রাশিয়ার চিত্র পরিচালক আলেকজান্ডার কোত ব্রেস্ট এর কেল্লা নামে যে নতুন সিনেমাটি তুলেছেন সেই টির প্রথম প্রদর্শনের জায়গাও ঠিক করা হয়েছে সেখানেই, যেখানের ঘটনা এই সিনেমাতে নতুন করে তৈরী করে দেখানো হয়েছে. সময় ও দিন ও ঠিক করা হয়েছে প্রথম প্রদর্শনীর – ২২শে জুন ২০১০ সাল ভোর চারটে. ১৯৪১ সালের এই দিন টিতেই হিটলারের সেনা বাহিনী বিনা যুদ্ধ ঘোষণায় সোভিয়েত দেশের উপর হামলা করেছিল. ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের প্রথম ধাক্কা যে সব জায়গায় নেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি ব্রেস্ট শহরের কেল্লা – উনিশ শতকের এই কেল্লা দেশের পশ্চিমের একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ ছিল.

    হিটলারের লোকেদের কোন সন্দেহই ছিল না যে, ২২শে জুন দুপুর বেলার মধ্যেই তাদের দখলে এই দুর্গ চলে আসবে, কারণ এখানে সৈন্য ছিল আট হাজার আর ছিল তাদের পরিবারের মহিলা ও শিশুরা. তাদের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল আকাশ পথে বোমারু বিমান ও স্থল পথে ট্যাঙ্ক ও আরও নানা ধরনের সাঁজোয়া গাড়ী, কামান সমেত প্রায় সতেরো হাজার সশস্ত্র সেনা… লাল ফৌজের সেনারা তখন ক্রমাগত বোমা ও গোলা বর্ষণের মধ্যে দিনে আট বারের বেশী আক্রমণ প্রতিহত করেছিল প্রতি দিন. তাদের সমস্ত ভাণ্ডার, গোলা বারুদ, থাকার ঘর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাবার, জলের ট্যাঙ্ক সমস্ত কিছু জ্বালিয়ে দিয়েছিল ফ্যাসিস্টরা, তবুও প্রতিরোধ চলেছিল, এমন কি যখন হিটলারের বাহিনী সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেওয়া এলাকার দখল নিতে পেরেছিল, তখনও. যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই কেল্লার মাটির তলায় সোভিয়েত সৈন্যরা পাথরের গায়ে আঁচড়ের সাহায্যে লেখা দেয়াল লিখন পড়তে পেরেছিল – "মরছি তবু ধরা দেব না" – এই কথার তলায় লেখা ছিল তারিখঃ ২০ শে জুলাই (!) ১৯৪১ সাল.

    আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া ৩৭ বছরের চিত্র পরিচালক আলেকজান্ডার কোত এই ভয়ঙ্কর ঐতিহাসিক প্রতিরোধের ঘটনার পুনর্নির্মাণ করেছেন. প্রসঙ্গতঃ ব্রেস্ট এর কেল্লা এই পরিচালকের প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপর তোলা ছবি নয়, তিনি এর আগে তুলেছিলেন ২০০৪ সালে কনভয় PQ — 17  - সেই সব জাহাজের দুর্গতি নিয়ে, যেগুলি গ্রেট ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ল্যান্ড লীজ করে নিয়ে আসা মালপত্র সোভিয়েত দেশে নিয়ে আসতে চেয়েছিল. রেডিও রাশিয়ার সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে আলেকজান্ডার কোত নিজের নতুন সিনেমা নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন.

-    আলেকজান্ডার যখন আপনি এই সিনেমা তোলার জন্য ব্রেস্ট এর দুর্গ দেখতে গিয়েছিলেন, যেখানে এই সিনেমা পরে তোলা হয়েছে, তখন আপনার কি মনে হয়েছিল? আলেকজান্ডার কোত বলেছেন:

-    আমরা যুদ্ধের জায়গা গুলি ঘুরে দেখেছি, মাটির নীচে নেমেছি. আর সেই সব স্মৃতির সম্বন্ধে শান্ত ভাবে বলা সম্ভব নয়. সেখানে এমন সব মাটির নীচের জায়গা রয়েছে, যেখানে প্রকৃত অর্থেই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে, পাথর ও মাটি আগুনে পুড়ে, গলে গিয়ে অঙ্গার হয়ে গেছে. দেয়ালে লেখা মরছি তবু ধরা দেব না, জন্মভূমি বিদায় এই সব লেখা এখনও দেখা যায়. এমন সব জায়গা রয়েছে, যেখানে যুদ্ধের সময় থেকে কিছুই প্রায় বদলায় নি. মনে হয় ভীষণ যুদ্ধ যেন এই মাত্র শেষ হয়েছে… এই সবই একেবারে নাড়িয়ে দেয়. আর তার এর পরে যখন সেই সব লোক যাঁরা এখানে যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের সম্বন্ধে আরও জানা যায়, তখন আপনা হতেই নিজের কাছে প্রশ্ন আসে: আমি কি এই রকম পারতাম?

