লিপেত্স্ক, ভরোনেঝ, রিজান, বেলগোরদ – সব কটা কেন্দ্রীয় বড় শহরকেই এবারে প্রথম আন্তর্জাতিক চেখভ উত্সবের আওতায় আনা হয়েছে. সাধারণত গরম কালে এই উত্সব মস্কোতে শুধু হয়ে থাকে. কিন্তু এই বছর সব অন্যরকম, এই বছর মহান রুশী লেখক ও নাট্যকার আন্তন পাভলোভিচ চেখভের জন্মের ১৫০ তম জয়ন্তীর বছর. তাই এই বছরে মঞ্চের নাম করা শিল্পীরা দেশের আঞ্চলিক শহর গুলিতে ৯ই এপ্রিল থেকে ৫ই জুন চেখভের নাটক গুলি মঞ্চস্থ করবেন.

    শুধু দুটি নাম করাই যথেষ্ট মনে হয়: ডেক্লান ডন্নেল্লান – বিখ্যাত ব্রিটিশ পরিচালক, যিনি তাঁর নিজের মতন করে শেক্সপিয়রের "দ্বাদশ রজনী" পরিচালনা করবেন এবং সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত পরিচালক ও ক্লাউন দানিয়েলে ফিনতসি পাস্কা, যিনি জয়ন্তী উপলক্ষে চেখভকে উদ্দেশ্য করে লেখা নাটক "দোনকা" তে চেখভকেই প্রধান চরিত্র বলে দেখিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতে চলেছেন. এই নাটক নিয়ে কাজ করার আগে পরিচালক চেখভের জন্মস্থানে তাগানরোগ শহরে গিয়েছিলেন, যেখানে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে. সেখানে গিয়ে তাঁর চিঠি পত্র খুঁটিয়ে দেখে এক কৌতুকে ভরা এবং কবিত্ব ময় নাটক ভেবে বার করেছেন, নাম দিয়েছেন বিশেষ ধরনের ভার দেওয়া ছিপের, দোনকা – চেখভ এই ধরনের ছিপ দিয়েই মাছ ধরতে ভালবাসতেন. একটা অসাধারন নাটক তৈরী হয়েছে – কিছুটা চেখভের ডায়েরির পাতায় নাটকের সম্বন্ধে প্রাক্ ধারণা লেখা যেন. সেখানে অনেক সঙ্গীত আছে, নৃত্য ভঙ্গী আছে, সার্কাসের কৌশল আছে, আর সবটা তৈরী করা হয়েছে এক অন্তর্নিহিত মিলকে লক্ষ্য করে. যেমন, বরফ দিয়ে তৈরী ভঙ্গুর সব জিনিস ট্র্যাজিক ভাবে গলে যাচ্ছে, আর চেখভের নাটকের চরিত্ররা সব হাওয়ায় ভাসছে…

    লুগানো শহরের অসাধারন নাটক সার্কাসের দল এই রাশিয়ার নানা শহরে মঞ্চ উপস্থাপনার প্রস্তাব উত্সাহের সঙ্গেই নিয়েছে. অভিনেতা অভিনেত্রীরা দেশের লোকেদের জীবন ধারা, রাশিয়ার মফঃসল শহরের দিন পাত, এমন কি তাদের কথা মতো, স্থানীয় রান্নার বৈচিত্র নিয়ে জানতে খুবই আগ্রহী. কারণ এই সব থেকেই চেখভের চরিত্রদের পৃথিবী, যা তারা আজ চেষ্টা করবে দোনকা নাটকে আবার করে তৈরী করার. এই থিয়েটারের প্রতিনিধি আন্তোনিও ভের্গামিনি বিশ্বাস করেন যে, ভাষার অন্তরায় হবে না, কারণ সব শিল্পীরা তাদের রোল শিখছেন রুশী ভাষায়.

