রফেসর নিকোলাই পাপোভস্কি ঘোষণা করেছিলেন: "এমন কোন চিন্তা নেই যা রুশী ভাষায় প্রকাশ করা যায় না". এই ধারণা তখন ছিল খুবই সাহসী, কারণ সেই সময়ে জ্ঞানের ভাষা বলে শুধু লাতিন ভাষাকেই স্বীকার করা হত. কিন্তু প্রফেসর খুব ভাল বিশ্লেষক ছিলেন: দুই শতক পরে রুশী ভাষা শুধুমাত্র বিশ্বের বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ভাষাই হয় নি, বরং রাষ্ট্রসংঘের পাঁচটি সরকারি ভাষার একটিতে পরিণত হয়েছে. আর এই বিষয়ে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঐতিহাসিক কৃতিত্ব আছে, যেখান থেকে বিভিন্ন বছরে বহু বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও সমাজ কর্মী শিক্ষিত হয়েছেন.

    প্রথম রুশী বিশ্ববিদ্যালয়, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয় গুলির থেকে ভিন্নতর হয়ে ছিল তার ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্রের জন্য. সেখানে কোন আধ্যাত্মিক বিভাগ বা গির্জার সেন্সরশীপ কাজ করত না. বলা দরকার যে, অবশ্যই ভগবানের আইন ধরনের পাঠ অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল, কিন্তু সে গুলি যত না পড়াশোনার প্রয়োজনে ছিল, তার চেয়ে বেশী ছিল শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে. পরে মহান রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেদভেদেভ যথার্থ ভাবেই এই বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে: "সঠিক শিক্ষা বিহীণ জ্ঞান – পাগলের হাতে তরোয়ালের মত".

মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও রুশ ইতিহাস ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর আন্দ্রেই সাখারোভ মনে করেন যে, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এমন এক ঘটনা, যার পর থেকে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক চিন্তার উন্নতি শুরু হয়েছিল. তিনি বলেছেন:

    "রাশিয়াতে লৌকিক সমাজের উন্নতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ. যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানেই রয়েছে জ্ঞান, স্বাধীনতা, পক্ষপাতীত্ব হীনতা এবং বিজ্ঞান. আর এই প্রথম পক্ষপাতীত্ব হীনতা ও স্বাধীনতার মৌলিক অঙ্কুর গুলিই রুশ লৌকিক সমাজ ও তার চেতনা বিকাশের কারণ হয়েছে".

    প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাকাডেমিক মিখাইল লোমনোসভের জীবদ্দশাতেই ৩০ জন ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন জিমন্যাসিয়াম এর পড়ুয়ারা সরকারি খরচে পড়াশোনা করত. তারা সকলেই সমাজের নানা স্তর থেকে আসা প্রতিভাবান মানুষ ছিল.

    উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে কাটানো নিজের সরকারি বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করার দিনগুলি নিয়ে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ফিওদর বুসলায়েভ যেমন মনে করে বলেছিলেন: "আমরা সব কিছুই পেতাম, কিছু নিয়েই চিন্তা করতাম না, পকেটে একটা পয়সা না থাকলেও শিখেছি, পড়াশোনা করেছি আর মজা করেছি প্রাণ খুলে. সব ছিল সরকারি, জামা কাপড়, বইপত্র থেকে শুরু করে চর্বির মোমবাতি, লেখার কাগজ, পেন্সিল, কালি, কলম সব কিছুই. আমরা উচিত মতো পড়েছি আর সুযোগ মত মজা করেছি".

    ১৭৫৫ সালে মিখাইল লোমনোসভের পরিকল্পনা মতোই মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয়েছিল তিনটি বিভাগ: দর্শন, আইন ও চিকিত্সা বিদ্যা. নিজেদের পড়াশোনা ছাত্রেরা শুরু করত দর্শন বিভাগে, সেখানেই পাওয়া যেত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিজ্ঞানের ভিত্তি মূলক শিক্ষা. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যেত পরে হয় আইন বা চিকিত্সা বিদ্যা বিভাগে অথবা আবার দর্শন বিভাগেই.

    বর্তমানে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ইনস্টিটিউট রয়েছে, ৪০ টি বিভাগ এবং ৩০০ টি শাখা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার ছাত্র এবং পি এইচ ডি স্কলার পড়াশোনা করছেন. মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন ও অন্যান্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে এবং অস্ট্রেলিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আরব দেশগুলির ৬০ টিরও বেশী বিদেশী কেন্দ্র, সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে.

    ১৯৪৬ সালে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বিদেশী ছাত্ররা পড়তে এসেছিল, তখন থেকে এখানে ১৫ হাজারেরও বেশী উচ্চ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ ১৫০ টি অন্যান্য দেশের জন্য তৈরী হয়েছেন. প্রতি বছরেই মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ এরও বেশী ছাত্র ছাত্রী বিশ্বের বহু দেশ থেকে পড়তে আসে.

    মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই শুধু মাত্র পড়াশোনার বা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেরই জায়গা ছিল না, এই সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের মন্দিরে সারা ইতিহাসেই পরিপুষ্ট ও ঋজুতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সেই বিশেষ "বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা", যাতে নৈতিকতা, আত্ম সম্মান জ্ঞান এবং মানুষের ভিতরের স্বাধীনতাকে ততটাই উচ্চ মূল্য দেওয়া হয়েছে, যতটা দেওয়া হয়েছে উচ্চ শিক্ষাকে.