আলতাই অঞ্চলের কুরিয়া গ্রামে ১০ই নভেম্বর ১৯১৯ জন্ম নিয়েছিলেন মিখাইল কালাশনিকভ. সোভিয়েত দেশ ও রাশিয়ার গুলি ছোঁড়ার অস্ত্রের বিশ্ব বিখ্যাত নির্মাতা. তিনি অন্যতম যাঁকে রাশিয়ার বীর ও একসাথে দুবার সমাজতান্ত্রিক শ্রম বীর উপাধি দেওয়া হয়েছে. তাঁর শৈশব কেটেছে কৃষক পরিবারে. পরিবারের সতেরো নম্বর সন্তান, মোট ১৯ জনের মধ্যে মাত্র ৮ জনই পরে বড় হওয়া অবধি বেঁচে ছিলেন. ১৮ বছর বয়সে স্কুল পাশ করার পর কাজ না থাকায় কাজাখ স্থানে চলে গিয়েছিলেন রেল পথের কর্মী হিসেবে যোগ দিতে চলে গিয়েছিলেন. তার দুই বছর পরে উনি সেনা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ডাক পান এবং সেখানেই প্রথম ট্যাঙ্ক চালক মিখাইল কালাশনিকভ নিজের যন্ত্র সৃষ্টি করার ক্ষমতা দেখাতে পেরেছিলেন. তিনি প্রথম ট্যাঙ্ক থেকে গোলা নিক্ষেপের হিসাবের যন্ত্র আবিষ্কার করেন. এ ছাড়া টিটি পিস্তলের জন্য একটা যন্ত্র তৈরী করেন, যাতে গুলি করার ক্ষমতা বাড়ে. এই নতুন সৃষ্টি তখন কিয়েভ সেনাদলের প্রধান গিওর্গি জুকভের দৃষ্টি আকর্ষণ করে. তিনি নবীন স্রষ্টার সঙ্গে দেখা করেন ও তাঁকে একটি নামাঙ্কিত ঘড়ি উপহার দেন. তারপর তাঁকে মস্কো পাঠিয়ে দেওয়া হয় পরীক্ষা করে দেখার জন্য ও তা সফল হলে লেনিনগ্রাদের কারখানাতে পাঠানো হয়েছিল নতুন ধরনের অস্ত্রের শিল্পোত্পাদনের জন্য.      যখন মহান পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তখন মিখাইল কালাশনিকভ চলে যান যুদ্ধক্ষেত্রে. কিন্তু ব্রিয়ানস্কের কাছে ১৯৪১ এর অক্টোবর মাসে গুরুতর ভাবে আহত হন. হাসপাতালে থাকার সময় উনি অনেক সময় ভাবতেন কি করে সহজে ব্যবহার যোগ্য পিস্তল মেশিনগান তৈরী করা যায়. যুদ্ধ শুরুর সময় এই রকম কিছু একটার খুব দরকার ছিল. হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে মিখাইল কালাশনিকভ তাঁর নতুন অস্ত্রের জন্য প্রথমে অনেক ছবি এঁকে ছিলেন. কাজাখ স্থান ফিরে এসে সব চেয়ে আধুনিক মেশিনগানের একটা নমুনা তৈরী করে বিখ্যাত অস্ত্র বিজ্ঞানী ব্লাগোন্রাভভ কে দেখান, তিনি যদিও সব মিলিয়ে এই অস্ত্রের সম্বন্ধে নেতিবাচক রায়ই দিয়েছিলেন, তাও এই কাজে নূতনত্ব দেখতে পেয়ে আরও পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে দেন. পরে কালাশনিকভের মেশিনগান লাল ফৌজের প্রধান সাঁজোয়া অস্ত্র নির্মাণ দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল, সেখানেও বিশেষজ্ঞ দের রায় ছিল যে, যদিও কালাশনিকভের অস্ত্র হাল্কা, স্বল্প দৈর্ঘ্যের, একটি করেই গুলি ছোঁড়া যায় এবং যান্ত্রিক অনুষঙ্গ আধুনিক, তাও এই অস্ত্র নির্মাণে সময় বেশী লাগে ও তা কারিগর দের বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল. কিন্তু প্রায় সাত বছর কঠিন পরিশ্রম করার পর প্রথম এ কে ফরটি সেভেন তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল. ১৯৪৭ সালে এই রাইফেলের গঠন পরিকল্পনা শেষ হয় এবং প্রথমে ১৯৪৯ সালে ১৫০০ হাজার অস্ত্র দেশের সামরিক বাহিনীর হাতে আসে. সেন্ট পিটার্সবার্গের সামরিক যাদুঘরের অস্ত্র সংরক্ষণ ফান্ডের সংরক্ষক পিওতর গোরেগ্ল্যাদ বলেছেন: "বিগত ৬০ বছরে এই অস্ত্রের অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু মূল ধারণা একই আছে.    