    আন্তোনিও ভের্গামিনি বলছেন: "অবশ্যই মস্কো, নিউইয়র্ক, প্যারিসে নাটক দেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমরা খুবই আনন্দের সঙ্গে আমাদের অচেনা সব শহরে যাবো. যখন আমাদের বলা হয়েছিল মস্কো থেকে এই নাটক নিয়ে যেতে, তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গেই বলেছি "হ্যাঁ"! আমরা খুশী কারণ দোনকা রাশিয়ার অন্যন্য শহরেও দেখানো হবে. শীতে আমরা মস্কো শহরে এই নাটক রাশিয়ার সাব টাইটেল দিয়ে করে দেখিয়েছি, আর এখন শিল্পীরা রুশী ভাষায় শিখছেন. এই নাটক নিয়ে বলতে গিয়ে থিয়েটারের ডিরেক্টর বলেছেন যে, দানিয়েলে ফিনতসি পাস্কা চেখভের বিষয়ে খুব অভিজ্ঞ নন. পরিচালক প্রথমে খুঁজেছেন মানুষ চেখভের বিশেষত্ব, তার পৃথিবীর চেনা জিনিসের, ঘটনার. তিনি চেখভকে দেখেছেন একটা বড় গাছের মত, যা বাড়ে, ফল দেয়, যে ফলের বীজ সারা বিশ্বে উড়ে যায়. যেন তাঁর রচনার ছেঁড়া পাতাগুলি..".

    রাশিয়ার সব মফঃসল শহরে এই রকম একেবারে বাস্তব পশ্চিম ইউরোপের নাটক দেখার সুযোগ, সেই সব লোক, যাঁদের খুব একটা ভাল উপস্থাপনা দেখার সম্ভাবনা কম, তাঁদের জুটেছে মিখাইল প্রোখরভের ফাণ্ডের পক্ষ থেকে টাকা পয়সার দিকটা দেখায়. রাশিয়ার বিলিয়ন ডলারের মালিক মিখাইল প্রোখরভের ফাণ্ডের এই রকম বেশ কয়েকটা বড় প্রকল্প হাতে আছে, যা সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে সহায়তা করছে – তার মধ্যে উরাল, সাইবেরিয়া, সুদূর পূর্ব্বে সাহিত্য ও থিয়েটার উত্সব. "বিগত দুই তিন বছরে মস্কো থেকে মফঃসল অঞ্চলে সংস্কৃতি বিস্তার আমাদের প্রধান কাজ হয়েছে", বলেছেন ফাণ্ডের আরও একজন তৈরী করার মালিক ইরিনা প্রোখরভা.

    "আমাদের অনেক গুলি মিথ্যা ধারণা তৈরী হয়েছে, যে আমাদের সমাজে সব কিছুই খারাপ হয়ে গেছে. শুধু যে কোন একটা আগ্রহ জনক সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া চালু হলেই দেখতে পাই, সমস্ত কিছুই মূল্যবোধ সহ বেঁচে আছে, লোকে উপচে পড়া ভীড় করে বই মেলায় ভাল বই এর খোঁজে আসছেন, থিয়েটারে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে ভাল নাটকের টিকিট কিনছেন. সমস্ত সমস্যার কোনটাই সমাজে নেই, আছে সাংস্কৃতিক জীবনের কাঠামো পুনর্বিন্যাসে. সব কিছুর উর্দ্ধে আমাদের বুদ্ধিজীবি সমাজের স্তর বিরাট এবং এই সব লোকেরা গুণ মান সম্পন্ন তথ্য আশা করেন. সাধারন জনগণ আমাদের সবাই খুব ভাল, খুব সহজেই নতুন ধারণা ও কল্পনাকে গ্রহণ করতে পারেন, এই জিনিসটা আমরা বহু শহরে অনেক বার পরীক্ষা করে দেখেছি. আর খুব সুন্দর ভাবে দ্রুত শিখতেও পারেন".

    চেখভের চরিত্ররা কতবার মফঃসল শহরে থেকে রাজধানীর উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক জীবনের কথা ভেবে কষ্ট পেয়েছেন, ভোলা যায় না এমন মহান শিল্পের ছোঁয়া পেতে চেয়ে অধীর হয়েছেন. আজ যদি তাঁরা বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়ত মস্কো যাওয়ার জন্য এত উদগ্রীব হতেন না…