মস্কো পলিটেকনিক্যাল মিউজিয়াম মহান পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ বিজয়ের ৬৫ বছর উপলক্ষে তৈরী হচ্ছে. এপ্রিল মাসে বিশ্বের একটি অন্যতম প্রাচীন টেকনিক্যাল মিউজিয়াম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন "যুদ্ধের জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি" নাম দিয়ে আয়োজন করেছে. মে মাসে "বৈজ্ঞানিক অস্ত্রের জয়" নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে. "আমরা চাই প্রদর্শনী দেখতে আসা লোকেরা শুধু মাত্র যুদ্ধ ক্ষেত্র, সৈন্যদের বীরত্ব বা সেনাপতি দের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ফসল হিসাবেই এই যুদ্ধকে যেন না দেখেন. আমরা চাইব যাতে দর্শকেরা আমাদের দেশের নাগরিক দের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি প্রকৌশলের বিষয়ে বিজয়ের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারেন, যা আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রভূত সাহায্য করেছে", বলেছেন পলিটেকনিক্যাল মিউজিয়ামের জেনেরাল ডিরেক্টর প্রফেসর গুরেন গ্রিগোরিয়ান. "রেডিও রাশিয়া"কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি তাঁর যুদ্ধের স্মৃতি ভাগ করেছেন.

    ১৯৩৬ সালে বাকু শহরে এক তৈল ক্ষেত্রের ইঞ্জিনিয়ার ও অপেরা গায়িকার পরিবারে গুরেন গ্রিগোরিয়ান জন্মেছিলেন. গুরেন গ্রিগোরিয়ান বলেছেনঃ

"আমার চার বছরের একটু বেশী বয়সে সপরিবারে আমরা মস্কো চলে আসি, এখানেই যুদ্ধ আমাদের কাছে পৌঁছেছিল. আমার খুব ভাল করেই মনে পড়ে, কি করে বাবাকে ফ্রন্টে বিদায় দেওয়া হয়েছিল. আমি মনে করতে পারি, কি করে আমাদের মস্কো থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল. আমরা একটা স্টীমারে করে গিয়েছিলাম. আমদের স্টীমারের উপর ফ্যাসিস্ট যুদ্ধ বিমান হানা দিয়েছিল, আর ক্যাপ্টেন খুবই কায়দা করে আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে ছিলেন, কখনও ছায়া ঢাকা জায়গায় লুকিয়ে থেকে, কখনও কোন বাঁকের গাছের আড়ালে লুকিয়ে. আমার ৪৩ সালের প্রথম জয়ের স্যালুট মনে পড়ে, এই সবই স্মৃতি হিসাবে রয়ে গেছে. আমার আরও মনে পড়ে রাস্তায় সব বাচ্চা ছেলেরা খেলতে গিয়ে কোন সামরিক পোষাক পরা লোক দেখতে পেলেই তার কাছে গিয়ে কি ভাবে প্রশ্ন করতাম যে, কবে যুদ্ধ শেষ হবে. আমাদের কাছে সব সময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই প্রশ্নটা, কারণ সকলেই এটা জানতে চাইতাম. আমি আরও মনে করতে পারি যুদ্ধ জয়ের দিন মস্কো শহরে কি রকম উত্সব হয়েছিল. আর যুদ্ধের শেষে ৪৭ – ৪৮ সালে, যখন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ভয় পেয়ে জেগে উঠত এই ভেবে যে, আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে…"

আজ শুধু রাশিয়ার নয়, বিশ্বের একটি বৃহত্তম বিজ্ঞান- প্রযুক্তি যাদুঘরের প্রধান গুরেন গ্রিগোরিয়ান আরও একটি কৌতূহল জাগানো তথ্যের কথা মনে করতে পারেন. শৈশবে তাঁরও আরও অনেক বাচ্চা ছেলের মত জমানোর আগ্রহ ছিল. বাচ্চারা সাধারণত স্ট্যাম্প, চকোলেটের মোড়ক এই সব আরও নানা রকমের অকাজের জিনিস জমিয়ে থাকে, যুদ্ধ অবশ্যই তার প্রভাব ফেলেছিল বাচ্চাদের উপরে. গুরেন গ্রিগোরিয়ান বলেছেনঃ

"আমার খুব মন খারাপ হয় ভাবলে যে, আমি আমার জমানো জিনিস বড় হয়ে রাখার ব্যাপারে যত্ন নিই নি. আর সব মস্কোর বাচ্চা ছেলেদের মতই আমারও দুটো জমানো সংগ্রহ ছিল. প্রথমটা রাত্রি বেলা বোমা পড়ার পর ভোরের বেলা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা ফাটা বোমার টুকরো. দ্বিতীয়টা রঙীণ বেলুনের. সেগুলি ছিল তিন রঙের লাল, হলুদ, সবুজ. এই গুলি দিয়ে সঙ্কেত রকেটের রং জানানো হত আর স্যালুট দেওয়ার জন্য ব্যবহার হত. এই গোল বেলুন গুলো মাটিতে পড়ে থাকত, যেমন বোমার ফাটা টুকরো গুলো সেই রকমই. আমরা সেগুলি জমাতাম. আর তাই আমার ছিল দুটো সংগ্রহ, এখন বুঝতে পারি খুবই নানা রকমের অর্থ বহ সংগ্রহ".

গুরেন গ্রিগোরিয়ান উল্লেখ করেছেন, যে প্রতি বার, যখন বিজয় দিবস উত্সবের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তাঁর একটা অনুভূতি ফিরে আসে যে, আমাদের দেশের এই বিরাট ও জটিল ঐতিহাসিক সময়ের সঠিক মূল্যায়ণ এখনও ঠিক করে করা হয়ে ওঠে নি ও তা ভাল করে বোঝা হয় নি. পলিটেকনিক্যাল মিউজিয়াম তিন দিনের যে সম্মেলনের আয়োজন করেছে, তাতে সেই চেষ্টাই করা হবে, যাতে বিশ্ব যুদ্ধের ইতিহাসের এই খণ্ড সময়ে সোভিয়েত দেশের নাগরিকদের ভূমিকা ও তার স্মৃতির একটা মূল্যায়নের প্রচেষ্টায় নিজেদের থেকে কিছু করা হয়. এই প্রদর্শনীর দর্শকেরা জানতে পারবেন, কি করে দেশের পশ্চিম থেকে এক অনন্য উপায়ে দেশের সমস্ত বড় কল কারখানা পূর্ব্ব দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই সব জেল খানা ল্যাবরেটরী যাদের লোকে "শারাশকি" বলে চিনত, সেখানে কি করে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী আর প্রকৌশল বিদেরা কাজ করতেন. এক বিশেষ অংশে দেখানো হয়েছে কি করে ফাইটার প্লেন ইল – ২ বা ট্যাঙ্ক টি -৩৪ বানানো হয়েছে, বা একসাথে বহু গোলা ছোঁড়ার অস্ত্র "কাতিউশা" বানানো হয়েছিল. এই প্রদর্শনী মে মাস থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলবে. পলিটেকনিক্যাল মিউজিয়ামের ডিরেক্টর গুরেন গ্রিগোরিয়ান বলেছেনঃ "আশা করব যে এই প্রদর্শনী সবার কাছেই মন গ্রাহী হবে".