বিশ্বে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির উন্নতির সময়ে সাংবাদিকের পেশায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ গুণগত পরিবর্তন আসছে এবং ট্র্যাডিশন অনুযায়ী চলে আসা সংবাদ মাধ্যম গুলি এক বিশাল বড় জটিল নতুন সমস্যা সমষ্টির সম্মুখীন হয়েছে.

    মস্কো রিগা ভিডিও কনফারেন্সে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন: "রেডিও রাশিয়া" কোম্পানীর চেয়ারম্যান আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি, আন্তর্জাতিক টেলি রেডিও কোম্পানী "মির" এর চেয়ারম্যান রাদিক বাতীরশিন, লাতভিয়ার সাংবাদিক সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ইউরিস পাইদেরস্, লাতভিয়ার জাতীয় টেলিভিশন ও রেডিও উপদেষ্টা সভার চেয়ারম্যান আব্রাম ক্লেত্সকিন, "বাল্টিক নিউজ সার্ভিস" তথ্য পরিষেবা সংস্থার বোর্ড অফ ডিরেক্টরের চেয়ারম্যান সিগিতা কিরিলকা, "লাতভিয়া টেলিভিশন কোম্পানী"র ডিরেক্টর এডগারস কোটস ও অন্যান্যরা.

    বর্তমানের তথ্য পরিবহনের মাধ্যমের উন্নতি তথ্য উত্পাদক ও তার গ্রাহকের সম্পর্কের মধ্যে এক উল্লেখ যোগ্য পরিবর্তন করেছে, যেমন, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সহজেই ডিজিট্যাল টেলিভিশনের বাস্তব বিকল্প হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে দর্শকের কাছে টেলিভিশনের চ্যানেলের সংখ্যা খুবই বেশী রকম বেড়ে যায়.

    এক দিক থেকে দেখলে এই ঘটনা নানা ধরনের তথ্য উত্পাদক সংস্থার মধ্যে প্রচুর প্রতিদ্বন্দ্বীতা শুরু করে, আবার আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি যেমন বলেছেন, তা গ্রাহকের বা দর্শকের মধ্যে প্রচুর বিভাজন ও করে দেয়.

    সমাজ তাকে ঐক্যবদ্ধ করার উপযুক্ত বিশ্বের ঘটনা প্রবাহের সম্বন্ধে জ্ঞান বৃদ্ধি করার উত্সকে হারায় আর তার বদলে নানা রকমের ইচ্ছা অনুযায়ী তথ্য বিষয় আহরণের গ্রাহকের নানা দলে পরিনত হয়. প্রসঙ্গতঃ নতুন ব্যবস্থাতে গ্রাহকই ঠিক করে সংবাদ মাধ্যম কি বিষয়ে প্রচার করবে.

বর্তমানের সমাজে সিগিতা কিরিলকা যেমন বলেছেন, সাংবাদিকের ভূমিকা একই রকম ভাবে দেখা হয় না, তিনি বলেছেন বিগত কিছু কাল ধরে সবচেয়ে বেশী পরিমানে লোকে চাইছে বিশ্বাস যোগ্য এবং পরিস্কার তথ্য, কোন রকমের ব্যাখ্যা বা বিবরণ ছাড়াই. তাঁর মতে লোকে চাইছে জ্ঞান কোন রকমের মধ্যবর্তী ছাড়াই পেতে: আমাদের কাজ হল তাদের ভাল খবর দেওয়া, যাতে লোকে নিজেরাই তা নিয়ে ভেবে বিশ্লেষণ করে বুঝে নিতে পারে.

    বাল্টিক নিউজ সার্ভিস সংস্থার গ্রাহক দের মধ্যে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে কোম্পানী ও ব্যক্তিগত গ্রাহকের সংখ্যা এবং একই অনুপাতে কমে যাচ্ছে সংবাদ সংস্থা গুলি. সিগিতা কিরিলকা মনে করেন যে, বিতর্ক ও আলোচনার জায়গা হল সামাজিক অপেশাদার সাংবাদিকতার বিষয়, ব্লগ এর বিষয়.

    আব্রাম ক্লেত্সকিন সাংবাদিক দের মূল কাজ হিসাবে দেখেছেন বাস্তব তথ্যকে কাঠামো দেওয়া এবং তা বিশ্লেষণ করায়. তাঁর মতে পেশাদার সাংবাদিক আপাতঃ ভাবে কোন সংযোগ বিহীণ তথ্যের প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষকে দিক স্থির করতে সাহায্য করতে বাধ্য, তাঁর মতে যদি সাংবাদিকতা মানব সমাজকে কি মুখ্য বিষয় ও কি অগৌণ বিষয় তার মধ্যে পার্থক্য না করে দেয় তবে সেই সাংবাদিকতার কোন প্রয়োজন নেই.

