দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সেরা মাঝারি মানের ট্যাঙ্ক টি – ৩৪ এর ইতিহাস রচিত হয়েছিল আজ থেকে সত্তর বছর আগে. ৩১ শে মার্চ ১৯৪০ সালে এই ট্যাঙ্ক প্রথম সোভিয়েত লাল ফৌজের সঙ্গে সামিল হয়েছিল. ঐতিহাসিক "চৌত্রিশ নম্বর" সোভিয়েত ও জার্মান সমস্ত বড় যুদ্ধেই অংশ নিয়েছিল.

প্রথমে এক ঐতিহাসিক তথ্য দেওয়া যাক. হিটলারের নাত্সী বাহিনী সোভিয়েত দেশ আক্রমণ করার পর, শত্রু পক্ষের কাছে কয়েকটি টি – ৩৪ ট্যাঙ্ক দখল হয়ে যায়. সে গুলিকে জার্মানী পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল. দুটো ট্যাঙ্ক জার্মানরা শেষ অবধি খুলে দেখেছিল, যাতে তাদের গঠন বোঝা যায়. আর বাকি গুলির উপর পরীক্ষা ক্ষেত্রে গোলা বর্ষণ করা হয়েছিল. ফল হয়েছিল একেবারে বুদ্ধির গোড়া নাড়িয়ে দেওয়ার মত. যুদ্ধে জেতা টি -৩৪ ট্যাঙ্ক থেকে ছোঁড়া গোলা জার্মান ট্যাঙ্কের মাথা এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে দিয়েছিল আর জার্মান ট্যাঙ্কের গোলা টি -৩৪ এর গায়ে লেগে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল, কোন রকম ক্ষতি করতে না পেরে! জার্মান সেনাবাহিনীর বহু অভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া জেনেরাল ট্যাঙ্ক চালক হাইনস্ হুদেরিয়ান পরে স্বীকার করেছিল যে, এই কাণ্ড দেখে সে একেবারে মোক্ষম ধাক্কা খেয়েছিল. এই সব জিতে আনা ট্যাঙ্কের পরীক্ষার খবর হিটলারকে দেওয়া হয়েছিল, ফ্যুরার নির্দেশ দিয়েছিল যে জেনেরাল হুদেরিয়ান এর ট্যাঙ্ক বাহিনী মস্কোর দিকে না গিয়ে যেন খারকভ শহরের দিকে যায়, যেখানে ঐ ট্যাঙ্ক তৈরী করা হয়ে থাকে. হিটলার তখন বলেছিল, "আমার কাছে এখন মস্কোর চেয়ে খারকভ বেশী জরুরী". সাময়িক ভাবে হুদেরিয়ান এর সেনাবাহিনী মস্কোর দিক থেকে চলে যাওয়ায় সোভিয়েত সেনা বাহিনীর নেতৃত্বের কিছুটা বাড়তি সময় জুটেছিল ও রাজধানীর দিকে আসার রাস্তায় নিজেদের প্রতিরক্ষা অবস্থান শক্ত করার জন্য সুযোগ হয়েছিল. আর এটাই ছিল টি -৩৪ ট্যাঙ্কের প্রথম স্ট্র্যাটেজিক বিজয়.

এই ট্যাঙ্কের বিশেষত্ব ছিল যে মোটর ছিল ডিজেলের, তাই ভার টানতে পারার ক্ষমতা বেশী ও আগুন লাগার কম সম্ভাবনা ছিল. জার্মান ট্যাঙ্ক চলত পেট্রোল জ্বালানীতে. দ্বিতীয়তঃ ট্যাঙ্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল ভরসা যোগ্য. রুশ পার্লামেন্টের ভেটেরানদের কর্ম পরিষদের উপপ্রধান ফ্রান্স ক্লিন্তসেভিচ এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে, "আমার মত সামরিক লোক, যে কখনো টি -৩৪ চালিয়েছে, সে বলতে পারে যে, বর্তমানের ট্যাঙ্কের সঙ্গে এর তুলনা ঠিক হবে না, কারণ ট্যাঙ্ক  খুব সাদা মাটা, কিন্তু এর অসাধারণত্বঃ হল যে, আজও তা যুদ্ধে ব্যবহার যোগ্য, এত দূর ভরসা যোগ্য এই ট্যাঙ্ক".

