৬৫ বছর আগে, ১৬ই এপ্রিল ১৯৪৫ সালে, সোভিয়েত সৈন্য বাহিনী স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণ শুরু করেছিল বার্লিন শহরের, মানব ইতিহাসের এইটি সবচেয়ে বড় যুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়. হিটলারের জার্মানীর রাজধানীর উপকন্ঠে এই যুদ্ধ চলেছিল ৮ই মার্চ অবধি. এই যুদ্ধে দুই পক্ষের প্রায় তিরিশ লক্ষেরও বেশী লোককে কাজে লাগানো হয়েছিল, ১১ হাজার প্লেন ও প্রায় ৮ হাজার ট্যাঙ্ক লেগেছিল.

    ভোর রাতে বিভিন্ন সিস্টেম ও ক্যালিবারের ৪০ হাজার কামান প্রতিপক্ষের সৈন্য বাহিনীর সামনের দিকে গোলা বর্ষণ শুরু করেছিল, প্রতিরোধ, সেনা বাহিনী, যুদ্ধাস্ত্র সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিতে চেয়ে. প্রথম গোলা বর্ষণের সাথে সাথেই বিমান বাহিনী উড়ে এসেছিল সাহায্যে, বিমান গুলি উড়ে গিয়েছিল যুদ্ধ ক্ষেত্রের উপর দিয়ে একের পর এক আছড়ে পড়া ঢেউ এর মতো.  প্রথম দিনেই সোভিয়েত বাহিনী আকাশে একাধিপত্য মূলক ক্ষমতা বিস্তার করেছিল. শুরু হওয়া কামানের গোলা বর্ষণের ৩০ মিনিট পরে, মূল আক্রমণের দিকে রাতের আকাশকে আলোময় করে তুলেছিল ১৪০ টি প্রোজেক্টরের আলো, যেগুলি প্রতি ২০০ মিটার তফাতে বসানো হয়েছিল. প্রতিদ্বন্দ্বী আলোর ঝলকানিতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল. এই আলোই ছিল পদাতিক বাহিনীর আক্রমণের সঙ্কেত. ফ্রন্টের প্রথম সারি থেকে হুররে বলে গর্জন করে বিশাল ট্যাঙ্ক বাহিনী সহ পদাতিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শত্রুর উপর. সোভিয়েত বাহিনীর আক্রমণে কেঁপে উঠেছিল শত্রু.

    এই আক্রমণ সারা দিন রাত ধরে চলেছিল, দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা বলয়ে যা ওডার নদীর উপত্যকায় জেলভ হাইটস এর উপর তৈরী করা হয়েছিল, সেখানে এক কঠিনতম যুদ্ধ হয়েছিল. ফ্যাসিস্ট বাহিনী ধরে নিয়েছিল যে, এই জায়গা বার্লিন শহরের প্রতিরক্ষার জন্য এক শক্ত দুর্গ হবে, সোভিয়েত বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি এই জায়গা দখল করে নিয়েছিল. তৃতীয় রেইখ এর রাজধানীর রাস্তা খুলে গিয়েছিল.

    সোভিয়েত বাহিনীর সঙ্গে বার্লিন দখলের যুদ্ধে পোলিশ বাহিনী অংশ গ্রহণ করেছিল. কিন্তু আজ অবধি ঐতিহাসিকরা কিছুতেই এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পান নি, কেন বার্লিন দখল করার লড়াই তে সোভিয়েত দেশের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সহযোগী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের সেনা বাহিনী যোগ দেয় নি. বিখ্যাত ব্রিটেনের গবেষক জন ফুলার সম্মিলিত বাহিনীর কম্যাণ্ডার আইসেনহাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার তার নাম দিয়েছেন যুদ্ধের ইতিহাসে এক সবচেয়ে অদ্ভুত সিদ্ধান্ত.