বিভিন্ন ধরনের সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ে বিশেষ ভাবে প্রয়োজন গুণগত ভাবে উত্কৃষ্ট সাংবাদিকতার মনে করেছেন আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি ও এডগারস কোটস.

আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি বলেছেন যে, সাংবাদিকতা পেশার প্রতি আরও বেশী করে দাবী করা হয়েছে, কারণ বর্তমানে দর্শক (শ্রোতা, পাঠক)আগের চেয়ে আরও বেশী করে অধিকার রাখে কোন বিশেষ মাধ্যমের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার, কারণ নির্বাচন করার উপযুক্ত মাধ্যম অনেক আছে. প্রসঙ্গতঃ এই নির্বাচন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে এবং তথ্য পরিবহনের বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতির মধ্যেও রয়েছে.

রাদিক বাতীরশিন বলেছেন: বর্তমানে যদিও গ্রাহক সম্প্রদায় বিশেষজ্ঞদের মতে অনেকটাই সংরক্ষণ শীল. ট্র্যাডিশন মেনে আসা মাধ্যম এখনও পুরনো হয়ে যায় নি, খুব কম করে হলেও শতকরা পঞ্চাশ ভাগ তথ্যের গ্রাহক চান যে, তাঁদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া হোক, ইন্টারনেটে যেন নিজেকে খুঁজে নিতে না হয়.

    আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি আরও বড় সংখ্যার উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেছেন শতকরা ৮৫ ভাগ গ্রাহকই তথ্য প্রচারের পরিবেশে খুবই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে থাকেন, ইউরোপের মোট জন সংখ্যার মাত্র ১৫ থেকে ১৭ ভাগ শুধু সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কম বেশী সক্রিয় সম্পর্ক বজায় রাখে, কিন্তু মাধ্যম বাছাই করার বিষয়ে তা নির্ভর করে মাধ্যমের প্রচারিত বিষয়ের গুণগত উত্কর্ষ.    

আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কির কথা মতো সমস্ত ইন্টারনেট ও টেলি রেডিও সম্প্রচার কোম্পানীর শতকরা ৯০ ভাগ বিষয়ই হল তথাকথিত পরিবেশ সৃষ্টিকারী জঞ্জাল: তা তৈরী করে প্রায় সকলেই এবং বিভিন্ন কোম্পানীর মধ্যে তফাত খুব কমই. আর যাকে বলা যেতে পারে খুবই আলাদা এবং সৃষ্টি কৃত অংশ  - নিজেদের খবর, তথ্য, যা সেরা ভাষ্যকার বা পর্যবেক্ষকদের দিয়ে তৈরী করা হয়েছে, তা খুবই কম.

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতা অবশ্যই নির্ভর করা উচিত হবে প্রত্যেকের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষত্বের উপর অর্থাত প্রত্যেকের একটি আবশ্যিক তথাকথিত মেন্যু কার্ড থাকা দরকার, যেখানে আলাদা করে থাকবে, সাধারণত পরিবেশ তৈরী করার মাল মশলা কি রকম আছে এবং কতটা আছে নিজের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে কি তৈরী অবস্থায় আছে, তার উল্লেখ.

    রেডিও রাশিয়ার চেয়ারম্যান বলেছেন যে, সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন ভূমিকার কথা, যেমন, উত্পাদন, জোড়া লাগানো এবং পরিবেশনের ভূমিকা, তিনি বলেছেন, এটা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় বা ভূমিকা. সেই সময় চলে যাচ্ছে, যখন কোম্পানীরা যারা বিবিসি কোম্পানীর মতো, অর্থাত নিজেরাই সংবাদ তৈরী করে পরিবেশন করত, এখন সামাজিক সংবাদ মাধ্যম গুলির কাজ হল সংবাদ জোড়া লাগানো এবং তা পরিবেশন করা. মাধ্যমের কোম্পানীর কাজ হল খুব সহজ ও বিনামূল্যের পরিষেবার ব্যবস্থা করা, খুব সহজ খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা এবং অর্থ সাযুজ্য সমেত খবরের সমাহার তৈরী করা, যাতে খবর জোড়া লাগানো সহজ হয়.

    আব্রাম ক্লেত্সকিন এর মতে সংবাদের পরিবেশে জঞ্জালের অতিরিক্ত পরিমান বুঝিয়ে দেয় যে, সমাজের মত নিয়ে হেরফের করার সুবিধা তৈরী হয়েছে, এই ফাঁকা জায়গায় প্রচুর পরিমানে তথ্য দিয়ে ভর্তি করলেও দর্শকের, শ্রোতার বা পাঠকের তাতে জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়া হচ্ছে না, অথবা সমাজে বহমান গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া গুলি সম্বন্ধে সমাজের কোন লাভ জনক পরিচয় হচ্ছে না.

