প্রায়ই এই রকম হয়ে থাকে যে, প্রকৃতি মানুষের সমস্যার সমাধান নিজেই করে দেয়, উল্টোটা হয় না. গত কয়েক দিন আগে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরের কাগজ মহাসমুদ্রের অনুসন্ধানী বিশেষজ্ঞদের তথ্য নির্ভর এক খবরে লিখেছে যে, বঙ্গোপসাগরে নিউ মুর নামে এক দ্বীপ জলের তলায় হারিয়ে গিয়েছে. দ্বীপটা স্রেফ জলের তলায় ডুবে গেছে কারণ সমুদ্রের জলের উচ্চতা বেড়েছে.

    নিউ মুর দ্বীপ খুব বড় ছিল না. তার দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটারের বেশী ছিল না. কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন এই দ্বীপের নাম ভারত আর বাংলাদেশের খবরের কাগজ থেকে প্রায় সরেই যেত না. আর সব কিছুর মূলে ছিল প্রায় তিরিশ বছরের বেশী সময় ধরে ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে বিবাদ. প্রত্যেক দেশই মনে করত যে, এই নিউ মুর দ্বীপ তাদের. ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী একবার তো এই দ্বীপে সৈন্য বাহিনীর নৌ সেনা পাঠিয়েছিল যাতে তারা এই জন শূণ্য মরুভূমির মত দ্বীপে গিয়ে জাতীয় পতাকা রোপন করে আসে. ঢাকা থেকেও নিজেদের পক্ষের স্বার্থ বজায় রাখতে গিয়ে ঘোষণা করা হয়েছিল যে দ্বীপ বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে পড়ে. এই নিউ মুর নিয়ে সমস্যা বহু দিন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে চোরা কাঁটার মত একটা জ্বালাতনের বিষয় হয়ে ছিল.

    আর যেটা অবাক হওয়ার মত বিষয় তা হল, যে সমস্যার সমাধান কয়েক দশক ধরে করা সম্ভব ছিল না, এমনকি পোড় খাওয়া কূটনীতিবিদেরাও যার কোন সমাধান সূত্র পাচ্ছিলেন না, তা আপনা থেকেই সমাধান হয়ে গেল. কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাসমুদ্র বিশেষজ্ঞরা কিছু দিন আগে মহাকাশে উপগ্রহ থেকে বঙ্গোপসাগরের তোলা ছবি খুঁটিয়ে দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই বিবাদের এলাকা সম্পূর্ণ ভাবে জলের তলায় তলিয়ে গেছে, কারণ মহাসমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বেড়ে গিয়েছে. কিন্তু ভারতের মহাসমুদ্র বিজ্ঞানী সুগত হাজরা এর মধ্যে এক খুবই পরবর্তী কালের বিশাল বিপদের গুরুত্বপূর্ণ সাবধান বাণী লক্ষ্য করতে পেরেছেন. তাঁর কথা মতো, এগিয়ে আসা মহাসাগর কিছু দিনের মধ্যেই এই অঞ্চলের মানচিত্র বিশেষত অববাহিকা অঞ্চলের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও আরও নানা নদী নালা সঙ্কুল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী এলাকার মানচিত্র বদলে দিতে পারে. মহাসমুদ্রের বানে ভেসে যেতে পারে উর্বর জমি সহ লক্ষ লোকের বাসস্থান.

    আরও একটি ভারতের বিপদ হল হিমালয়ের চির শীত অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া, রাশিয়া পরিবেশ বিজ্ঞানী, ককেশাসের উঁচু পর্বত মালার অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ খাজবুলাত আদারবিয়েভিচ দিগিয়েভ বলেছেনঃ

    বিশ্ব উষ্ণায়নের ক্রম বর্ধমান গতিতে সমস্ত চির শীতল অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, অথবা বলা যেতে পারে তা ক্ষয়ে যাচ্ছে. যার ফলে বহু পাহাড়ী হ্রদের সৃষ্টি হচ্ছে, তাদের ধ্বস নেমে প্রচণ্ড গতিতে তারা সমতলে ভাসিয়ে নিয়ে নামছে, পথের সমস্ত বাধা. সেই  সব হ্রদের জল কৃত্রিম উপায়ে বার করতে হলে খরচ অনেক, সেই রকম সামর্থ্য নেই. সেই রকমই মহাসমুদ্রের ধেয়ে আসা প্লাবন থেকে রক্ষা পাওয়ার মত উপায়ও নেই. এই বিপদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় হল মানুষের কল কারখানা, গাড়ী থেকে উত্পন্ন গ্যাসের গ্রীন হাউস এফেক্ট কমানো.

    প্রকৃতি মানুষকে যে ভয়ের সঙ্কেত দিয়েছে, তা সমাধান আশু প্রয়োজন. কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এর জন্য কাজ হচ্ছে খুব কম. গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব পরিবেশ সংরক্ষণ অধিবেশনে এই বিষয়ে বিশেষ করে বহু আলোচনা করার পরও কোন সমাধান সূত্র বের করা যায় নি.