-    সত্যই ব্রেস্ট এর কেল্লা যাঁরা রক্ষা করেছিলেন, তারা তাঁদের বীরত্ব ও সংহত রূপ দেখিয়ে ফ্যাসিস্ট সৈন্য দেরও অবাক করে দিয়েছিলেন, যারা সোভিয়েত দেশে আক্রমণের আগে পথে এত প্রবল প্রতিরোধের মুখে কখনও পড়ে নি. বোঝাই যায়, যে এই ব্রেস্ট এর দুর্গের কাছেই কিছু ফ্যাসিস্টের মাথায় ঢুকেছিল যে, রাশিয়ার বুকে হাল্কা ভাবে ঘোরা ফেরা করা সম্ভব হবে না. এই ধারণা কি আপনার সিনেমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

-    আমার জন্য এটা প্রাথমিক ভাবে যুদ্ধের শুরুর দিকের ইতিহাস. কারণ সেখানেই প্রথম তিন চার দিনের যুদ্ধে সমস্ত কিছুই সব চেয়ে উজ্জ্বল ভাবে ধরা পড়েছিল, অনিয়ম, আতঙ্কের মধ্য দিয়ে শক্তি সঞ্চয় ও আত্ম সম্মানের পুনরুদ্ধার. এই সিনেমাতে খুব কমই কথা আছে, এটা মানুষের জীবনের সেই বিশেষ মুহূর্তের বর্ণনা, যখন তাকে নিজের জন্য কেন একটা দিক বেছে নিতে হয়. সেখানে ভীরু লোকের কথাও রয়েছে, যাদের ট্র্যাজেডি বাধ্য করেছে সাহসী আর শক্তিশালী হতে. দুঃখের কথা হলেও সেখানেও বিশ্বাস ঘাতক চরিত্র রয়েছে. প্রসঙ্গতঃ এই ছবিতে কোন বানানো চরিত্র নেই. এঁরা সবাই বাস্তবের চরিত্র, যাঁরা ১৯৪১ সালে আগ্রাসনের সময়ে শত্রু সোনা বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন.

-    আলেকজান্ডার, আপনার সিনেমাকে ঘোষণা করা হয়েছে যে একেবারে নিখুঁত পুনর্নির্মাণ, ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে তৈরী, মহাফেজ খানার জমিয়ে রাখা লেখা ও যাঁরা এই ঘটনার সাক্ষী তাঁদের বিবরণে রচিত. আর সিনেমাও আপনি কি তুলেছেন সেই জায়গাতেই, ব্রেস্ট এর কেল্লাতেই?

-    এই স্মৃতি বিজড়িত জায়গা আজ যাদুঘর, অর্থাত্ এর ভিতরে সিনেমা তোলার উপায় নেই. যুদ্ধের পরে এখানে কোন গোটা বাড়ী ঘর আর নেই – সমস্ত ধ্বংস স্তূপ হয়ে গেছে, আর আমাদের তুলতে হয়েছে সুরক্ষিত কেল্লা আর যুদ্ধের আগের ছবি. তাই আমাদের যথেষ্ট বড় করে সেট তৈরী করতে হয়েছে এই ব্রেস্ট এর কেল্লার মধ্যেই. ছবি তোলার সময়ে আমরা এই সেট ধ্বংস করেছি. অবশ্যই এটা আধুনিক সিনেমা, এখানে অনেক প্রযুক্তি, আধুনিক কম্পিউটারের গ্রাফিক্স, নতুন ধরনের বাজী সবই ব্যবহার করতে হয়েছে. কিন্তু এই সব কোন বাহ্যিক আড়ম্বরের জন্য করা হয় নি. আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল – আমার নিজের এই যুদ্ধের প্রতি কি ধারণা তার প্রকাশ. যাতে দর্শক দেখতে গিয়ে ভাবে – আমি এই পরিস্থিতিতে কি করতাম? আর এই ধরনের সিনেমা তোলার কি দরকার? মনে রাখার জন্য আর যেন কোন দিনও এমন যুদ্ধ আমাদের জীবনে না আসে – শুধু এই কারণেই এই সিনেমার প্রয়োজন আছে.