সবচেয়ে বড় বিষয় হল – অস্ত্রের দীর্ঘস্থায়ীত্ব এবং সৈনিকের জন্য সুবিধা. মিখাইল কালাশনিকভ তাঁর কাজের আগে এই দুটি বিষয় কেই মুখ্য বলে ধরেছিলেন. যাতে ব্যবহার কারীর কাছে এর কৌশল সবচেয়ে সহজ হয় এবং তৈরী করার সময়ও তা সহজে করা যায়. এই দুটি বিষয়ে মিলে তৈরী হয়েছে এমন রাইফেল যা বিশ্বের সমস্ত অস্ত্র প্রস্তুত কারক স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, আরও অন্ততঃ কুড়ি বছর এর সমকক্ষ কোন অস্ত্র তৈরী করা সম্ভব হবে না. অবশ্য অনেকেই ভাবেন যে এর আয়ু আরও ৫০ বছর, কারণ যে ধারণা থেকে এই রাইফেল মিখাইল কালাশনিকভ তৈরী করেছেন তা এখনও প্রয়োজন".    মিখাইল কালাশনিকভের রাইফেলের আধুনিক রূপ এ.কে.এম. অবশ্যই বিশ্বে সমাদৃত হয়েছে ন্যায্য কারণে. খুবই ভরসার যোগ্য, সোজা, লক্ষ্যে নিখুঁত এবং খুবই শক্তিশালী. যথেষ্ট কম জায়গা নেয় এবং ওজনও কম. এই রাইফেল জল, বরফ, বালি. ধুলো. কাদা কিছুকেই ভয় পায় না. সৈনিক সারা দিন জলার বুক জলে ডুবে, কাদা মেখে চলতে পারে, কিন্তু যখনই তার দরকার হয় তখনই এই রাইফেল তার শত্রুর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে. শুধুই তো আর এই রাইফেল দুনিয়ার বহু দেশে তৈরী হচ্ছে না. পিওতর গোরেগ্ল্যাদ বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমনকি এই রাইফেলের ফ্যান ক্লাবও আছে.    "এটা সারা পৃথিবীতে এখন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে এবং খুবই বিখ্যাত হয়েছে. তার মধ্যে এমন কোন মহাদেশই নেই যেখানে মিখাইল কালাশনিকভের রাইফেল ব্যবহার হয় না. আফ্রিকার কম করে হলেও তিনটি দেশের জাতীয় পতাকায় মিখাইল কালাশনিকভের এই রাইফেল প্রতীক হয়েছে. মোজাম্বিকের জাতীয় প্রতীকে এই রাইফেল খুবই চমত্কার ভাবে রয়েছে. এটাকেও রাইফেলের সৃষ্টি কর্তার প্রতি এক সম্মান প্রদর্শন ও স্মৃতি ফলক বলে ভাবা যেতে পারে".    মিখাইল কালাশনিকভের সংগ্রহে এই রাইফেলের আরও তিনটি বিভিন্ন গঠন আছে, এ ছাড়া তিনি শিকারের জন্য অস্ত্র বানিয়েছেন, এই অটোমেটিক রাইফেলের কাঠামোকে নির্ভর করে. পিওতর গোরেগ্ল্যাদ বলেছেনঃ    ""সাইগা" নামের স্টেনগান. এই রকম বড় ক্যালিবারের যেমন ১২ ক্যালিবারের অস্ত্র আছে বহু পুলিশ ও মিলিশিয়া দলের. বিদেশে এই অস্ত্রের উপর আগ্রহ বেড়েই চলেছে".    মিখাইল কালাশনিকভের নব্বইতম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এই যাদুঘরে তাঁর সম্বন্ধে নিবেদিত স্থায়ী সংগ্রহ "কালাশনিকভ – মানুষ, অস্ত্র ও রূপকথা" কে আরও বড় করা হয়েছে. আলতাই এর কুরিয়া গ্রামে, যেখানে কালাশনিকভ জন্মেছিলেন, সেখানেও একটি যাদুঘর খোলা হবে. তাঁর শৈশব যে বাড়ীতে কেটেছে ,সেই বাড়ীর জায়গায় একটি স্মৃতি স্তম্ভ তৈরী করে উদ্বোধন করা হচ্ছে.

    ১৯৯৯ সালে জেনেরাল লেফটেন্যান্ট উপাধিতে ভূষিত মিখাইল কালাশনিকভ তিনটি স্মৃতি কথা নিয়ে আত্ম জীবনীর বই লিখেছেন. "অস্ত্র তৈরী করা লোকের ডাইরি" (১৯৯২), "অন্যের উঠান থেকে বিখ্যাত স্পাসকি তোরণ অবধি" (১৯৯৭) এবং "আমি আপনাদের সঙ্গে একই রাস্তায় চলেছি" (১৯৯৯). উনি গান বাজনা ও কবিতা ভালবাসেন, নিজেও কবিতা লেখেন. বর্তমানে এই বিখ্যাত স্রষ্টা, প্রযুক্তি বিদ্যার ডক্টরেট, ষোলটি রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের বিজ্ঞান একাডেমীর সম্মানিত সদস্য ইঝেভস্ক রাশিয়ার শহরে থাকেন.

Slideshow: