রাশিয়াতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জয়ের জয়ন্তীর ৬৫ বছরের উত্সব হবে ৯ই মে, আর ইউরোপে এই দিনটি সব সময়েই ৮ই মে পালন করা হয়ে থাকে, কিন্তু তা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যেতে হবে সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের যাদুঘরে, যেখানে জার্মানীর সহকর্মীরা এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন.

এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য হল জার্মানীর নিঃশর্ত আত্ম সমর্পণের চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে যে সমস্ত রূপকথা আর কাহিনী প্রচলিত আছে, তার ধোঁয়ার আবরণ দূর করে দেওয়া. যাদুঘরের বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনী যোগ্য বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার স্মিরনভ বলেছেন:

"৭ই মে ১৯৪৫ সালে ফ্রান্সের রেইমস শহরে নাত্সী জার্মানীর আত্ম সমর্পণের চুক্তি প্রথমে স্বাক্ষরিত হয়েছিল. আর তাই ইউরোপ ও আমেরিকার লোকেরা ৮ই মে বিজয় দিবস পালন করেছিল. তারা ৮ই মে ধরে নিয়েছিল যে, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে. আর আমাদের দেশে এই খবর পৌঁছেছিল শুধুমাত্র ৯ই মে, যখন দ্বিতীয়বার আত্ম সমর্পণের চুক্তি বার্লিনে কার্লসহর্স্টে স্বাক্ষরিত হয়েছিল".

    ব্যাপারটা হল ১৯৪৫ সালের মে মাসে হিটলারের উইল অনুযায়ী তৈরী হওয়া অ্যাডমিরাল ডিওনিত্স এর সরকার শেষে একটা ষড়যন্ত্র করতে চেয়েছিল. তাদের দূতের দল ফ্রান্সের রেইমস শহরে এসে পৌঁছেছিল, যেখানে মিত্র দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধান দপ্তর ছিল, তারা সেখানে পশ্চিমের ফ্রন্টে আত্ম সমর্পণ করতে চেয়েছিল, — যাতে সোভিয়েত নেতৃত্বের হাতে জার্মানীর সৈন্য বাহিনীর অবশিষ্টাংশ না পড়ে. ডিওনিত্স আশা করেছিল যে, হিটলার বিরোধী মিত্র বাহিনীর মধ্যে এই নিয়ে ফাটল ধরবে. কিন্তু তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করা হয়েছিল, অ্যাডমিরালের কাছে দাবী করা হয়েছিল যে, অবিলম্বে বিনা শর্তে তিনটি প্রধান বড় দেশের সামনে, অর্থাত্ সোভিয়েত দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের কাছে একসাথে সমস্ত ফ্রন্টে আত্ম সমর্পণ করার জন্য. যুদ্ধের পরিনাম তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল: সোভিয়েত বাহিনী ২ রা মে বার্লিন দখল করে নিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ তার পরেও চলেছিল, মানুষ তখনও মারা যাচ্ছিল.

    ৭ই মের ভোর রাতে ২টো বেজে ৩০ মিনিটে আত্ম সমর্পণের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল. কিন্তু জেনেরাল সুসলোপারভ, যিনি এই দপ্তরে সোভিয়েত দেশের পক্ষ থেকে মিত্র বাহিনীতে প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, তিনি চুক্তির বয়ান ও তা সম্পন্ন হওয়ার সময় সম্বন্ধে জানতে পেরেছিলেন ৬ই মে বেশ রাতে. তিনি তত্ক্ষণাত মস্কো থেকে নির্দেশ চেয়ে পাঠিয়ে ছিলেন, এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন আলেকজান্ডার স্মিরনভ:

    "ইভান সুসলোপারভ আত্ম সমর্পণের চুক্তির বয়ান তো মস্কো পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি কোন উত্তর পান নি. আর তার উপর নির্ভর করছিল জার্মানীর সঙ্গে সোভিয়েত দেশের যুদ্ধ তারপরও চলবে নাকি এই মূহুর্তে তার উপর দাঁড়ি টানা হবে, তারপর সোভিয়েত সেনা বাহিনীর সৈন্য এবং অফিসাররা এই যুদ্ধে আর মারা পড়বে না. মস্কো থেকে সময় মতো নির্দেশ না পেয়ে, নিজের বিপদের আশঙ্কা নিয়ে ভয় স্বত্ত্বেও তিনি নিজে এই আত্ম সমর্পণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং তার সঙ্গেই শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গেই নয়, সোভিয়েত দেশের সঙ্গেও নাত্সী জার্মানীর যুদ্ধের অবসান হয়".

    স্তালিন এই ঘটনাতে খুশী হন নি. প্রথমতঃ তাঁর ভাল লাগেনি যে জায়গায় এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হল, ফ্রান্সের রেইমস, সই করেছে দ্বিতীয় সারির নেতারা… স্তালিন জোর করেছিলেন যে, এই চুক্তি আরও আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত হোক, একেবারে শত্রুর সদর দপ্তরে, জার্মানীর রাজধানী বার্লিনে, সোভিয়েত দেশের চেয়ারম্যান হওয়া বৈঠকে. মিত্র বাহিনী মেনে নিয়েছিল.