সত্যই নিজের সময়ের জন্য টি -৩৪ ছিল খুবই অন্য রকমের ট্যাঙ্ক, এই ট্যাঙ্কের ঢালের ধাতুর পাত সোভিয়েত প্রযুক্তি মতে এক রকম বিশেষ সুক্ষ কৌণিক ভাবে ঝালাই করে লাগানো হত, যা শত্রুপক্ষ কখনোই বুঝে তৈরী করতে পারে নি, এর ফলে ৪৫ মিলিমিটারের পাত ৯০ মিলিমিটারের মত চোট সহ্য করতে পারত. প্রথম দিকের টি -৩৪ ট্যাঙ্কে এক বিশেষ ৭৬ মিলিমিটারের ক্যালিবারের কামান লাগানো হত, এই কামানের গোলা দেড় কিলোমিটার দূরে থাকা জার্মান ট্যাঙ্কের মাথা ধ্বংস করে দিতে পারত, অথচ ১৯৪২ সাল অবধি জার্মান ট্যাঙ্কের গোলা অত দূরে এসে রুশ ট্যাঙ্কের গায়ে কোন দাগই রাখতে পারত না. ট্যাঙ্ক চালাতে পারত অল্প শিক্ষিত সৈন্য. আর যুদ্ধের কাজ সাফল্যের সঙ্গে তাদের করতে কোন কষ্টই হত না. ১৯৪৩ সালে হিটলারে বাহিনীতে "বাঘ""চিতা" নামের নতুন দুটি মাঝারি ধরনের ট্যাঙ্ক জোড়া হল, টি – ৩৪ ও আধুনিকীকরণের পর টি ৩৪ – ৮৫ নামে উপস্থিত হল, এই নতুন মডেল খুবই সাফল্যের সঙ্গে "চিতা""বাঘ" নামের দারুণ সব নতুন অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত কিন্তু ঘোরা ফেরার বিষয়ে ঢিমে তেতালা জার্মান ট্যাঙ্ক গুলির সাথে লড়াই করতে পারল. নতুন ট্যাঙ্কের মাথায় এরোপ্লেন বিধ্বংসী ৮৫ মিলিমিটারের কামান জোড়া দিয়ে এই সব অবিশ্বাস্য কাণ্ড করা সম্ভব হয়েছিল.

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষের আগে পর্যন্ত এই ধরনের ৬০ হাজার ট্যাঙ্ক বানানো হয়েছিল. ১৯৪৫ সালের এপ্রিল – মে মাসে এই সাঁজোয়া গাড়ী বার্লিন দখল করার লড়াইতে নেমেছিল. আর কয়েক মাস বাদেই চীন ও কোরিয়াতে যুদ্ধে জাপানের সামরিক শত্রু দলকে ধ্বংস করে মুক্ত করেছিল এই সব দেশ. দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে টি ৩৪ – ৮৫ ও তার ভিত্তিতে তৈরী সম্পূর্ণ নতুন ট্যাঙ্ক টি -৪৪ আরও দশ বছর ধরে সোভিয়েত ট্যাঙ্ক বাহিনীতে পাহারায় ছিল. তাছাড়া বিশ্বের প্রায় ৪৬ টি দেশের সামরিক বাহিনীর অংশ হয়েছিল, প্রায় আর্কটিক অঞ্চল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত বহু দেশের লড়াইতে অংশ নিয়েছিল.

এ ছাড়া এই গাড়ীর আরও একটা ভূমিকা হয়েছে, বিশ্বের বহু লড়াই এর বিজয়ের সাক্ষী হিসাবে মঞ্চের উপর তা বসানো রয়েছে.

    বহু ঐতিহাসিক সামরিক যাদুঘরে ও টি -৩৪ আছে. মস্কোর থেকে অল্প দূরের বিশ্বের একমাত্র শুধু টি -৩৪ এর যাদুঘরে এই ট্যাঙ্ক রাখা হয়েছে. লেখিকা ও কবি লারিসা ভাসিলিয়েভা এই যাদুঘর তৈরী করেছেন, তিনি এই ট্যাঙ্কের এক প্রথম দিকের নির্মাণ কারক নিকোলাই কুচেরেঙ্কোর মেয়ে. বাবার মৃত্যু শয্যায় তিনি কথা দিয়েছিলেন যে, ট্যাঙ্ক তৈরী নিয়ে একটা বই লিখবেন. তাই বহু দিনের কঠিন পরিশ্রম ও অনুসন্ধানের ফলে ভেটেরান দের সঙ্গে দেখা করে তিনি যে বই লিখলেন তার নাম দিয়েছিলেন – বাবার সম্বন্ধে বই. তাঁর বই বেরোনোর পর পাঠকদের কাছ থেকে আসা ঝুড়ি ভর্তি চিঠি পাওয়া গিয়েছিল. তাই এই ট্যাঙ্কের সাথে কোন না কোন রকম ভাবে যুক্ত লারিসা ভাসিলিয়েভা বলেছেনঃ

"লোকের স্মৃতি, ফোটো, দলিল এত ছিল যে, আমি ঠিক করলাম এই ট্যাঙ্ক নিয়ে একটা যাদুঘর তৈরী করার. ১৯৭৬ সাল থেকে এই যাদুঘরের জন্য জিনিস যোগাড় করছি, আর আজ এই যাদুঘর ঠিক সেই জায়গায় তৈরী করা হয়েছে, যেখান থেকে ১৯৪১ সালে হিটলারের বাহিনীকে রাজধানী থেকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল টি – ৩৪ ট্যাঙ্কের সাহায্যে. আমি সব সময়েই বিশ্বাস করতাম যে, এই রকম একটা যাদুঘরের দরকার আছে আর সেটা জনপ্রিয় হবেই".

এই যুদ্ধের সাঁজোয়া গাড়ীর ইতিহাসের বর্ণনা করতে গিয়ে একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করব. বিখ্যাত ইংরাজ শিল্পী স্টিভেন বিস্টির আঁকা বই অ্যালবাম ("Incredible cross sections") অসাধারন প্রস্থচ্ছেদ যা বিশ্বের বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে, সেই বইতে পৃথিবীর ১৮টি মানুষের সৃষ্ট অসাধারন জিনিসের কথা বলা হয়েছে. তাদের মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্ক টি -৩৪.