    ইউরিস পাইদেরস্ বলেছেন যে, বিষয়টা উল্টো, কারণ প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে গ্রাহকের জ্ঞান নিয়ে ছেলে খেলা করা আর বরং যাচ্ছে না, টেলিভিশনের দর্শক যে কোন সময় যে কোন হেরফের করার প্রচেষ্টা স্রেফ চ্যানেল পাল্টে ফেলে বাতিল করে দিতে পারে, তার সঙ্গে আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি একমত যে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সমাজের মত পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে. ব্লগ পরিবেশের বৃদ্ধির ফলে ইউরিস পাইদেরস্ মনে করেন যে, তথ্যের প্রচুর উত্স গ্রাহকের কাছে খুলে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত মাস মিডিয়া সাংবাদিকতার বিকল্প মডেল হতে পারে, যখন পাঠক এবং লেখকের মধ্যে ব্যবধান ঘুচে যাবে. এর ফলে কি পেশাদার সাংবাদিকতার জায়গায় জনতার সাংবাদিকতা আসবে না? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, তাঁর মতে এখন সেই দিকেই সব যাচ্ছে. কিন্তু ব্লগ পরিবেশের খুব দ্রুত বৃদ্ধি প্রচুর নৈতিক ও আর্থিক সমস্যা তৈরী করেছে, যা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা দরকার.  যেমন, যদি কোন কাগজ যদি বিজ্ঞাপনের অর্থে চলে তবে তার বিষয়টা পরিস্কার, কিন্তু ব্লগ লেখকের উপার্জনের বিষয়টি খুবই ধোঁয়াশা দিয়ে ভর্তি, খুবই খারাপ যখন বোঝা যায় না সাংবাদিককে কে অর্থ যোগাচ্ছে.

আন্দ্রেই বীস্ত্রিতস্কি নিজেও জনতার সাংবাদিক দের অর্থ উপার্জনের স্বচ্ছতার দিকটি দেখিয়ে বলেছেন যে, ব্লগ লেখক একজন লোক – যাঁর লেখা দিনে প্রায় এক লক্ষ লোক অবধি পড়ে থাকেন, সুতরাং তিনি সমাজের উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে থাকেন, এমন কি বহু সংবাদ পত্রের চেয়েও বেশী. সমাজের বর্তমানের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে সামাজিক সংবাদ মাধ্যম গুলিকে হতে হবে খুবই গুণগত ভাবে উন্নত সাংবাদিকতা দিয়ে ভরা, আর সেই ধরনের উন্নতির জন্য প্রয়োজন আবার অর্থের. আমাদের খুব সঠিক করে বুঝতে হবে পরবর্তী কালে যাকে সামাজিক সংবাদ মাধ্যম বলা হয়ে থাকে, তা কোথা থেকে অর্থ দিয়ে চালানো হবে, সামাজিক কোন ফান্ড থেকে না কি অন্য কোন ভাবে? কারণ খুব পরিস্কার করেই বুঝতে পারা যাচ্ছে, বিজ্ঞাপনের টাকার কেকের অসংখ্য টুকরো হচ্ছে, ট্র্যাডিশন অনুযায়ী চলা টেলিভিশন ও রেডিও থেকে তা ইন্টারনেটে চলে যাচ্ছে. সংবাদপত্র গুলিরও বিজ্ঞাপনের থেকে আয় কম হচ্ছে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় তাদের বৃদ্ধির জন্য, আর এই সবই হচ্ছে এমন এক পরিস্থিতিতে যখন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকার মধ্য ব্যবধান মুছে যাচ্ছে এবং গ্রাহকেরা অসংখ্য ছোট বিভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন. দেখা যাচ্ছে যে, সামাজিক সংবাদ মাধ্যমের সংরক্ষণ এবং তার প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের প্রশ্ন এখন সমাজের মূল্যবোধের প্রশ্নের অংশ.

একই রকমের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে আব্রাম ক্লেত্সকিন বলেছেন যে, সামাজিক সংবাদ মাধ্যমেরই উচিত গুণগত ভাবে উত্কৃষ্ট রাজনৈতিক এবং সামাজিক খবর দেওয়ার. সেই সব খবর. যা সব সময়ে খুব একটা বড় চাহিদার সম্মুখীন হয় না, কিন্তু যেগুলি ছাড়া দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয়, সেগুলি থাকা দরকার. তা না হলে সংবাদ মাধ্যমে শুধু পরনিন্দা ও পরচর্চাই করা হবে, আর যা প্রত্যেক নাগরিকের সমস্যা, যা সকলকে ছুঁয়ে যায়, তা  টেলিভিশনের প্রচারে বা রেডিওর প্রসারে কোন প্রতিবিম্ব তৈরী করতে পারবে না.