মস্কো মেট্রোর সন্ত্রাসবাদী হানাতে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের শেষ কৃত্য আজ রাজধানীতে ও দেশের অন্যান্য শহরে করা হবে. এখন অবধি পাওয়া খবর অনুযায়ী মস্কোতে লুবিয়ানকা ও পার্ক কুলতুরি  মেট্রো স্টেশনে বিস্ফোরণের ফলে ঊন চল্লিশ জন নিহত হয়েছেন. হাসপাতাল গুলিতে ৭০ জনের বেশী আহত রয়েছেন – তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর. কিন্তু মস্কোর লোকেদের ভয় পাওয়ানো সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে সম্ভব হয় নি – মাটির নীচের চলাচলের পথ আগেও যেমন ছিল, তেমনই আজও যাত্রীর ভীড়ে ভর্তি, আর জনতা সন্ত্রাসবাদীদের মোকাবিলার জন্য একেবারে তৈরী.

     সোমবার ভোর বেলায় সকোলনিকি লাইনের দুটি স্টেশনে চল্লিশ মিনিটের ব্যবধানে দুটি আত্মঘাতী হানায় শহরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে. বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে দুজন আত্ম ঘাতিনী জড়িত.

    সোমবার সন্ধ্যার আগেই সকোলনিকি লাইনে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে. বিস্ফোরণ ঘটা স্টেশন গুলিতে মস্কোর লোক আসতে শুরু করেছিল, তাঁরা সকলেই এসেছিলেন নিহত দের প্রতি শোক প্রকাশ করতে. এঁদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোকই প্রতিদিন এই পথেই কাজে যাতায়াত করেন, লোকে এসেছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাঁদের জন্য এই দুটো স্টেশন চিরকালের জন্য শেষ স্টেশন হয়ে রইল. অনেকেই চোখের জল থামাতে পারেন নি, লুবিয়ানকা স্টেশনের মাঝখানে যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছিল, সেখানে একটা টেবিল পাতা হয়েছিল, লোকে তার উপর ফুল রেখেছিল.

    এমনিতে যাঁরা সাধারণতঃ মাটির উপরেই চলাফেরা করেন তাঁরাও নেমে ছিলেন এই দুটি মেট্রো স্টেশনে, উপস্থিতি দিয়ে সকলের সঙ্গে নিজেদের সাম্যের প্রমাণ হিসাবে, দিমিত্রি মেদভেদেভ ও এই জায়গায় ফুল রাখতে এসেছিলেন মাটির নীচে মস্কোর মেয়রের সাথে. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি বিশেষ করে বলেছেন এই বিস্ফোরণের সমস্ত পিছনের লোককে খুঁজে বার করা হবে ও ধ্বংস করা হবে.

    রুশ দেশের লোকেদের নিজেদের সহানুভুতি জানিয়েছেন বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশই, তাঁদের মধ্যে অনেকেই এই রকম সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন. তাই মস্কো মেট্রোর বিস্ফোরণ, তাঁদের শুধু নিজেদের দেশে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও কঠোর করতেই বাধ্য করে নি বরং আবার করে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, সন্ত্রাসের সঙ্গে যুদ্ধ কোন একক দেশের কাজ নয়, বিশ্বের সকলেই এর বিরুদ্ধে একত্র হতে বাধ্য. এই বিষয়ে অংশতঃ কানাডাতে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের জি – ৮ বৈঠকের পর প্রকাশিত সামগ্রিক দলিলে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ গিয়েছিলেন এই বৈঠকে অংশ নিতে, তিনি প্রসঙ্গতঃ বলেছেনঃ

    মন্ত্রী পর্যায়ের জি – ৮ বৈঠকে সকলেই একত্রিত ভাবে সন্ত্রাস সম্পর্কে এই দলিল প্রকাশে সমর্থন জানিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে যে, বৈঠক এই সন্ত্রাসবাদী হানার কঠোর সমালোচনা করেছে এবং আবারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরো সক্রিয় করতে হবে. আমি বিশ্বাস করি যে, যারা এই হানার পিছনে ধারণা ও পরিকল্পনা করেছে, তার জন্য অর্থ দিয়েছে, তারা কৃত কর্মের ফল ভোগ থেকে রেহাই পাবে না.

