এই বছর ইরান থেকে দক্ষিণ এশিয়া অবধি গ্যাস সরবরাহের ধারণার উত্পত্তি হওয়ার তিরিশ বছর হল. আর তা এখনও তৈরী হতে পারেনি কেন, তার কারণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কোন, অর্থনৈতিক, বিনিয়োগ বা প্রযুক্তিগত নয়.

    বিষয়টি বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

    যদি শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রকল্পটি সমস্ত আগ্রহী পক্ষ চিন্তা করত, তবে সন্দেহ নেই যে, এতদিনে তা নিশ্চয়ই তৈরী হয়ে যেত. কারণ প্রকল্পটি সস্তা ও নিরাপদ, কারণ আফগানিস্থান হয়ে পাইপ লাইন যাবে. কিন্তু আসল ব্যাপার হল এখানে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে. এমন কি আজও, যখন এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্য সব তৈরী, তখন ওয়াশিংটনের রাজনীতিবিদেরা চাইছেন তা না হতে দিতে. প্রসঙ্গতঃ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরান বিশাল দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে জ্বালানী সরবরাহের কাজে লাগতে পারত. পাকিস্থান শুধু নিজের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসই পেত না, এমনকি দেশের মধ্যে দিয়ে ভারতে পাইপ লাইন যাবার সুযোগ করে দিয়ে আলাদা করে ভাড়া হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত. ভারতের জন্য গ্যাসের পাইপ লাইন শুধু প্রয়োজনীয় গ্যাস এনে দিত না, বরং জ্বালানী সরবরাহের বিষয়ে আরও নিরাপত্তা দিতে পারত.

    তা স্বত্ত্বেও, ওয়াশিংটন ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে, আরও সমস্ত কিছুই করছে যাতে ভারত ও পাকিস্থান এই প্রকল্পে যোগ না দেয়. এমন কি ওয়াশিংটন এটিকে কোন ভাবে গোপন করতেও চাইছে না. এক উচ্চপদস্থ আমেরিকার কূটনীতিবিদ, পররাষ্ট্র সচিবের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী রবার্ট ব্লেক বলেছেন যে, ওয়াশিংটন তার সমস্ত পাকিস্থানের প্রশাসনের বন্ধু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আহ্বান করেছে যে, তারা যেন এই গ্যাস পাইপ লাইনের একটি ব্যতিক্রম খুঁজে বার করে. তা স্বত্ত্বেও ইসলামাবাদ এই প্রকল্প থেকে সরে আসে নি. গত মাসে ইরান ও পাকিস্থান এই মর্মে একটি চুক্তি সই করেছে.

    ভারতের এই গ্যাস পাইপ লাইনে যোগ দান বন্ধ করার কথা বলেছেন দিল্লী সফরের সময় হিলারি ক্লিন্টন. ওয়াশিংটন এমন কি এই কারণে নিজেদের পক্ষ থেকে ভারতের উপর থেকে পারমানবিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তার বদলে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, এক নীতির ব্যতিক্রমী কাজ করে দেখিয়েছে.

    কিন্তু ভারতও এই প্রকল্প থেকে সরে যেতে চায় নি. এই বিষয়ে রাশিয়ার বিজ্ঞানী ও ভারত বিশেষজ্ঞ গেন্নাদি চুরফিন মন্তব্য করে বলেছেনঃ

    ভারত মার্কিন সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পারমানবিক প্রযুক্তি ও শক্তি সংক্রান্ত চুক্তি একটি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় পদক্ষেপ. তার ফলে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে অন্য স্তরে. কিন্তু আমি মনে করি যে, ভারত নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান সম্বন্ধে যথেষ্ট যত্ন বান এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থকেই আগে প্রাধান্য দেয়. ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক – রাজনৈতিক সহযোগী দেশ হয় নি. সেখানে নিরপেক্ষ রাজনীতিকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়ে তাকে, যার জন্য দেশ আজ এত উন্নতি করতে পেরেছে এবং স্বাধীন ভাবে এত দিন পর্যন্ত প্রচুর সমস্যা স্বত্ত্বেও অগ্রগতি করতে পেরেছে.এই রকমই ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ে এবং এখনও তাই হয়ে চলেছে.

    গত কয়েকদিন আগে ভারতের খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী মুরলী দেওরা প্রস্তাব করেছেন মে মাসে পাকিস্থান ও ইরানের সঙ্গে এই গ্যাস পাইপ লাইন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার. আর ভারতের প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া পাকিস্থানের এই মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ চৌধুরী এজাজ এর বক্তব্য উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, পাকিস্থান তার দেশের মধ্য দিয়ে মৈত্রী গ্যাস পাইপ লাইনের নিরাপত্তা নিয়ে গ্যারান্টি দিতে তৈরী. যদিও তা দেশের বিদ্রোহী অধ্যুষিত অঞ্চল দিয়ে পাতা হবে.

    রাশিয়া এই প্রকল্পে নিজেদের অংশ গ্রহণের সম্ভাবনা অস্বীকার করে নি. রাশিয়ার গাজপ্রমের একটি কোম্পানী এই প্রকল্পের জন্য প্রযোজনীয় প্রযুক্তি ও দ্রব্য সরবরাহ করতে পারে এবং তার প্রয়োজনীয়তা যে আছে, তা সমর্থন করে বক্তব্য রেখেছেন ইরানের উপ খনিজ তৈল মন্ত্রী নগরেকার শিরাজী. মস্কো তে মনে করা হয়েছে যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হলে, দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানীর চাহিদা কমবে এবং ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যে সম্পর্ক ভাল হতে পারে ও এই অঞ্চলে উত্তেজনার প্রশমণ হতে পারে.