মহান পিতৃভূমির যুদ্ধ সম্পর্কিত সমস্ত সত্য ও ইউরোপকে জার্মান ফ্যাসীবাদী আক্রমণকারীর হাত থেকে মুক্ত করায় সোভিয়েত সেনা বাহিনীর ভূমিকার কথা পৃথিবীর জানা উচিত. বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ইজভেস্তিয়া পত্রিকায় ও রাশিয়ার দূরদর্শনের প্রথম চ্যানেলে দিমিত্রি মেদভেদেভের দেওয়া সাক্ষাত্কারের এই ছিল মূল সুর.

    পূর্ব ইউরোপের কিছু রাজনীতিবিদের নিজেদের তাত্ক্ষণিক স্বার্থের কথা ভেবে যে বহু দিনের পুরনো ঐতিহাসিক ঘটনার বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তার বিরোধিতা করার প্রয়োজন পড়েছে. এই কাজ নাত্সী অপরাধীদের সোজাসুজি পুনঃ স্থাপন এবং সোভিয়েত সেনা বাহিনীর ভূমিকা ও ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনকারীদের একই আসনে বসানোর প্রচেষ্টা অবধি চলেছে. কিন্তু দিমিত্রি মেদভেদেভের বক্তব্য অনুযায়ী সত্য হল এই রকম:

    "আমাদের জনতার বাছাই করার কিছু ছিলনা: যারা তখন এ দেশে থাকতেন, তাদের মৃত্যু অথবা দাসত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া তৃতীয় কোন পথ ছিল না – এটা বাস্তব ঘটনা. আরও একটি প্রশ্ন: যুদ্ধ কারা শুরু করেছে এবং কারা এই অন্যায়ের জন্য দায়ী? এই পরিস্কার সত্যটাও যা কিনা শুধুমাত্র ন্যুরেমবার্গের বিচারের মামলাতেই নয়, এমনকি অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে নথিবদ্ধ হয়েছে. ঐতিহাসিক ঘটনার ধারাকে আগে পরে করে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা নিষ্ঠুর পরিকল্পনার মতই দেখাচ্ছে".

    সোভিয়েত সেনা বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, সত্য এই যে, হিটলারের সৈন্য বাহিনীর ৭০ শতাংশ ক্ষয় হয়েছিল শুধু পূর্ব দিকের লড়াইতে. তা স্বত্ত্বেও যুদ্ধ পরবর্তী কালে কেউই আমাদের দেশের ভূমিকাকে মহত্ বলে উল্লেখ করতে চায় নি, দিমিত্রি মেদভেদেভ বিষয়টি বিশেষ করে উল্লেখ করেন.

    যুদ্ধের সময়ে লাল ফৌজ এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের ভূমিকাকে যুদ্ধ পরবর্তী কালে যা ঘটেছিল তা থেকে আলাদা করতে পারার মধ্যেই ঐতিহাসিকদের এবং সুস্থ চিন্তা করতে সক্ষম সাধারন মানুষদের মুন্সীয়ানায় লুকিয়ে রয়েছে. অবশ্যই বাস্তবে এটা আলাদা করতে পারা খুবই কঠিন, কিন্তু এটা করা দরকার, যাতে আবার জোর দিয়ে বলা যায় যে, যদি লাল ফৌজের ভূমিকা, অগণিত আত্মত্যাগ, যা সোভিয়েত জনতা যুদ্ধের বেদীতে নিবেদন করেছিল, না থাকত তবে আজ ইউরোপ অন্য রকম হত. আধুনিক, স্বচ্ছল, বর্ধিষ্ণু, ধনী আর উন্নতিশীল ইউরোপ হত না. তা যে হত না – এটা এহ বাহ্য.

    জল্লাদকে কোন ভাবেই বলী বলা যেতে পারে না. যারা আমাদের সেনাবাহিনী ও ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনকারীদের ভূমিকাকে একই মানদন্ডে বিচার করতে চায়, তারা নৈতিক অপরাধ করছে. সেই অর্থে কিছু বাল্টিক উপকূলবর্তী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের চেয়ে আধুনিক জার্মান জাতি যথেষ্ট যোগ্য আচরণ করছে.

    মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে স্তালিনের ভূমিকার মত বিতর্কিত বিষয় ও দিমিত্রি মেদভেদেভ তাঁর সাক্ষাত্কারে তুলেছেন. প্রথমতঃ, রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন যে, এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে জয় হয়েছে আমাদের দেশের জনতার, স্তালিন কিংবা সেনাবাহিনীর অধিনায়কদের নয়, তারা যতই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকুন না কেন.

    "বিগত যুদ্ধের কোন শিক্ষাগুলি তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দিমিত্রি মেদভেদেভ উল্লেখ করেছেন যে, সেগুলির মধ্য প্রধানতম হল রাশিয়ার উচিত  বিভিন্ন দেশের এবং বিশ্ব সমাজের অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে একসাথে বর্তমানের বিপদ গুলির মোকাবিলা করার চেষ্টা করা. আগ্রাসক ও স্বৈরাচারীকে শান্ত করার চেষ্টা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই কোন ইতিবাচক ফল দেয় না, বিশেষত যখন স্বৈরাচারী একবার ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে অথবা লোভী হয়ে ওঠে. তাই বর্তমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নতুন কার্যকরী ব্যবস্থা করা, যেহেতু রাষ্ট্রপতির মতে বর্তমান ব্যবস্থা মোটেও যথোপযুক্ত নয়. ২০০৮ সালে জর্জ্জিয়ার দক্ষিণ অসেতিয়া আক্রমণের মত নাটকীয় ঘটনা এই বিষয়ের প্রমাণ. ঠিক এর পরেই ইউরোপের নিরাপত্তার আধুনিক পরিকাঠামো তৈরী করার ধারণার উত্পত্তি হয়েছিল. বিশ্ব সমাজকে খুঁজে পেতে হবে এমন মঞ্চ যেখানে বিভিন্ন সমস্যার সার্বিক সমাধান করা সম্ভব হবে, বিরোধের অবসান ঘটিয়ে. দিমিত্রি মেদভেদেভের মতে আমাদের পূর্বসুরীরা গত শতকের তিরিশের দশকে এই রকমই ভেবেছিলেন, কিন্তু তাদের সাহসে কুলোয় নি প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার. তার ফল সর্ববিদিত – কঠিনতম, মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ. এই কারণেই এখন আধুনিক আন্তর্জাতিক পরিকাঠামো তৈরী করার জন্য কাজ করা দরকার".

     দিমিত্রি মেদভেদেভের মতে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলির জন্যও এই ধরনের নীতিই নেওয়া যেতে পারে. যেমন জাপান দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জ ফেরত নেওয়ার বিষয়কে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে নিতে চাইছে. রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেছেন যে, এটি যথেষ্ট জটিল সমস্যা হলেও এই বিষয়ে কাজ করা দরকার. এখন এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মস্কোরও নিজস্ব ধারণা আছে – কি ভাবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে প্রাথমিক ভাবে রাশিয়া প্রজাতন্ত্রের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে. জাপানের সহকর্মীরাও একই কাজ করছেন. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির মতে যদি সক্রিয়ভাবে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়, সততার সঙ্গে এবং চরম দৃষ্টিভঙ্গী ত্যাগ করে, তবে শেষ অবধি ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব.

    সাক্ষাত্কারের শেষে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভেটেরানদের এবং সমগ্র দেশবাসীকে বিজয় দিবসের অভিনন্দন জানিয়েছেন. যেহেতু দিমিত্রি মেদভেদেভের কথামতো রুশীদের জন্য এই উত্সব যথার্থই সাবর্জনীন.

<sound>