    … "আমরা নিম্ন লিখিত বয়ানে স্বাক্ষরকারীরা, এই ভাবেই চুক্তিটি শুরু হয়েছিল, — জার্মানীর উচ্চতম সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বের পক্ষ থেকে, রাজী হয়েছি বিনা শর্তে আমাদের সমস্ত জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষের সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য সমস্ত শক্তির পক্ষ থেকে, যা বর্তমানে জার্মানীর নেতৃত্বে চালিত হচ্ছে, তাদের সকলের পক্ষ থেকে বিনা শর্তে সোভিয়েত দেশের লাল ফৌজের প্রধান নেতৃত্বের কাছে ও মিত্র অভিযাত্রী বাহিনীর প্রধান নেতৃত্বের কাছে আত্ম সমর্পণ করছি"… ছোট বয়ান, মাত্র পাঁচটি পয়েন্ট. তারপর স্বাক্ষর: "কেইটেল, ফ্রিদেনবার্গ, শ্টুম্পফ". সোভিয়েত দেশের পক্ষ থেকে বিখ্যাত সামরিক প্রধান মার্শাল জুকভ উপস্থিত ছিলেন, আর মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে- বিমান বাহিনীর মার্শাল টেডার.

    রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের যাদুঘরের আলেকজান্ডার স্মিরনভ বলেছেন: "যখন এই আগ্রাসকের উপর জয়ের প্রমাণ দেখতে ও পড়তে পারা যায়, তখন আরও একবার বিশ্বাস করতে হয় যে, ভয়ঙ্কর শত্রুর বিরুদ্ধে জয় লাভের জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচার ধারা ইত্যাদির তফাতের উপর নির্ভর না করে এক জোট হওয়া কতটা জরুরী, যে শত্রু সমস্ত মানব জাতি ও সভ্যতার জন্য শুধু মৃত্যুই বহন করে এনেছে. সোভিয়েত দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে যথেষ্ট বড় রকমের মত পার্থক্য থাকলেও একে অপরকে বুঝে সহমতে আসা সম্ভব হয়েছিল. অবশ্যই বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যুদ্ধ পরবর্তী কালে এই সহমত নষ্ট হয়ে যাওয়াতে এবং বিভিন্ন কারণে বিশ্বে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল. আর বোধহয়, এখন খুবই জরুরী হল বুঝতে পারা যে, এই বিজয় হয়েছিল সবার মিলিত শক্তিতেই. প্রত্যেকেই যে যার নিজের অবদান রেখেছিল, আর এ সম্বন্ধে বোধহয় বলা উচিত্ হবে যখন আমরা জার্মানীর আত্ম সমর্পণের কথা বলব".

    রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের যাদুঘরের আলেকজান্ডার স্মিরনভ বলেছেন: "আত্ম সমর্পণের দলিল – এটা একমাত্র দলিল, যা জার্মানীর সহকর্মীরা রাজনৈতিক যাদুঘরে দ্রষ্টব্য করে রেখেছেন – এই দলিল তিনটি ভাষায় রচিত – রুশী, ইংরাজী ও জার্মান. অন্য সব দ্রষ্টব্য হল ছবি – রেইমস শহরে চুক্তি স্বাক্ষর, তারপর কার্লসহর্স্টে, বার্লিনের উপকন্ঠে. আনন্দিত ইউরোপের লোকেরা, আমেরিকার সেনারা, সোভিয়েত মানুষেরা".

    "সবাই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সম্মিলিত বিজয়ের উত্সবে মেতে উঠেছিল, অন্য কথা হল যে, এই উত্সব পরে ভিন্ন দিনে পালন করা হতে থাকল, আর তা যেন ভাগ করে দিয়েছিল পশ্চিমের জার্মানীর উপর বিজয় ও সোভিয়েত দেশের জার্মানীর উপর বিজয় কে. কিন্তু আমার জন্যে, একজন ঐতিহাসিক হিসাবে, রেইমস শহরের ৭ই মের ঘটনা ও কার্লসহর্স্টে ৮ই মের ঘটনার মানে একই. আমরা সারা বিশ্বের কাছেই ভয়ঙ্কর এই সম্মিলিত, প্রচুর বেদনা বহুল, কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় বিজয়ের স্মৃতি যেন আগামী প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে পারি…"

    সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রদর্শনী হবে মে মাসের শেষ পর্যন্ত. আর বিশেষ প্রদর্শনী যা বার্লিনের কার্লসহর্স্টে আত্ম সমর্পণ যাদুঘরে আয়োজন করা হয়েছে তা চলবে আগামী ৮ই জুলাই পর্যন্ত.