    "রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও বিশেষ আইন রক্ষা দপ্তর এই হানার বিষয়ে অনুসন্ধান কে প্রাথমিক কাজ বলে মনে করেছে, বেশ কয়েকটি বিভিন্ন মতের অনুসন্ধান চলছে, সমস্ত তথ্য একত্র করে তাত্ক্ষণিক ভাবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, এর মধ্যেই কিছু লোকের খবর পাওয়া গেছে, যারা এর সঙ্গে জড়িত. রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রশিদ নুরগালিয়েভ বুধবারের মিটিং এর সময় ঘোষণা করেছেন যে, মস্কোর এই ভয়ঙ্কর আতঙ্কবাদী হানার জবাব হবে ভীষণ কঠোর এবং তা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় হবে, সমস্ত অপরাধীদের ধরা হবে ও তাঁদের সবচেয়ে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে".

    মেট্রোর বিস্ফোরণের পর প্রশাসন সন্ত্রাস বাদ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের কথা বলেছে, সমাজে এই বিষয়ে সমর্থন পাওয়া গেছে, অংশতঃ এই ক্ষেত্রে সংশোধন বলতে জনতা বুঝেছে যে আরও কঠোর হবে শাস্তির ভাগ. এমনকি বহু মানুষের নিধনের শাস্তি হিসাবে রাশিয়াতে বর্তমানে বন্ধ হওয়া মৃত্যু দণ্ড আবার জারি করার কথাও হয়েছে.

    পশ্চিমের বেশ কিছু সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, রুশ কঠোর মনোভাব আবার আগের মত লৌহ প্রাচীর বা নাট বোল্টু টাইট করার মত হবে না তো. কারণ আগে যখন এই রকম ট্র্যাজেডি হয়েছিল, দেশের প্রশাসন জনতার উপর নিয়ন্ত্রণ শুধু বাড়িয়ে ছিল. কিন্তু মনে হয় না যে এই ধরনের মন গড়া কথার কোন ভিত্তি আছে, রাশিয়ার জাতীয় পরিকল্পনা ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট স্তানিস্লাভ বেলকোভস্কি বলেছেনঃ

    "সত্যই ভ্লাদিমির পুতিন যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখন দেশে প্রশাসনের কাঠামো সম্পূর্ণ রকম উপর থেকে সোজা নীচে করার বিষয়ে লোকের সমর্থন ছিল, যার ফলে নানারকমের ভেতরের বাধা তৈরী করা হয়েছিল, কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সে রকম নয়. আজ জনতা চায় প্রশাসনের কাছ থেকে বুদ্ধি করে তৈরী করা ভারসাম্য – কিছুটা গণতান্ত্রিক খোলা মেলা ব্যাপার এবং নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা. তাই নাট বোল্টু টাইট করার কথা উঠতে পারে না, এমন কি বর্তমানের সরকারে সে রকমের কোন লোকই নেই যারা এই ধরনের মতকে সমর্থন করবে".

    একই সময়ে সন্ত্রাসবাদীরা কিন্তু আবার হানা দিয়েছে রুশ দেশের অন্য শহরে. বুধবার দাগেস্তানের কিজলিয়ার শহরে পরপর দুটি বিস্ফোরণ হয়েছে, এর মধ্যে দ্বিতীয়টি করিয়েছে এক পুলিশের পোষাক পরা আততায়ী. সেখানেও লোক মারা গিয়েছে ও আহত হয়েছে. অনুসন্ধান চলছে. মনে করা হচ্ছে যে, মস্কো মেট্রোর ট্র্যাজেডি সহ এই সমস্ত সন্ত্রাসবাদী ঘটনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে.

<sound>