    এটা কোন গোপন কথা নয় যে, ব্রিটেনের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ১লা এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টের উদ্দেশ্যে করা এক প্রশ্নে বলেছিলেন যে, সোভিয়েত লাল ফৌজ বাহিনীর আগে বার্লিন দখল করা সম্মিলিত বাহিনীর উচিত্ হবে কি না. তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, হিটলারের জার্মানীর রাজধানী দখল করার উপর যুদ্ধ পরবর্তী কালের শুধুমাত্র ইউরোপই নয়, সারা বিশ্বের ব্যবস্থা তৈরীতে প্রভাব পড়বে.

    যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু আগেই চার্চিল পরিকল্পনা করে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক ব্লক তৈরী করার, যা বিশ্বে সোভিয়েত প্রভাব বাড়া থেকে রক্ষা করবে, এমন কি লাল ফৌজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে. অবশ্যই চার্চিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থের কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু সার্বিক জোটের স্বার্থে বোধহয় তাঁর উচিত্ ছিল নিজের দেশের সমাজের স্বর খেয়াল করার, অন্ততঃ সেই রকম মনে করে মস্কোর জাতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের প্রফেসর, ইতিহাসে ডক্টরেট মিখাইল মিয়াগকোভ বলেছেন:

    "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও গ্রেট ব্রিটেনে যুদ্ধ পরবর্তী কালে সোভিয়েত দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব মূলক সম্পর্ক করার জন্য শতকরা ৭৫ ভাগ লোক চেয়েছিল. এই সব দেশের বেশীর ভাগ লোকই মনে করত যে এই যুদ্ধে বিজয়ের জন্য নির্নায়ক কাজ করেছিল সোভিয়েত দেশই. দুঃখের কথা হল আজ লোকে তা ভুলে গিয়েছে".

    রুজভেল্ট চার্চিলের মত করে ভাবতেন না, তিনি মনে করেছিলেন যে, যুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত দেশ যে রকমের বড় শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে, সেই রকমের বড় শক্তি ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলবে না, তাই মিখাইল মিয়াগকোভ বলেছেন:

    "কিন্তু তিনি চান নি স্তালিনের সঙ্গে তার যথেষ্ট উষ্ণ সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত প্রভাব, যা এই যুদ্ধের বছর গুলিতে তৈরী হয়েছে, তা হারাতে".

    ১৯৪৫ সালের ২৫শে এপ্রিল লাল ফৌজের সাথে সম্মিলিত বাহিনীর সেই বিখ্যাত এলব নদীর তীরের সাক্ষাত্কার হয়েছিল. এই নদীর তীরে পৌঁছনো এবং সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে লাল ফৌজের মিলন সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল. এই কাজ করতে পারা মানে হল, হিটলারের সরকারের সমস্ত পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেওয়া, যেখানে তারা ভেবেছিল যে, যুদ্ধ শেষ হওয়া দেরী করিয়ে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে আলাদা করে শান্তি চুক্তি করে ফেলবে. পরে মার্কিন সেনা বাহিনীর ভেটেরান যোদ্ধারা মনে করেছেন, যে এলব নদীর ধারের সেই মিলন ছিল খুবই আনন্দের, লাল ফৌজের সেনারা তাদের মার্কিন যুদ্ধের কমরেড দের প্রচুর ভোদকা খাইয়েছিল.

    ৩০ শে এপ্রিল থেকে পয়লা মে র রাতে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনের রেইখস্ট্যাগের উপর বিজয়ের লাল পতাকা তুলেছিল. ফ্যাসিস্ট জার্মানীর সম্পূর্ণ পতন ও আত্ম সমর্পণের তখন আর মাত্র কয়েকটা হাতে গোনা দিন বাকী ছিল. বার্লিন দখলের মেডেল দেওয়া হয়েছিল ১০ লক্ষেরও বেশী সৈনিক কে, আর ৬০০ জনেরও বেশী যোদ্ধা পেয়েছিলেন বীরের স্বর্ণ পদক.